মঙ্গলবার ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ - ০৭:০৫
বর্তমান ইসলামি বিশ্বের জন্য ‘প্রতিরোধমূলক মাহদাভিয়াত’ ও ‘প্রগতিশীল প্রতীক্ষা’ অপরিহার্য

আয়াতুল্লাহ আলী রেজা আ’রাফি মাহদাভিয়াতের মৌলিক ও বিশুদ্ধ ধারণায় প্রত্যাবর্তন এবং সক্রিয় ও সভ্যতাভিত্তিক প্রতীক্ষার (ইন্তেজার) ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, বর্তমান ইসলামি বিশ্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অধিকভাবে ‘প্রতিরোধমূলক মাহদাভিয়াত’ ও ‘প্রগতিশীল প্রতীক্ষা’-র প্রয়োজন অনুভব করছে—এমন এক প্রতীক্ষা, যা একদিকে বৈশ্বিক আকর্ষণ সৃষ্টি করে এবং অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদী ও সায়োনিস্ট প্রবণতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও প্রতিবন্ধকতা গড়ে তোলে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: পবিত্র জামকারান মসজিদের বাকি‘আ শাবিস্তানে অনুষ্ঠিত ২১তম আন্তর্জাতিক “ডকট্রিন অব মাহদাভিয়াত” সম্মেলনে প্রদত্ত বক্তব্যে ইরানের হাওজায়ে ইলমিয়া তথা ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের পরিচালক আয়াতুল্লাহ আলী রেজা আ’রাফি এসব কথা বলেন।

তিনি পবিত্র শাবান মাসের আগমন, হররত ওয়ালি আসর (আ.ফা.)-এর জন্মবার্ষিকী এবং এই দিবসগুলোর সঙ্গে ইসলামী বিপ্লবের দশে ফজরের সমাপতন উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানান। পাশাপাশি সম্মেলনের আয়োজকবৃন্দ, মাহদাভিয়াত গবেষকগণ, “মুয়াসসাসা-ই অয়ান্দে রওশান”, জামকারান মসজিদের তত্ত্বাবধান পরিষদ এবং আয়াতুল্লাহিল উজমা মাকারেম শিরাজির প্রেরিত বার্তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

ইতিহাসের ব্যাখ্যা ও ত্রাণকর্তা-চিন্তাধারা
সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য—“চূড়ান্ত শিখরকে কেন্দ্র করে ইতিহাসের ব্যাখ্যা”—ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ইসলামী চিন্তায় ইতিহাস কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনাবলির সমষ্টি নয়; বরং এটি একটি ধারাবাহিক, বিকাশমান ও ঊর্ধ্বমুখী প্রক্রিয়া, যা শেষ পর্যন্ত এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে মানবিক ও ঐশী মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার এবং প্রজ্ঞার পূর্ণ বিকাশ ঘটে।

তিনি আরও বলেন, ইসলামের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রতীক্ষা (ইন্তেজার) শুধু ব্যক্তিগত ও আধ্যাত্মিক বিষয় নয়; বরং এর সুস্পষ্ট সামাজিক, ঐতিহাসিক ও সভ্যতাগত মাত্রা রয়েছে এবং মানবজীবনের বাস্তব পরিসরে এর সক্রিয় ভূমিকা থাকা আবশ্যক।

ইতিহাসের পরিণতি সম্পর্কে তিনটি ভ্রান্ত ব্যাখ্যা
আয়াতুল্লাহ আ’রাফি মুঞ্জি-ধারণায় বিদ্যমান বুদ্ধিবৃত্তিক বিচ্যুতি সম্পর্কে সতর্ক করে বলেন, আজ মানবসভ্যতা ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তিনটি ভ্রান্ত ব্যাখ্যার মুখোমুখি—
• সায়োনিস্ট ইহুদিবাদ
• সায়োনিস্ট খ্রিস্টানবাদ
• ইতিহাসের শেষ সম্পর্কে পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী ও উদারপন্থী (লিবারেল) ব্যাখ্যা

তিনি বলেন, বাহ্যিক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও এই তিনটি ধারা বাস্তবে একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত এবং উপনিবেশবাদ, বর্ণবাদ, গণহত্যা ও সায়োনিস্ট শাসনের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থনের পেছনে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।

তার ভাষায়, সায়োনিজম বর্ণবাদ, মানববিরোধিতা এবং বিকৃত ধর্মীয় ও দার্শনিক ব্যাখ্যাকে একত্র করে ‘সায়োনিস্ট লিবারালিজম’, ‘সায়োনিস্ট খ্রিস্টানবাদ’ ও ‘সায়োনিস্ট ইহুদিবাদ’—এই তিন ধারাকে একটি বিপজ্জনক বৈশ্বিক কাঠামোতে পরিণত করেছে, যা আজ ইসলামি বিশ্ব এমনকি সমগ্র মানবতার বিরুদ্ধেও সক্রিয়।

মাহদাভিয়াতের তিনটি মৌলিক দায়িত্ব
তিনি সঠিক মাহদাভিয়াত চিন্তাধারার তিনটি প্রধান দায়িত্ব তুলে ধরেন—
প্রথম দায়িত্ব, বিশ্বপর্যায়ে যুক্তিনির্ভর ও প্রামাণ্য উপায়ে মাহদাভিয়াতের ধারণা উপস্থাপন করা; কারণ আজকের বিশ্ব এই মুক্তিদায়ক বার্তার জন্য গভীরভাবে তৃষ্ণার্ত এবং প্রকৃত মাহদাভিয়াত মানুষের হৃদয়ে গভীর আকর্ষণ সৃষ্টি করে।

দ্বিতীয় দায়িত্ব, বিকল্প ও বিচ্যুত মতবাদগুলোর মৌলিক ও প্রামাণ্য সমালোচনা। সায়োনিস্ট লিবারালিজম এবং বিকৃত ইহুদি ও খ্রিস্টান মুঞ্জি-ধারণাকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে খণ্ডন করা অপরিহার্য।

তৃতীয় দায়িত্ব, কার্যক্ষেত্রে সক্রিয় উপস্থিতি। কারণ এই ভ্রান্ত মতবাদগুলো আজ সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে; ফলে কেবল তাত্ত্বিক সমালোচনা যথেষ্ট নয়।

প্রতীক্ষা: আকর্ষণ ও প্রতিবন্ধকতা
তিনি বলেন, প্রকৃত প্রতীক্ষার মধ্যে একই সঙ্গে ‘আকর্ষণ’ ও ‘প্রতিবন্ধকতা’ বিদ্যমান।

সত্যিকারের মাহদাভিয়াত বিশ্বব্যাপী ঐশী মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষকে আকৃষ্ট করে এবং একই সঙ্গে অত্যাচারী, স্বৈরাচারী ও মানবতার শত্রু শক্তির বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন,
প্রতিরোধহীন প্রতীক্ষা একটি অসম্পূর্ণ প্রতীক্ষা। আজ প্রতিরোধের অক্ষ (মুকাওয়ামা) হলো ‘প্রতিরোধমূলক প্রতীক্ষা’ ও মাহদাভিয়াতের বাস্তব ও জীবন্ত প্রতীক।

ইসলামি বিশ্বের প্রতি সতর্কবার্তা
বর্তমান সংবেদনশীল পরিস্থিতির প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, যদি ইসলামি উম্মাহ—সব মাজহাব, জাতিগোষ্ঠী ও সংস্কৃতিকে একত্র করে—এই আগ্রাসী প্রবণতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ না হয়, তবে প্রত্যেকে পর্যায়ক্রমে আঘাতের শিকার হবে।

তার মতে, ইসলামের শত্রুরা মুসলমানদের জন্য অপমান, পরাধীনতা ও দমন ছাড়া আর কিছুই কামনা করে না,
এবং এই লক্ষ্য অর্জনে তারা ধর্মীয় ও একাডেমিক মুখোশ ব্যবহার করতেও পিছপা হয় না।

প্রতিরোধমূলক মাহদাভিয়াত: সভ্যতাগত ও আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি
আয়াতুল্লাহ আ’রাফি বলেন, প্রতিরোধমূলক মাহদাভিয়াত এবং সভ্যতাভিত্তিক, আশাবাদী প্রতীক্ষা আজকের যুবসমাজ ও ইসলামি সমাজের একটি মৌলিক প্রয়োজন।

এটাই ইসলামী বিপ্লবের সেই গভীর আহ্বান, যা বিশ্বের মাজলুম জনগোষ্ঠী গ্রহণ করে এবং যার বিরুদ্ধে অহংকারী ও আধিপত্যবাদী শক্তিগুলো সংঘবদ্ধ হয়।

সম্মেলনের মূল বার্তা
তিনি উপসংহারে বলেন, ২১তম ডকট্রিন অব মাহদাভিয়াত সম্মেলনের মূল বার্তা হলো— “প্রকৃত মাহদাভিয়াত ও সত্যিকারের প্রতীক্ষায় প্রত্যাবর্তন।” এই দৃষ্টিভঙ্গি একদিকে সভ্যতা-নির্মাণকারী, অন্যদিকে বৈশ্বিক ও মানবিক; একই সঙ্গে এটি সাম্রাজ্যবাদ ও সায়োনিজমের বিরুদ্ধে দৃঢ়, স্পষ্ট ও আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করে।

আলেম, চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের দায়িত্ব হলো এই ধারণাকে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা এবং ইসলামি বিশ্ব ও তার বাইরেও তা বিস্তৃত করা।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha