বৃহস্পতিবার ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ - ০৯:৪৮
ইমাম খোমেনী (রহ.)-এর ভাষণে ইসলামি বিপ্লবের বিজয়ের রহস্য

হাওজা / ইমাম (রহ.) ইসলামি বিপ্লবের বিজয়ের রহস্য হিসেবে বিশ্বাস, ঐক্য, ইসলামের ওপর নির্ভরশীলতা, জনগণের আধ্যাত্মিক পরিবর্তন, শাহাদাতের ভালোবাসা এবং আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহকে মনে করেন। যে জাতি আল্লাহর জন্যে উঠে দাঁড়িয়েছে, মৃত্যুকে ভয় পায়নি, ঐক্যবদ্ধ হয়েছে এবং ঈমানের শক্তিতে তাগুত ও মহাশক্তিগুলোকে পরাস্ত করেছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আপনারা যা পড়তে যাচ্ছেন তা হলো ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতার ভাষণ থেকে সংগৃহীত ইসলামি বিপ্লবের বিজয়ে কার্যকর কারণ সম্পর্কে কিছু নির্বাচিত অংশ, যা আপনাদের সামনে পেশ করা হলো।

জনগণের প্রতিরোধ

ইরানের জনগণের প্রতিরোধ বিশ্বে অতুলনীয়। ইরানের জনগণ জাহান্নামী স্বৈরাচার ধ্বংস করতে এমন বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম করেছে যা পশ্চিমা ও পূর্বী বিশ্বকে বিস্মিত করেছে; রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম যা শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা ও মুক্তি এনে দেবে। 

বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে ঐক্য ও সংহতি

আমাদের সাফল্যের রহস্য, যা বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলোকে পিছু হটিয়ে দিয়েছে এবং পহলভী বংশের মতো এক শয়তানি শক্তিকে ধ্বংস করেছে, সেই রহস্য হলো বিভিন্ন শ্রেণীর এই ঐক্য ও ঐকমত্য। যদি শুধু ধর্মীয় নেতৃত্ব একাই তাদের সাথে যুদ্ধে যেতে চাইত, তবে তাদের দমন করা হতো; লেখকরা যদি একাই তাদের বিরুদ্ধে যেতে চাইতেন, তাদের ধ্বংস করা হতো; বিশ্ববিদ্যালয় যদি একা এটি করতে চাইত, পারত না; বাজার যদি একা এটি করতে চাইত, সম্ভব হতো না; কৃষক যদি একা করতে চাইত, পারত না। আমরা যা কিছু অর্জন করেছি এবং ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতেও করব, তা জাতির বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে সৃষ্ট এই সংহতির ফল। আর আমাদের এই সংহতি রক্ষা করতে হবে।

ঈমানের বিকাশ ও অন্তরের পরিবর্তন

এই সুদৃঢ় বিশ্বাস যা এই জাতিতে বিকশিত হয়েছিল, এই পরিবর্তন যা ঘটেছিল এবং এদেশের মুসলমানদের অন্তরে যে বিপ্লব সৃষ্টি হয়েছিল, সেটাই ছিল বিজয়ের রহস্য। 

ঐকমত্য ও পারস্পরিক সংহতি

আমরা সবাই ভাই এবং সবাইকে একসঙ্গে থাকতে হবে। আমাদের বিজয়ের রহস্য ছিল এই ঐকমত্য ও পারস্পরিক সংহতি। আমাদের বিজয়ের রহস্য ছিল মহান আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ ও ইসলামের সুরক্ষা। এই রহস্য রক্ষা করো, এই ঐক্য রক্ষা করো, এই সংহতি রক্ষা করো। 

ইসলামের ওপর নির্ভরশীলতা ও শাহাদাতের ভালোবাসা

লোকেরা রাজনীতির জন্যে নয়, ইসলামের জন্যে রক্ত দেয়; ইসলামি রাজনীতির জন্যে। আমাদের জাতি ইসলামের ওপর নির্ভরশীলতার মাধ্যমেই এই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছে। আমাদের জাতি শাহাদাতপ্রিয় ছিল; শাহাদাতের ভালোবাসা নিয়েই এই আন্দোলন এগিয়েছে। যদি এই ভালোবাসা ও অনুরাগ না থাকত, আমরা কখনো এত শক্তির মুখে বিজয়ী হতে পারতাম না। আমাদের বিজয়ের পেছনে কারণ ছিল তোমরা সবাই ইসলামি ছিলে, সবাই ধর্মের প্রতি মনোযোগী ছিলে। 

আল্লাহর ওপর নির্ভর ও আন্দোলনের আধ্যাত্মিকতা

আজ আমাদের বিজয়ের রহস্য হলো আমরা মহান আল্লাহর ওপর নির্ভর করেছি। আমাদের বিজয়ের রহস্য হলো এটি শুধু রাজনৈতিক ছিল না, শুধু তেল ও এজাতীয় বিষয়ের জন্যে ছিল না; এটি ছিল আধ্যাত্মিক, ছিল ইসলামি। আমাদের তরুণরা শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা করত, আমাদের তরুণরা শাহাদাতকে বরণ করে নিত; যেমনটি ইসলামের প্রারম্ভকালে ইসলামের সৈন্যরা শাহাদাতকে বরণ করত। আমাদের সৈন্যরা শাহাদাতে ভয় পায় না কারণ তারা মৃত্যুকে... ধ্বংস হওয়া বলে মনে করে না। আমাদের সৈন্যরা শাহাদাতকে সৌভাগ্য মনে করে এবং এই সৌভাগ্যের জন্যে প্রচেষ্টা চালায়। বিজয়ের রহস্য ছিল কুরআনের ওপর নির্ভর এবং এই পবিত্র পদ্ধতি যে তারা শাহাদাতকে বরণ করত, তাদের অন্তরে ভয় ছিল না। যখন ট্যাংক ও মেশিনগান তাদের দিকে গুলি ছুটত, তারা তা বরণ করত; তাদের কোনো ভয় ছিল না। মুষ্টি ট্যাংকের ওপর বিজয়ী হয়েছে, মুষ্টি মেশিনগানের ওপর বিজয়ী হয়েছে, মুষ্টি মহাশক্তিগুলোর ওপর বিজয়ী হয়েছে। এই রহস্য রক্ষা করো; যতদিন এই বিজয়ের রহস্য রক্ষা করবে, ততদিন তোমরা বিজয়ী থাকবে। আমাদের জাতি যতদিন আল্লাহর সাথে আছে, ততদিন বিজয়ী। আমাদের জাতি যতদিন তার আশ্রয় ইসলাম, ততদিন বিজয়ী। কুরআনের পতাকা যতদিন আমাদের জাতির মাথার ওপর উড্ডীয়মান, ততদিন বিজয়ী। এই রহস্য রক্ষা করো। স্মরণ রেখো, পূর্ববর্তী আন্দোলনগুলো ছিল হয় রাজনৈতিক, না হয় আধা-ইসলামি। আজকের আন্দোলন সম্পূর্ণ ইসলামি; আজকের আন্দোলন আল্লাহর জন্যে। সবাই চিৎকার করে বলে ইসলাম, সবাই চিৎকার করে বলে ইসলামি প্রজাতন্ত্র। এই রহস্যই আমাদের বিজয়ী করেছে; আর তোমরাও এই রহস্য রক্ষা করো। 

ঈমানই বিজয়ের রহস্য

বিজয়ের রহস্য ছিল ঈমান। সেই ঐকমত্য এনেছে ঈমান। ঈমান এনেছে ঐকমত্য, যার ফলে একটি দেশের সর্বত্র, সবাই একসঙ্গে, সবাই একসঙ্গে চিৎকার করেছে এবং একটি বিষয় দাবি করেছে। কেন্দ্র থেকে শুরু করে দেশের সর্বত্র তারা সমবেত হয়েছে, শব্দ পৌঁছে গেছে এবং সবাই চিৎকার করেছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র, ইসলাম। তারা শাহাদাতকে নিজেদের জন্য সৌভাগ্য মনে করেছে। যারা সবকিছু থেকে পলায়ন করত, তারাই ট্যাংক ও কামানের

ওপর আক্রমণ চালিয়েছে, শয়তানের বাহিনী, তাগুতের ওপর বিজয়ী হয়েছে। এই রহস্য রক্ষা করো, এই আন্দোলন রক্ষা করো, এই ঐকমত্য রক্ষা করো। 

আল্লাহর অনুগ্রহ ও আধ্যাত্মিক শক্তি

ইসলামই তোমাদেরকে গতিশীল করেছে এবং তোমাদের এমন শক্তি দিয়েছে যে, তোমরা এই বৃহৎ শয়তানি শক্তির সামনে দাঁড়িয়েছ এবং ভয় পাওনি। এই শক্তি আল্লাহ তোমাদের দিয়েছিলেন; নইলে আমরা তো দুর্বল বান্দা, আমাদের কিছুই নেই... এটা ছিল আল্লাহর শক্তি। এটা ছিল সেই জিনিস যা আল্লাহ তোমাদের অনুগ্রহ করেছেন এবং তোমাদের এই আল্লাহর অনুগ্রহ রক্ষা করতে হবে। এই আল্লাহর অনুগ্রহ রক্ষা করা, যা ইনশাআল্লাহ সব বিজয়ের উৎস হবে, তা হলো আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপগুলো সবাই মিলে সমর্থন করা। যেমন শুরুতে ঈমানই উৎস ছিল এই আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়ার। আর তোমাদের সবার ঐক্য, তোমাদের অন্তরের ঈমানের কারণে, এমন শয়তানি শক্তিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করার কারণ হয়েছিল। এটি ছিল এক অনুগ্রহ, মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ... যেদিন তোমরা ময়দানে ও রাস্তায় নেমেছিলে, তারা বিরাট অস্ত্র নিয়ে আর তোমরা মুষ্টি নিয়ে, তোমরা একবারও ভাবোনি আমার বেতন কম, বেতন তখন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, প্রাণও গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, বেতন পাওয়ার আগে। এই মনোভাবই তোমাদের বিজয়ী করেছিল। এটি রক্ষা করো, এই জিনিস যা তোমাদের বিজয়ী করেছিল! যতদিন তা তোমাদের কাছে থাকবে, ততদিন তোমরা বিজয়ী। 

মহান আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন এবং আমরা বিজয়ী হব। যেমনিভাবে এই পথে আমাদের সামনে যে বিরাট শক্তি ছিল এবং তার পৃষ্ঠপোষক ছিল সমস্ত শক্তি, মহাশক্তিসহ অন্যরাও, কিন্তু যেহেতু সদিচ্ছা ছিল এবং লোকেরা পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল সেই লোকদের মতো যারা ইসলামের প্রারম্ভকালে ছিল... সেই কারণে, আমাদের এই বিজয় ঋণী মানুষের অন্তরে সৃষ্ট সেই আধ্যাত্মিক পরিবর্তনের। নইলে আমাদের কাছে অস্ত্র ছিল না, কোনো ব্যবস্থা ছিল না, যুদ্ধনীতি অনুযায়ী কোনো কাজও ছিল না। যা ছিল তা হলো মানুষের মধ্যে ঈমান, এবং আলহামদুলিল্লাহ, ঐকমত্য। আর আমি মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি এই ঐকমত্য যেন সংরক্ষিত থাকে, এবং ইনশাআল্লাহ আমাদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। 

ইসলামের প্রতি জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও সর্বস্তরের ঐক্য

আর যে বিষয়গুলো সম্পর্কে আমার তাগিদ দেওয়া প্রয়োজন, তা হলো ইরানে সংঘটিত এই বিপ্লব দুটি বিষয়ের ফলে বিজয়ী হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল যে, জনগণ ইসলাম নিয়ে এগিয়ে গেছে; অর্থাৎ এই দেশের সর্বত্র তাদের স্লোগান ছিল, আমরা ইসলাম চাই। অতীতের সেই পচা শাসনব্যবস্থা থেকে—যা একটি কলুষিত শাসনব্যবস্থা ছিল—জনগণ তাদের সারা জীবনে অনেক অত্যাচার দেখেছে। আমাদের তরুণরা চোখ খোলার পর থেকে সারা জীবন শুধু অত্যাচারই দেখেছে। আর তারা এই শাসনব্যবস্থাকে পচা বলে জানত। অন্যদিকে তারা মুসলমান ছিল। তারা ইসলামের প্রতি বিশ্বাসী ছিল। এ কারণে আমরা কোনো জাতির কাছ থেকে কোনো বিষয় গ্রহণ করতে চাইলে দেখতে হবে সেই জাতির ভাষা কী, তাহলেই বুঝতে পারব সেই জাতি কী চায়। আমরা নিজেরা যদি সিদ্ধান্ত দিতে বসি যে আমাদের এই জাতি অমুক বিষয় চায়, সেটা ভুল কথা। সঠিক কথা হলো আমরা জাতির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করব। জাতির কণ্ঠস্বর শুনব, দেখব তারা কী চায়। যে জাতি সবাই চিৎকার করে বলে আমরা ইসলামি প্রজাতন্ত্র চাই, 'না প্রাচ্য, না পাশ্চাত্য, ইসলামি প্রজাতন্ত্র', আমাদের আর অধিকার নেই যে বসে বলি না, এই জাতি যে আন্দোলন করেছে, তারা গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করেছে। ইসলামের সুস্থ অর্থে সব কিছু আছে। কিন্তু আমরা দেখছি সব মানুষ বলছে আমরা ইসলামি প্রজাতন্ত্র চাই। আমাদের অধিকার নেই যে ব্যাখ্যা করে বসে থাকি এবং নিজেরা যা ইচ্ছা তা বলি যে না, লোকেরা যা বলছে তা নয়, আমরা তাদের গলায় অন্য কিছু চাপিয়ে দেব। এটা বাস্তবতাবিরোধী। আর দ্বিতীয় বিষয় ছিল, সব শ্রেণী একসঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। এই ব্যাপারে সবাই ঐক্যবদ্ধ ছিল। যদি কেউ কেউ বিপথগামীও ছিল, জনগণের সেই উদ্দীপনায় তারা নীরব ছিল, নাশকতা করেনি। সবাই একত্রে কাজ করেছে ও এগিয়ে গেছে এবং সবাই একসঙ্গে ইসলাম চেয়েছিল। এই দুটি বিষয়ই এই দেশের বিজয়ের মূল ভিত্তি ছিল। 

শয়তানের শক্তির মোকাবিলায় ঈমানের শক্তি

তোমরা দেখলে যে একটি জাতি, যার সংখ্যা কম ছিল, কোনো অস্ত্র ছিল না, কোনো যুদ্ধাস্ত্র ছিল না, কোনো সামরিক শক্তি ছিল না, কিন্তু তাদের কাছে ঈমানের অস্ত্র ছিল, সেই ঈমানের অস্ত্র দিয়ে তারা এক শয়তানি শক্তির ওপর জয়ী হয়েছে, যার পিছনে ছিল সমস্ত শক্তি। শুধু মহাশক্তিই নয়, সমস্ত শক্তি তার পেছনে ছিল। এটি ছিল ঈমানের শক্তি, যা কিছুই ছিল না এমন এক মুষ্টিমেয় মানুষকে জয়যুক্ত করেছে। এটা সেই একই শক্তি, যা ইসলামের সূচনালগ্নে স্বল্প উপকরণ ও স্বল্প সংখ্যক মানুষ নিয়ে রোমকে তার সব আয়োজনসহ এবং ইরানের সম্রাজ্যকে তার সব উপকরণসহ পরাস্ত করেছিল। তারা ছিল ঈমানশূন্য, আর এরা ছিল ঈমানে পরিপূর্ণ, তাই তারা জয়ী হয়েছে।

আত্মত্যাগ ও আল্লাহমুখিতা

এই বহুমুখী চিন্তার উদ্রেক এবং নিজেকে বিসর্জন দিয়ে আল্লাহমুখী হওয়া—সত্যি কথা হলো আমাদের জাতি নিজেকে বিসর্জন দিয়ে আল্লাহমুখী হয়েছে। তার প্রবৃত্তি যা চাইত, সে দিকে তার ভ্রূক্ষেপ ছিল না। তার সব মনোযোগ ছিল ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। এটা ছিল আল্লাহমুখিতা। নিজেকে বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর সাথে যুক্ত হওয়া। এই রহস্যই বিজয়ের রহস্য। 

আল্লাহর জন্যে কিয়াম

তোমরা দেখলে যে এই জাতির মধ্যে দুটি দিক ছিল যা আমাদের জাতির বিজয়ের রহস্য: এক. তখন তারা নিজেদের ব্যক্তিগত চাহিদার বিষয়ে আদৌ ভাবছিল না। সবাই একসঙ্গে বলছিল 'আল্লাহু আকবার'। সবাই একসঙ্গে 'ইসলামি প্রজাতন্ত্র'। সবাই একসঙ্গে 'সাবেক শাসনব্যবস্থা না'। কেউ সেদিন ভাবছিল না যে আমার অবস্থা কী হবে। যদি কেউ তার বন্ধুর কাছে অভিযোগও করত, বন্ধু তাকে নিয়ে হাসত যে এখন এ সব কথার সময় নয়। পরিস্থিতি এমন হয়েছিল। দুই. আরেক দিক হলো এরা সবাই যখন একত্রিত হয়েছিল, তখন তা ছিল আল্লাহর জন্যে। প্রমাণ হলো তারা যেখানেই গেছে স্লোগান দিয়েছে আমরা শহীদ হতে চাই। শাহাদাত এমন একটি বিষয় যা আল্লাহর জন্যে। সুতরাং এই বিজয়ে দুটি দিক ছিল: এক. তা ছিল আল্লাহর জন্যে—'আল্লাহু আকবার' স্লোগান দিয়ে এবং আমরা আল্লাহর জন্যে এই কাজ করতে চাই, আমরা ইসলামি প্রজাতন্ত্র চাই—এই স্লোগান। দুই. তারা একসঙ্গে ঐক্যবদ্ধ ছিল। তারা এককণ্ঠ ছিল। ছোট্ট শিশু আর আশি বছরের বৃদ্ধ একই ধরনের কথা বলত, আর আমাদের শত্রুরা এই দুটি ঘাঁটিকে লক্ষ্য করেছিল। সাবেক শাসনব্যবস্থার এই বাঁধ ভাঙার প্রথম থেকেই শত্রুরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে এবং তাদের একটি দল ইসলামি দিক নিয়ে নাশকতা শুরু করে। ভালোভাবে লক্ষ্য করো, এই দুটি বিষয়ই আমাদের চোখের সামনে রয়েছে এবং আক্রান্ত হয়েছে। ইসলামি দিকটি আক্রান্ত হয়েছে। তারা বলেছে, আমরা ইসলাম চাই না, শুধু প্রজাতন্ত্র চাই! এটা ছিল ইসলামি দিকটির ওপর আক্রমণ, কারণ তারা ইসলামের অধীনতা মেনে নিতে চায়নি। কারণ ওই বিশেষজ্ঞরা বুঝতে পেরেছিল যে এই বিজয় ইসলাম থেকে এসেছে। লোকেরা প্রজাতন্ত্রের জন্যে এসে শহীদ হতে চায় না। লোকেরা ইসলামের জন্যে বলে আমরা শহীদ হতে চাই। এখনো তারা কাফন পরে, তা ইসলামের জন্যে, প্রজাতন্ত্রের জন্যে নয়, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের জন্যে নয়। 

জনগণের আন্দোলনের সাথে আল্লাহর সঙ্গ

সবাইকে এই অর্থ স্মরণ রাখতে হবে যে আমাদের এ বিপ্লবের বিজয় ছিল ইসলামের বরকতে, ইসলামের প্রতি আকর্ষণের ফলে এবং 'আল্লাহু আকবার' স্লোগানের মাধ্যমেই এই বিজয় অর্জিত হয়েছে। কেউ যেন ধারণা না করে যে কোনো ব্যক্তি বা দল আমাদের জন্য বিজয় অর্জন করে দিয়েছে। না, এই মহান আল্লাহ নিজেই যখন দেখলেন যে লোকেরা তাঁর পথে কিয়াম করেছে, তখন তিনি তাদের সাথে সঙ্গ দিলেন। 

আল্লাহর অনুগ্রহে জনগণের আভ্যন্তরীণ বিপ্লব

এই জাতির অভ্যন্তরীণ বিপ্লব এই বিপ্লবের সূচনা ঘটিয়েছে এবং তাদের সেই অভ্যন্তরীণ বিপ্লব ও ইসলাম সম্পর্কে তাদের উপলব্ধি এবং মহান আল্লাহর প্রতি তাদের মনোনিবেশই এই পুরো সময়কালে—যে সময়ে আমরা আছি, প্রথম থেকেই যখন আন্দোলন শুরু হয়, পরে তা বিপ্লবে রূপ নেয়, তারপর বিজয়ী হয় এবং এখন পর্যন্ত—তোমরা দেখতে পাচ্ছ জাতির উপস্থিতি ও জাতির অঙ্গীকার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি বিপ্লবের জন্যে নয়, এটি অভ্যন্তরীণ বিপ্লবের জন্যে। বিপ্লব সর্বত্র হয়েছে, অনেক জায়গায় হয়েছে, এই দেশ ও এই ভূখণ্ডে এই অভ্যন্তরীণ বিপ্লবের সূচনা হয়েছে, যা মহান আল্লাহর অনুগ্রহ ছাড়া আর কিছুই নয়। আমাদের নিজেদের কিছুই নেই, যা কিছু ছিল তাঁরই অনুগ্রহ যা এই আভ্যন্তরীণ বিপ্লব সৃষ্টি করেছে এবং আমাদের নিজ জাতি যেটা ভালো করেই জানে পূর্বেকার সেই অবস্থা থেকে পরিবর্তিত হয়ে এই অবস্থায় এসেছে যা তারা এখন দেখছে। এটাই বিপ্লবকে বিজয়ী করেছে। বিজয়কে আমাদের জনগণের অভ্যন্তরীণ বিপ্লবেই খুঁজতে হবে এবং যতক্ষণ না এই অর্থ অর্জিত হয়, বিপ্লবগুলো কেবল এক ক্ষমতা থেকে অন্য ক্ষমতায় হস্তান্তরের বিপ্লব হবে এবং জাতির অবস্থা আগের মতোই থাকবে। 

উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যে ঐকমত্য

নিঃসন্দেহে ইসলামি বিপ্লবের টিকিয়ে রাখার রহস্যও সেই বিজয়ের রহস্যই; আর বিজয়ের রহস্য জাতি জানে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইতিহাসে পড়বে যে এর দুটি প্রধান স্তম্ভ হলো: আল্লাহর উদ্দেশ্য ও ইসলামি সরকারের মহান লক্ষ্য; এবং সেই একই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যে সারাদেশে ঐকমত্যের সাথে জাতির সম্মিলন। 

সূত্রসমূহ:
১৯) সহিফায়ে ইমাম, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ২৮০-২৮

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha