সোমবার ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ - ১২:৪৪
ইরানের পার্লামেন্টের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে কী ঘটেছে?

ইরানের পার্লামেন্ট আজ সোমবার একটি রুদ্ধদ্বার অধিবেশন আয়োজন করে, যেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ অংশ নেন। বৈঠকে পররাষ্ট্রনীতি, পরমাণু আলোচনা এবং জাতীয় প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির সর্বশেষ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: এই অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল সাইয়্যেদ আব্দুল রহিম মুসাভি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি। বৈঠকে জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা–সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে পার্লামেন্টের প্রেসিডিয়াম বোর্ডের মুখপাত্র আব্বাস গুদারজি বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর যৌথ উপস্থিতি এই বার্তাই দেয় যে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানে কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা খাত পরস্পরের সঙ্গে পূর্ণ সমন্বয় ও পরিপূরকতার ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, সংসদ সদস্য ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জোর দিয়ে উল্লেখ করেন যে কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা আলাদা কোনো পথ নয়; বরং এগুলো একটি অভিন্ন জাতীয় সক্ষমতার অংশ, যা ইরান ও তার জনগণের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে।

বৈঠকে পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের প্রধানসহ একাধিক সংসদ সদস্য তাদের মতামত তুলে ধরেন। তারা অতীতের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি এড়ানোর আহ্বান জানান এবং পূর্ববর্তী ঘটনাবলির আলোকে আলোচক দলের সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

আইনপ্রণেতারা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও প্রতারণার একটি সুস্পষ্ট ও নথিভুক্ত ইতিহাস রয়েছে, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পুরো আলোচনাপ্রক্রিয়ায় অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। তারা জোর দিয়ে বলেন, আলোচনা হতে হবে শক্তি ও কর্তৃত্বের অবস্থান থেকে এবং ইরানের পরমাণু শিল্প সংরক্ষণ একটি অলোচনাতীত ‘রেড লাইন’।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাকচি ও মেজর জেনারেল মুসাভির বক্তব্যের প্রসঙ্গে গুদারজি জানান, বৈঠকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে ইরান কোনো অবস্থাতেই শূন্য শতাংশ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ মেনে নেবে না। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণকে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি অবিচ্ছেদ্য অধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এছাড়া জানানো হয়, ওমানে শুক্রবার অনুষ্ঠিতব্য আলোচনার স্থান ও কাঠামো সম্পূর্ণভাবে ইরানের পক্ষ থেকেই নির্ধারিত হয়েছে, যা দেশটির কূটনৈতিক কর্তৃত্বের প্রতিফলন।

গুদারজি আরও জানান, মেজর জেনারেল মুসাভি সাম্প্রতিক ১২ দিনের যুদ্ধ প্রসঙ্গে বলেন, এটি ছিল শত্রুপক্ষের ২০ বছরের পরিকল্পনার ফল, যা শেষ পর্যন্ত ইরানি জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়েছে এবং শত্রুর সব হিসাব-নিকাশ ভেস্তে গেছে।

বৈঠকে ইরানের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি নিয়ে একটি প্রতিবেদনও উপস্থাপন করা হয়। এতে বলা হয়, দেশটির প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি হাইব্রিড ও বহুমাত্রিক যুদ্ধ মোকাবিলার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ইরানের প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা পরিমাণগত ও গুণগত—উভয় দিক থেকেই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

কর্মকর্তারা জানান, ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলি শাসনের বহুস্তরবিশিষ্ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম হয়েছিল এবং বর্তমানে ইরানের সামরিক সক্ষমতা সেই সময়ের তুলনায় আরও উন্নত।বৈঠকে জাতীয় ঐক্যকে ইরানের শক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে অভিহিত করা হয়।

অংশগ্রহণকারীরা সামাজিক সংহতি রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং জাতীয় নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করতে পারে—এমন যেকোনো কর্মকাণ্ড এড়িয়ে চলার আহ্বান জানান।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু আলোচনা প্রসঙ্গে গুদারজি বলেন, পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে যে এই আলোচনা ইরানের প্রস্তাব অনুযায়ী পরোক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যদিও আলোচক দলগুলোর মধ্যে সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ হতে পারে।

তিনি বলেন, কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন যে ইরান কোনো মূল্য বিবেচনা না করে চুক্তি করতে আগ্রহী নয়; মর্যাদা ও জাতীয় স্বার্থই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। পাশাপাশি বলা হয়, দেশের সামরিক ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলোকে আলোচনার ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত করা হবে না।

পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের ঘালিবাফ বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় কূটনীতিও এক ধরনের সংগ্রাম। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরান তার নীতিগত অবস্থান—বিশেষ করে পরমাণু সমৃদ্ধকরণ ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা—থেকে কোনোভাবেই সরে আসবে না।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাকচি বলেন, যেকোনো চুক্তি বা সিদ্ধান্ত ইরানের পার্লামেন্টের আইন ও প্রস্তাবের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক কূটনীতিতে আরও মনোযোগ দেওয়ার কথাও তুলে ধরেন।

বৈঠকের শেষ পর্যায়ে অংশগ্রহণকারীরা একমত হন যে হুমকির মুখে কোনো ধরনের আলোচনা গ্রহণযোগ্য নয়।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha