হাওজা নিউজ এজেন্সি: বর্তমান উত্তেজনাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পরিবেশে ওয়াশিংটনের কিছু মহলে আবারও “সামরিক বিকল্প” আলোচনায় এসেছে। যেন গত দুই দশকের অভিজ্ঞতা উপেক্ষিত হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্মৃতি ম্লান হয়ে গেছে। নীতিনির্ধারণী বিশ্লেষণকেন্দ্র বা থিঙ্ক ট্যাঙ্কে সামরিক পদক্ষেপকে হয়তো কার্যকর ও সীমিত বলে মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবতার ময়দান বারবার প্রমাণ করেছে—যুদ্ধের হিসাব কাগজে-কলমে যতটা সহজ, বাস্তবে ততটা নয়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত পেছনে ফিরে দেখা—এই অঞ্চলে তাদের সামরিক হস্তক্ষেপ কী ফল দিয়েছে এবং কী মূল্য আদায় করেছে।
আফগানিস্তান: দ্রুত পতন, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ
১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে। অল্প সময়ের মধ্যে তালেবান সরকার পতন হয় এবং দ্রুত বিজয়ের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু সেই প্রাথমিক সাফল্যের পর শুরু হয় দীর্ঘ ক্ষয়যুদ্ধ, যা প্রায় বিশ বছর স্থায়ী হয়। হাজার হাজার মার্কিন সেনা নিহত ও আহত হন; ব্যয় হয় শত শত বিলিয়ন ডলার।
শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে সেই একই তালেবানের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হয়, যাদের উৎখাত করাই ছিল অভিযানের প্রধান লক্ষ্য। বিশ্বমাধ্যমে প্রচারিত বিশৃঙ্খল প্রত্যাহারের দৃশ্য এখনও আন্তর্জাতিক স্মৃতিতে অম্লান। কাবুল থেকে তড়িঘড়ি করে সেনা প্রত্যাহার এবং পুনরায় তালেবানের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন—সব মিলিয়ে এই দীর্ঘ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো সুস্পষ্ট কৌশলগত সাফল্য এনে দিতে পারেনি।
ইরাক: শাসন পরিবর্তন, কিন্তু প্রত্যাশিত ফল নয়
ইরাকেও প্রায় একই অভিজ্ঞতা দেখা গেছে। গণবিধ্বংসী অস্ত্র ধ্বংস এবং সাদ্দাম হোসেনের সরকার উৎখাতের অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে হামলা চালায়। বাগদাদ পতনের পর যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটেনি; বরং শুরু হয় দীর্ঘ অস্থিরতা, সহিংসতা ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার অধ্যায়।
মানবিক ও আর্থিক ব্যয় ছিল বিপুল। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান ও বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পরবর্তী সময়ে ইরাকের রাজনৈতিক কাঠামো এমনভাবে গড়ে ওঠে, যা ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র যে কৌশলগত প্রভাববলয়ের প্রত্যাশা করেছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি। বরং বহু আঞ্চলিক সমীকরণে ইরাক তেহরানের নিকটবর্তী অবস্থান নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ছিল এক কৌশলগত বৈপরীত্য।
সামরিক শক্তি কি রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে?
আফগানিস্তান ও ইরাকের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে—কোনো দেশে সামরিক হামলা চালানো মানেই দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বিজয় নয়। সামরিক শক্তি দিয়ে একটি রাষ্ট্রের সরকার পরিবর্তন করা সম্ভব হলেও স্থিতিশীল ও অনুগত রাজনৈতিক কাঠামো নির্মাণ করা অনেক বেশি জটিল।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে—ইরানের মতো একটি বৃহৎ, সুসংগঠিত ও কৌশলগতভাবে প্রস্তুত রাষ্ট্র কি আফগানিস্তান বা ইরাকের চেয়ে সহজ লক্ষ্য হতে পারে?
ইরান: সহজ প্রতিপক্ষ নয়
ইরান একটি বৃহৎ জনসংখ্যাসম্পন্ন দেশ, যার রাজনৈতিক কাঠামো সুসংহত এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। চার দশকের বেশি সময় ধরে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ও বহুমাত্রিক চাপ দেশটিকে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়াতে এবং প্রতিরোধমূলক শক্তি গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক কৌশলগত গভীরতা এই বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এমন একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিলে তার প্রতিক্রিয়া সীমিত থাকবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। বরং সংঘাত আঞ্চলিক মাত্রা অতিক্রম করে বৃহত্তর পরিসরে বিস্তৃত হতে পারে। “স্বল্পমেয়াদি ও কম ব্যয়ের যুদ্ধ” ধারণাটি তাই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ইরান কেবল একটি ভূখণ্ড নয়; আঞ্চলিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা কাঠামোয় তার বিস্তৃত সম্পর্ক রয়েছে। ফলে সরাসরি সংঘাত বৃহত্তর মাত্রা নিতে পারে। আফগানিস্তান ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র যে শক্তিগুলোর মুখোমুখি হয়েছিল, তারা একটি প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের সমপর্যায়ের সামরিক সক্ষমতা রাখত না। তবুও সেই যুদ্ধগুলো দীর্ঘস্থায়ী সংকটে রূপ নিয়েছিল।
এখন আলোচ্য বিষয় এমন একটি রাষ্ট্র, যার সুসংগঠিত প্রতিরক্ষা কাঠামো ও দীর্ঘ সংকট-ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে সম্ভাব্য ব্যয় ও ঝুঁকি প্রাথমিক হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।
অর্থনীতি, জনমত ও কৌশলগত অগ্রাধিকার
অর্থনৈতিক দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। উচ্চ সরকারি ঋণ, বাজেট ঘাটতি ও সামাজিক বিভাজন পরিস্থিতিকে সংবেদনশীল করে তুলেছে। নতুন যুদ্ধে জড়ানো মানে বিপুল আর্থিক ব্যয় এবং অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা।
আগের দুই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল অর্থনীতিও দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযানের অভিঘাত থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত নয়। একই সময়ে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা যখন ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার, তখন পশ্চিম এশিয়ায় নতুন ফ্রন্ট খোলা তার কৌশলগত মনোযোগকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে।
মার্কিন জনমতও এখন আর আগের মতো দীর্ঘস্থায়ী দূরবর্তী যুদ্ধকে সমর্থন করে না। দীর্ঘ দুই দশকের অভিজ্ঞতা ও হতাহতের স্মৃতি এখনও জনমানসে রয়ে গেছে। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিলে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে—চূড়ান্ত লক্ষ্য কী, সফলতার সংজ্ঞা কী এবং কীভাবে অতীতের পুনরাবৃত্তি এড়ানো হবে।
উপসংহার: ইতিহাসের সামনে নতুন প্রশ্ন
ইরান অতীতে দেখিয়েছে—বাহ্যিক চাপের মুখে তারা প্রতিরোধের কৌশল গ্রহণ করে। ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা দেশটিকে নত করতে পারেনি; বরং বহু ক্ষেত্রে দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই সামরিক হামলার মাধ্যমে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ভেঙে দেওয়া সম্ভব হবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। বরং সরাসরি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হবে।
আফগানিস্তান দেখিয়েছে—সরকার পতন ঘটানোই দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পথের শুরু। ইরাক দেখিয়েছে—শাসন পরিবর্তন মানেই অনুগত মিত্র সৃষ্টি নয়। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধ আরও জটিল, বিস্তৃত ও ব্যয়বহুল হতে পারে।
আজকের প্রশ্ন তাই সরল কিন্তু গভীর—যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই অতীতের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়েছে? নাকি আবারও এমন এক সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, যার পরিণতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে?
কৌশলগত বিচক্ষণতা নির্দেশ করে—সামরিক বিকল্পের পরিবর্তে কূটনীতি ও সংলাপের পথ অনুসরণ করাই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত। কারণ নতুন যুদ্ধ হয়তো দ্রুত শুরু করা সম্ভব, কিন্তু তার সমাপ্তি কত দূরে—সেই হিসাব ইতিহাস বারবার অনিশ্চিত করে দিয়েছে।
আপনার কমেন্ট