দাম্পত্য জীবনে সাপ্তাহিক ছুটি কীভাবে সামলাবেন?

দাম্পত্য জীবনের শুরুতে নবদম্পতিকে ঘিরে উভয় পরিবারের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। বিশেষ করে ছুটির দিন কিংবা সপ্তাহান্তে ছেলে-মেয়েকে নিয়মিত নিজেদের কাছে দেখতে চাওয়ার প্রবণতা প্রায় সব পরিবারেই দেখা যায়। অনেক সময় এই প্রত্যাশা থেকে অভিমান, অভিযোগ কিংবা মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এটিকে কোনো পারিবারিক সংকট বা অস্বাভাবিক আচরণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি পরিবারব্যবস্থার একটি স্বাভাবিক মানসিক প্রতিক্রিয়া, যার মূল উৎস সন্তানদের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও আন্তরিক টান।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: পরিবার বিশেষজ্ঞ হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন রেজা ইউসুফজাদে এ বিষয়ে বলেন, দাম্পত্য জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে অন্যতম বড় এবং স্বাভাবিক চ্যালেঞ্জ হলো— পরিবারের পক্ষ থেকে প্রত্যেক ছুটি বা সপ্তাহান্তে নবদম্পতির উপস্থিতি প্রত্যাশা করা। বিশেষ করে ঐতিহ্যনির্ভর পরিবারগুলোতে সন্তানদের বিয়ের পরও আগের মতোই নিয়মিত সময় দেওয়ার প্রত্যাশা থাকে। ফলে নবদম্পতি যদি নিজেদের ব্যক্তিগত সময়, বন্ধুবান্ধব কিংবা আলাদা কোনো পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেন, তখন পরিবারে একধরনের মানসিক অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।

মনোবিজ্ঞান ও পরিবার-পরামর্শবিদ্যায় এ প্রসঙ্গে “ডিফারেনসিয়েশন” বা “স্বতন্ত্র সত্তা বিকাশ” নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা রয়েছে। এর অর্থ হলো— একজন ব্যক্তি যেন একইসঙ্গে নিজের স্বাধীন সত্তা বজায় রাখতে পারেন এবং পরিবারের সঙ্গে সুস্থ সম্পর্কও অটুট রাখেন। অর্থাৎ দাম্পত্য জীবন শুরু হওয়ার পর নতুন পরিবার গড়ে তোলার পাশাপাশি আগের পারিবারিক সম্পর্কগুলোকেও সম্মান ও ভারসাম্যের সঙ্গে ধরে রাখা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভারসাম্য তৈরি করতে হলে নবদম্পতিকে ধীরে ধীরে এবং অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে নিজেদের ব্যক্তিগত সীমারেখা নির্ধারণ করতে হবে। কারণ কোনো সম্পর্কের সীমা বা দূরত্ব হঠাৎ করে তৈরি করা যায় না। যদি আচমকা দূরত্ব সৃষ্টি করা হয়, তাহলে পরিবারের সদস্যরা নিজেদের অবহেলিত বা প্রত্যাখ্যাত মনে করতে পারেন।

এ ক্ষেত্রে একটি কার্যকর পদ্ধতি হলো— দেখা করার সময় ঘনিয়ে আসার আগেই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং তাদের অনুভূতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, “আমরাও খুব চাইছিলাম আপনাদের সঙ্গে সময় কাটাতে, কিন্তু এ সপ্তাহে আগে থেকেই কিছু কাজ বা বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে পরিকল্পনা রয়েছে।” এ ধরনের বক্তব্যে যেমন আন্তরিকতা প্রকাশ পায়, তেমনি পরিবারও বুঝতে পারে যে সম্পর্কের গুরুত্ব কমে যায়নি।

তিনি আরও বলেন, পরিবারের সদস্যদের “অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণকারী” বা “হস্তক্ষেপকারী” বলে নেতিবাচকভাবে চিহ্নিত করা উচিত নয়। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের আচরণের পেছনে থাকে সন্তানের প্রতি ভালোবাসা, উদ্বেগ এবং একসঙ্গে সময় কাটানোর আকাঙ্ক্ষা। তাই বিরূপ প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে সহমর্মিতা ও ইতিবাচক আচরণ সম্পর্ককে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে।

পরিবারের সদস্যদের দেখা করার আগ্রহকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাদের প্রতি নিজের ভালোবাসা ও মায়ার প্রকাশ ঘটানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে তারা নিজেদের অবহেলিত বা বিচ্ছিন্ন মনে করেন না। ছোট ছোট আন্তরিক বাক্য, খোঁজখবর নেওয়া কিংবা বিকল্প সময়ে সাক্ষাতের প্রস্তাব— এসবই পারিবারিক সম্পর্ককে উষ্ণ ও দৃঢ় রাখে।

সবশেষে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দাম্পত্য জীবনে স্বাধীনতা ও পারিবারিক সংযোগের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো— স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সমঝোতা, একমত হওয়া এবং যেকোনো সিদ্ধান্তের আগে নিজেদের মধ্যে পরিষ্কার আলোচনা করা। কারণ দম্পতি যদি একসঙ্গে সুস্পষ্ট অবস্থান নিতে পারেন, তাহলে নতুন জীবনের সীমারেখা সুন্দর ও স্বাস্থ্যকরভাবে গড়ে তোলা অনেক সহজ হয়ে যায়।

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha