রবিবার ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ - ২১:০০
ইরানের নেতৃত্ব ও কারবালার চেতনা

সমসাময়িক কারবালায় যদি কেউ হুসাইন ইবনে আলী (আ.)-এর সাহায্য ও সহায়তা করতে চায়, তাহলে তাকে সাইয়েদ আলী খামেনেই-এর পাশে দাঁড়াতে হবে এবং ইরানের সমর্থন করতে হবে। কেননা বর্তমান যুগে ইয়াজিদের বিরুদ্ধে পূর্ণ দৃঢ়তার সাথে একমাত্র ইরানই দাঁড়িয়ে আছে। এখানেও মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে যুগের ইয়াজিদেরা অচিরেই এই অঞ্চলও কারবালার প্রান্তরে পরিণত হবে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, কারবালার ঘটনা মানব ইতিহাসের একটি মাইলফলক, যা শুধু মুসলমানদের নয়, সারা বিশ্বকেই সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য দেখিয়েছে। 

কারবালায় ইমাম হুসাইন (আ.)-এর সংগ্রাম ছিল না কোন সাধারণ রাজনৈতিক লড়াই; বরং এটি ছিল এক চিরন্তন যুদ্ধ, যার এক পাশে ছিল অত্যাচার ও ফাসাদের প্রতিনিধি ইয়াজিদ, অন্যপাশে ছিল সত্য ও ন্যায়ের পতাকাবাহী হুসাইন ইবনে আলী (আ.)। 

হুসাইন ইবনে আলী (আ.) বিশ্বকে শিক্ষা দিয়েছিলেন যে, অত্যাচারের সামনে মাথা নত করা এবং কোন মূল্যে নিজের ঈমান বিক্রি করা উচিত নয়।

এই ঘটনা আজও আমাদের হৃদয়ে সজীব, এবং আমরা প্রত্যেকে অন্তর থেকে কারবালার ত্যাগ ও ইমাম হুসাইন (আ.)-এর দৃঢ়তাকে স্বীকার করি। কিন্তু যখন আমরা বর্তমান যুগের দিকে তাকাই, তখন অনুভব করি যে কারবালার যুদ্ধ আজও চলছে, এবং তার একটি নতুন রূপ আমাদের সামনে উপস্থিত।

আজকের বিশ্বে, যেখানে বৈশ্বিক শক্তিগুলো তাদের সাম্রাজ্যের জন্য একে অপরের সাথে লড়ছে, সেখানে একপাশে দাঁড়িয়ে আছে ইরান, যা দৃঢ়তার এক অনন্য উদাহরণ। 

আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ আলী খামেনেই-এর নেতৃত্বাধীন ইরানই সেই দেশ, যা হুসাইন (আ.)-এর মিশনকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। ইরান সরকার ও নেতৃত্ব যুগের ইয়াজিদের বিরুদ্ধে যে অবস্থান গ্রহণ করেছে, তা আজকের দিনে হুসাইন (আ.)-এর সংগ্রামের একটি আধুনিক রূপ।

সেই বিপ্লব যার বিশ্বে নেই কোনো নজির        সেই বিপ্লব যেটি মানবকে দিয়েছে বিবেক
সেই বিপ্লব যে অত্যাচারের ভেঙেছে তীর        রাখেনি শাহেনশাহ ও ফকিরের কোনো তফাত
সেই কালো পাতা যে ছিল, সে উল্টে দিয়েছে    যে যুগের ইয়াজিদের সিংহাসন উলটে দিয়েছে

ইরানের ভূমিকা ও সাইয়েদ আলী খামেনেই-এর নেতৃত্ব

সাইয়েদ আলী খামেনেই-এর নেতৃত্বে ইরান আজ কারবালার সেই আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক বার্তাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিচ্ছে। তার নেতৃত্ব ইরানকে এমন এক পথে পরিচালিত করেছে যেখানে তারা শুধু তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়েই নয়, বরং বিশ্বব্যাপী অত্যাচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে কণ্ঠস্বর উত্থাপন করছে। ইরানের অবস্থান যুগের ইয়াজিদ অর্থাৎ বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদী শক্তিসমূহ এবং তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে।

মিথ্যার চিন্তা এখানে শিকড় গাড়তে পারে না
কারবালা কোন মুকুটকে বহন করতে পারে না

সাইয়েদ আলী খামেনেই-এর নেতৃত্বে ইরান এমন সব পথ বেছে নিয়েছে, যেখানে তারা তাদের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও নীতির সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে। এটি ঠিক তেমনই, যেমনটি ইমাম হুসাইন (আ.) কারবালায় করেছিলেন। হুসাইন ইবনে আলী (আ.)-এর বার্তা ছিল যে, জীবন দিয়ে হলেও সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে হবে।

কারবালা যখন কাফন মাথায় বেঁধে আসে
মর্ত্য ও আসমানের প্রশস্ততা ছেয়ে ফেলে

আজ ইরানে সেই একই বার্তার পতাকা উড্ডীন, এবং সাইয়েদ আলী খামেনেই একই পথে চলতে চলতে বিশ্বকে দেখিয়ে দিচ্ছেন যে, প্রকৃত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব শুধুমাত্র সেই জাতিই অর্জন করতে পারে, যে জুলুমের কাছে আত্মসমর্পণ করার পরিবর্তে দৃঢ়তা দেখায়।

যুগের ইয়াজিদের বিরুদ্ধে ইরানের দৃঢ়তা

আজকের বিশ্বে 'যুগের ইয়াজিদ'-এর ধারণা শুধু একজন ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি এমন এক ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে, যা শক্তির জোরে বিশ্বকে তার ইচ্ছানুযায়ী চালাতে চায়। এই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো, যাদের নেতৃত্বে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং অন্যান্য বৈশ্বিক শক্তি, নিজেদের স্বার্থে বিশ্ব রাজনীতিকে এমনভাবে সাজায় যাতে দুর্বল দেশগুলিকে দমিয়ে রাখা যায়। ইরান এই শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে এবং সেই একই ভূমিকা পালন করছে, যা ইমাম হুসাইন (আ.) কারবালায় পালন করেছিলেন।

ইরানের দৃঢ়তাই প্রমাণ করেছে যে, যখন একটি জাতি তার নীতি ও অধিকারের পক্ষে দাঁড়ানোর দৃঢ় সংকল্প রাখে, তখন বিশ্বের কোন শক্তিই তাকে নিজের ইচ্ছায় বাঁধতে পারে না। ইরান শুধু তার অভ্যন্তরীণ বিষয়েই নয়, বরং বিশ্বব্যাপীও মিথ্যা শক্তির কাছে মাথা নত না করার অঙ্গীকার করেছে।

আজকের যুগে হুসাইন (আ.)-এর সাহায্যের অর্থ

যদি আমরা সত্যিই হুসাইন (আ.)-এর মিশনকে জীবিত রাখতে চাই, তাহলে আমাদের শুধু তার ত্যাগের স্মরণ করলেই চলবে না; বরং আমাদেরকে তার দৃঢ়তা ও নীতিগুলোর অনুসরণ করতে হবে। হুসাইন (আ.)-এর বার্তা শুধু সেসময়ের ইয়াজিদের জন্যই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল সকল অত্যাচারী শক্তির বিরুদ্ধে। আজ আমরা যখন বিশ্বে অত্যাচারের ব্যবস্থা দেখি, তখন আমাদেরকে হুসাইন (আ.)-এর বার্তাকে গ্রহণ করতে হবে।

ইরানের নেতৃত্বে সাইয়েদ আলী খামেনেই হুসাইন (আ.)-এর মতোই জুলুমের মুখে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার করেছেন। ইরান বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একটি দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছে এবং সেই অবস্থানে অবিচল রয়েছে। একইভাবে, আমরা যদি ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মিশনকে বাস্তবে জীবিত রাখতে চাই, তাহলে আমাদেরকে ইরানের সমর্থন করতে হবে, কারণ তারাই আজ কারবালার মতো মিথ্যার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে।

মিডিয়া: ইসলাম ও ইরানের বিরুদ্ধে পশ্চিমের কার্যকর হাতিয়ার

বর্তমান যুগে ইসলাম, মুসলমান ও ইরানের বিরুদ্ধে পশ্চিমা গণমাধ্যমের যে সন্ত্রাস চালানো হচ্ছে, তা বহুমুখী ও সর্বব্যাপী। বর্তমান সময় মিডিয়ার সময়। গভীরভাবে ভেবে দেখলে অনুভব করা যাবে যে, পশ্চিমারা শুধুমাত্র কার্যকর ও শক্তিশালী মিডিয়ার মাধ্যমেই বিশ্বে এবং মানুষের মননে শাসন করছে। আর পূর্বে ভারত ও পাকিস্তানের মতো বিশাল দেশগুলিও এর অন্তর্ভুক্ত, যেখানে রাজনৈতিক চেতনার অভাব রয়েছে। অজ্ঞতা চরমে এবং পশ্চিমা শিক্ষিত শ্রেণী সর্বপ্রকার নির্দেশনার জন্য পশ্চিমের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। আর এই দেশগুলোর মিডিয়ার লাগামও তাদের হাতেই, এবং তারা তাদের ইশারায় প্রতিদিন ইসলাম, মুসলমান ও ইরানের বিরুদ্ধে নিত্যনতুন বানানো খবর ছড়াতে থাকে, যার উদ্দেশ্য মানুষের চিন্তাকে প্রভাবিত করা এবং তাদের ভাবনাকে একটি নির্দিষ্ট গতিতে পরিচালিত করা। আর এই সবকিছু শুধুমাত্র এই কারণে যে, পশ্চিমা ইসলাম ও ইরানের উদীয়মান ধর্মীয় তরঙ্গ থেকে ভীত, যার মোকাবিলার জন্য তারা মিডিয়াকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। বর্তমান যুগে শত্রুর সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র গুলি নয়, বরং খবর। মিডিয়া এখন আর তথ্য পৌঁছানোর মাধ্যম নেই, বরং আদর্শিক যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ময়দানে পরিণত হয়েছে।

আজ যুদ্ধ শুধু রণক্ষেত্রে নয়, বরং চিন্তা, চেতনা ও বয়ানের প্রান্তরেও লড়াই হয়। মিডিয়া এখন আর খবর পৌঁছানোর মাধ্যম নেই, বরং আদর্শিক যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ও ভয়ঙ্কর ময়দানে পরিণত হয়েছে। সত্যকে বিকৃত করা, মিথ্যাকে সত্য হিসেবে পেশ করা এবং মজলুমকে অপরাধী প্রমাণ করা—এগুলোই আধুনিক ইয়াজিদি ব্যবস্থার সেই সব অস্ত্র যা নীরবেই আঘাত হানে, কিন্তু তার প্রভাব প্রজন্মান্তরে চলে যায়।

সেইজন্য 'কারবালায়ে আসর' (যুগের কারবালায়) যুদ্ধ শুধু বন্দুক ও ক্ষেপণাস্ত্রের নয়, বরং বয়ানেরও যুদ্ধ। একদিকে সেই মিডিয়া, যা জুলুমকে ন্যায্যতা দেয়, খুনিকে নায়ক বানায় এবং সত্যের কণ্ঠস্বর চাপা দিতে সর্বাত্মক চেষ্টা করে; আর অন্যদিকে সেই অবস্থান, যা সত্যের উপর দাঁড়িয়ে আছে, যদি দুনিয়া তাকে একাই ছেড়ে দেয়। যেমনটি প্রিন্ট মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক বোধসম্পন্ন ব্যক্তি অবগত আছেন যে, ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরান ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতার বিরুদ্ধে কী ধরনের অশোভন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে এবং তার ইমেজ বিকৃত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

এটাই সেই স্থান যেখানে সাইয়েদ আলী খামেনেই-এর ভূমিকা শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তিনি 'রগে বাতিল' (মিথ্যার শিরা)-এর জন্য 'নশতার' (ছুরিকা) হয়ে আবির্ভূত হন। তিনি মিডিয়া, প্রচারণা ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের মাধ্যমে যুগের ইয়াজিদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মিথ্যা বৈশ্বিক বয়ানকে বিদীর্ণ করেন। তার নেতৃত্বে ইরান শুধু সামরিক প্রান্তরেই নয়, বরং চিন্তাগত ও প্রচারমূলক প্রান্তরেও দৃঢ়তার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

আমাদের দায়িত্ব

এটাই সেই সময় যে আমরা আমাদের দায়িত্ব বুঝি এবং ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মিশনকে বাস্তবে গ্রহণ করি। আমাদেরকে আমাদের বিবেকের ডাক শুনতে হবে এবং বিশ্বে জুলুম ও ফাসাদের বিরুদ্ধে একটি সাহসী অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। এর অর্থ শুধু সাইয়েদ আলী খামেনেই-এর সমর্থন করা নয়, বরং তাদের নেতৃত্বে ইরানের সমর্থন করতে হবে। আমাদেরকে সামাজিক নেটওয়ার্কে জ্ঞান ও যুক্তির মাধ্যমে বিশ্বে অধিকতর সক্ষমতার পরিচয় দিতে হবে। শুধু তীর, তলোয়ার ও বন্দুকের ময়দানে শত্রুর মোকাবিলা কাম্য নয়, বরং কলম ও প্রকাশনার জগতেও তার মোকাবিলা প্রয়োজন। এবং এভাবেই ইসলাম ও ইরানের সম্মুখীন প্রতিটি চ্যালেঞ্জের জবাব দেয়া আবশ্যক। কারণ, তারাই আজ কারবালার সংগ্রামের পতাকা উড্ডীন করছে।

যদি আমাদের হুসাইন (আ.)-এর মিশনকে জীবিত রাখতে হয়, তাহলে আমাদেরকে আমাদের কর্মের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে যে, আমরা শুধু হুসাইন (আ.)-এর স্মরণেই নয়, বরং তার পথে চলার মাধ্যমে মিথ্যার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি। আর এটা আমাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব যে, আমরা সাইয়েদ আলী খামেনেই-এর নেতৃত্বে ইরানের সমর্থন করি, কেননা তারাই আজকের দিনে হুসাইন (আ.)-এর দৃঢ়তার এক জীবন্ত উদাহরণ।

হে বিপ্লব! তোমা থেকেই জগতে বাহার
তোমারই নামে রজনী-দিনের আবর্তন
তুমি এক নবজীবনের আয়না-দরবার
তোমার সঙ্গেই প্রভুর ইচ্ছার মিলন

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha