হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী,
রিপোর্ট: মুস্তাক আহমদ
আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের সাম্প্রতিক ঘোষিত শ্রেণিভিত্তিক বিচারব্যবস্থা কেবল একটি রাষ্ট্রীয় আইনগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি ইসলামী ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনের এক গভীর দ্বন্দ্বকে নতুন করে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। এই বাস্তবতা বুঝতে হলে আমাদের তাকাতে হবে ইসলামি ইতিহাসের সেই মৌলিক বিভাজনের দিকে—যেখানে শিয়া ও সুন্নি চিন্তাধারার রাজনৈতিক দর্শন ভিন্ন পথে যাত্রা শুরু করেছিল।
(১) খেলাফত বনাম ইমামত:
(শাসনের দর্শন কোথায় ভেঙে গেল)
নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ওফাতের পর মুসলিম উম্মাহ সর্বপ্রথম যে প্রশ্নটির মুখোমুখি হয়েছিল, তা ছিল—কে শাসন করবে, এবং কীভাবে শাসন করবে?
সুন্নি ঐতিহাসিক দর্শনে খেলাফত একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে শাসকের বৈধতা আসে সংখ্যাগরিষ্ঠের সম্মতি ও ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দর্শন শাসকের প্রতি আনুগত্যকে ধর্মীয় কর্তব্যে রূপ দেয়—যদিও শাসন ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুত হয়েছে, এবং পরবর্তীকালে সুন্নী ধর্মে কলঙ্কের দাগ এসেছে৷
অন্যদিকে শিয়া দর্শনে ইমামত কোনো রাজনৈতিক পদ নয়, বরং নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দায়িত্ব, যা আল্লাহ ও নবী (সঃ) দ্বারা মনোনীত৷ ইমাম আলী (আ.) থেকে শুরু করে কারবালায় ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাত পর্যন্ত শিয়া ইতিহাস বারবার ঘোষণা করেছে—
অন্যায় শাসনের প্রতি নীরব আনুগত্য নিজেই একটি অপরাধ।
(২) বিচারব্যবস্থা: শক্তিশালীর ঢাল না দুর্বলের আশ্রয়?
ইসলামের ইতিহাসে বিচার ছিল শাসকের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর একটি মাধ্যম। ইমাম আলী (আ.) বিচারকের সামনে এক ইহুদির সঙ্গে সমানভাবে দাঁড়িয়ে রায় মেনে নিয়েছেন—এটি শিয়া দর্শনের ন্যায়বিচারের সর্বোচ্চ উদাহরণ। ইসলামে আইন শাসকের ঊর্ধ্বে। কিন্তু আফগানিস্তানের বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র— আইন এখন শাসকের অধীন, বিচার শ্রেণিভিত্তিক, আর ধর্ম ক্ষমতার রক্ষাকবচ। এখানেই জন্ম নেয় ‘আধুনিক দাসত্ব’-এর ধারণা।
(৩) দাসত্ব: ইতিহাসের শব্দ, বর্তমানের বাস্তবতাঃ
ইসলাম দাসত্ব বিলুপ্তির পথে সমাজকে এগিয়ে নিয়েছিল—এটি ঐতিহাসিক সত্য। কিন্তু দার্শনিকভাবে দাসত্ব শুধু শিকলের নাম নয়। যেখানে— মানুষের চিন্তা নিয়ন্ত্রিত, প্রশ্ন করা অপরাধ, নারী কেবল শরীর, নাগরিক নয়৷ ভিন্ন মত রাষ্ট্রদ্রোহ ৷ সেখানে দাসত্ব নতুন রূপে ফিরে আসে। এ প্রসঙ্গে ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছিলেন— “যে সমাজে সত্য বলার মূল্য জীবন, সে সমাজ ইতোমধ্যেই মৃত।”
(৪) তালেবানি ব্যাখ্যা: সুন্নি ঐতিহ্য না রাজনৈতিক ধর্ম?
তালেবান তাদের শাসনকে ‘সুন্নি শরিয়াহ’ বলে দাবি করলেও, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়— সুন্নি ফিকহে কখনোই শ্রেণিভিত্তিক বিচারব্যবস্থার অনুমোদন নেই।
ইমাম আবু হানিফা নিজেই রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কারাবরণ করেছিলেন। অতএব প্রশ্ন ওঠে— তালেবান কি সুন্নি ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার, না ক্ষমতালোভী রাজনৈতিক মতাদর্শের বাহক?
(৫) শিয়া দর্শনের সতর্কবাণী: কারবালার পুনরাবৃত্তিঃ
কারবালা কেবল একটি যুদ্ধ নয়—এটি একটি চিরন্তন দর্শন। ইমাম হুসাইন (আ.) জানতেন, তিনি জিতবেন না। তবু দাঁড়িয়েছিলেন, কারণ তাঁর কাছে নৈতিক পরাজয় ছিল প্রকৃত পরাজয়।
আজ আফগানিস্তানে যখন রাষ্ট্র ধর্মের নামে শ্রেণি তৈরি করে, তখন কারবালার প্রশ্ন আবার ফিরে আসে— তুমি কোন পক্ষে? ইয়াজিদের স্থিতিশীলতার পক্ষে, না হুসাইনের ন্যায়ের পক্ষে?
(৬) আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটঃ
আন্তর্জাতিক সমাজ আফগানিস্তানকে একটি ভূরাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখছে। কিন্তু মুসলিম বিশ্বের জন্য এটি একটি নৈতিক সংকট। যদি ইসলামের নামে— বৈষম্য বৈধ হয়, বিচার শ্রেণিনির্ভর হয়, ভয় শাসনের অস্ত্র হয়, তবে সেই শাসন যতই ‘ইসলামি’ দাবি করুক, তা ইসলামের দর্শনের বিপরীত।
ইতিহাসের আদালতে শেষ পর্যন্ত শাসক নয়, দর্শনই টিকে থাকে। আর দর্শনের বিচারে— ন্যায় কখনো শ্রেণিভিত্তিক হতে পারে না, আর ধর্ম কখনো দাসত্বের পক্ষে দাঁড়ায় না।
আপনার কমেন্ট