হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী,
রিপোর্ট: মুস্তাক আহমদ
১৯৭৯ সালের ১১-ই ফেব্রুয়ারি, এই তারিখ কেবল ইরানের ইতিহাস বদলায়নি; এটি বিশ্বমানবতার বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ইরানের ইসলামী বিপ্লব ছিল এমন এক ঘটনা, যা প্রমাণ করেছিল—ক্ষমতা বন্দুকের নল থেকে নয়, বরং মানুষের বিশ্বাস, আত্মমর্যাদা ও নৈতিক সাহস থেকে জন্ম নেয়। আজ ৪৭ বছর পর প্রশ্ন ওঠে—এই বিপ্লব কি কেবল একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর জন্য, নাকি এর সুফল সমগ্র বিশ্বের জন্য?
(১) কুরআনের প্রতিশ্রুতি ও ইতিহাসের বাস্তবতাঃ পবিত্র কুরআন বলে— “আমি ইচ্ছা করেছি যাদেরকে পৃথিবীতে দুর্বল করে রাখা হয়েছে, তাদেরকে নেতা বানাব এবং তাদেরকেই উত্তরাধিকারী করব।”
(সূরা আল-কাসাস: ৫)
ইরানের ইসলামী বিপ্লব এই আয়াতের বাস্তব সাক্ষ্য। শাহের স্বৈরতন্ত্র, পশ্চিমা আধিপত্য ও সাংস্কৃতিক দাসত্বের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ যখন রাস্তায় নেমেছিল, তখন তাদের হাতে ছিল না আধুনিক অস্ত্র—ছিল আল্লাহর উপরে বিশ্বাস ও নিজেদের অর্জিত সব কিছু দিয়ে আত্মত্যাগ। তাই ইতিহাস প্রমাণ করেছে, এই শক্তিকে কোনো সাম্রাজ্য দমাতে পারেনি।
ইমাম খোমেনি (রহঃ) বলেছিলেনঃ “আমরা আমেরিকার বিরুদ্ধে নই; আমরা জুলুমের বিরুদ্ধে।”
এই একটি বাক্যই ইরানি বিপ্লবের সারকথা। এটি কোনো জাতি বা ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান। এই দৃষ্টিভঙ্গিই আজ বহু নাস্তিক বা ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাবিদকেও ভাবতে বাধ্য করেছে—রাষ্ট্র কি কেবল শক্তির ভিত্তিতে চলবে, নাকি ন্যায়ের ভিত্তিতেও চলতে পারে?
(২) একচেটিয়া বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প চিন্তাঃ ইরানের বিপ্লব পশ্চিমা বিশ্বকে প্রথমবারের মতো স্পষ্ট বার্তা দেয়—সভ্যতার একমাত্র পথ ওয়াশিংটন বা প্যারিস দিয়ে যায় না। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও জনগণের মতামতের সমন্বয়েও রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে।
এ প্রসঙ্গে কুরআন সতর্ক করে— “আল্লাহ জালিমদের পছন্দ করেন না।” (সূরা আশ-শূরা: ৪০)
এই আয়াতের আলোকে ইরান বিশ্ব রাজনীতিতে একটি নৈতিক প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—শক্তিশালী হওয়া মানেই কি ন্যায্য হওয়া?
(৩) ইসলাম: ভয় নয়, ন্যায়ের ভাষাঃ ইসলামকে দীর্ঘদিন ‘সন্ত্রাস’ শব্দের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ইরানের ইসলামী বিপ্লব দেখিয়েছে—ইসলাম মানে নিপীড়িতের পাশে দাঁড়ানো, ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কথা বলা। সৈয়দ আয়াতুল্লাহ আলী খামেনাঈ (হা.) বলেন— “ইসলামী বিপ্লব কাউকে জোর করে বিশ্বাসী বানাতে চায় না; এটি মানুষকে চিন্তা করতে আহ্বান জানায়।”
এই বক্তব্য নাস্তিক ও সমালোচকদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা—এটি কোনো অন্ধ অনুসরণের ডাক নয়, বরং বিবেক জাগানোর আহ্বান।
(৪) নিষেধাজ্ঞার মাঝেও আত্মমর্যাদাঃ ৪৭ বছর ধরে ইরান কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তবু দেশটি ভেঙে পড়েনি। বরং বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও প্রতিরক্ষা খাতে আত্মনির্ভরতার পথ দেখিয়েছে। কুরআন নির্দেশ দেয়— “মুমিনরা যেন অন্যায়ের শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ না করে।”
(ভাবার্থ)
এই শিক্ষা কেবল মুসলমানদের জন্য নয়; এটি সব স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য—যে জাতি আত্মমর্যাদা রক্ষা করে, সে জাতি মাথা উঁচু করে বাঁচে।
(৫) বিরোধীদের জন্য একটি খোলা প্রশ্নঃ ইরানের বিপ্লবের সমালোচনা করা যায়—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না:
যদি এই বিপ্লব এতটাই ব্যর্থ হতো, তবে ৪৭ বছর পরও কেন এটি টিকে আছে? কেন এখনো নিপীড়িত মানুষের মুখে “প্রতিরোধ” শব্দটি উচ্চারিত হয়?
ইমাম রুহুল্লাহ খোমেনি (রহঃ)-এর সেই অমর উচ্চারণ আজও প্রাসঙ্গিক— “আমরা দায়িত্ব পালন করেছি; ফলাফল আল্লাহর হাতে।”
ইরানের ইসলামী বিপ্লব কোনো ফেরেশতাদের রাষ্ট্র কায়েম করেনি—এটি মানুষ দ্বারা পরিচালিত একটি বাস্তব রাষ্ট্র। তবু এই বিপ্লব বিশ্বকে দিয়েছে একটি বিকল্প, একটি প্রশ্ন এবং একটি সাহসী চিন্তা:
ন্যায়, আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতা কি এখনও সম্ভব?
এই প্রশ্নের মুখোমুখি হলে—সমর্থক, বিরোধী কিংবা নাস্তিক—সবারই এক মুহূর্ত থামা উচিত। কারণ ইতিহাস প্রমাণ করেছে, যে বিপ্লব মানুষকে ভাবতে শেখায়, সেটাই সবচেয়ে শক্তিশালী বিপ্লব।
আপনার কমেন্ট