শুক্রবার ১৯ জুন ২০২৬ - ১০:৩৫
শোক পালনের দর্শন: আমরা কেন ইমাম হোসাইন (আ.)-এর জন্য কাঁদি?

ইরানের প্রখ্যাত হুকুম-আহকাম (ধর্মীয় বিধান) বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন ওয়াহিদ পূর ইমাম হোসাইন (আ.)-এর শোক পালনের দর্শন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, মাসুম ইমামগণ আল্লাহর কাছে সর্বাধিক নৈকট্যপ্রাপ্ত ও শ্রেষ্ঠ মানুষ এবং তাঁর অতি প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত। এরূপ প্রিয়জনদের বিদায় আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: পবিত্র মহররম মাস উপলক্ষে ‘শোক পালনের বিধান ও শহীদদের সর্দার ইমাম হোসাইন (আ.)-এর শোকানুষ্ঠানের আদব’ সম্পর্কে ধারাবাহিক আলোচনার সূচনা করা হয়েছে। এই আলোচনায় আহকাম বিষয়ক বিশেষজ্ঞের সাক্ষাৎকারটি ধারাবাহিকভাবে পরিবেশিত হবে, যা আপনাদের সব শোকাহতদের জন্য উৎসর্গ করা হলো:

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম

صلی‌الله‌علیک یا اباعبدالله

ইয়া আবা আব্দিল্লাহ! আপনার প্রতি আল্লাহর সালাম ও দরুদ বর্ষিত হোক)

সবাইকে জানাই শুভেচ্ছা ও সমবেদনা এবং শোকবার্তা।

স্বাভাবিকভাবে, কোনো মুসলমান যখন কোনো বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করে, তখন সে সেই বিশ্বাস অনুযায়ীই কাজ করে। যেমন, যখন মানুষ মহান প্রভুর স্রষ্টা, পালনকর্তা ও মালিক হওয়ার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে—অর্থাৎ আল্লাহকে নিজের মালিক, স্রষ্টা ও রব হিসেবে জানে—তখন স্বাভাবিকভাবেই তাঁর সামনে বিনীত হয় ও তাঁর আনুগত্য করে।

কিন্তু এই আনুগত্য কিভাবে সম্পাদিত হয়?
ঠিক সেভাবেই, যেমনটি আল্লাহ নিজেই নির্ধারণ করেছেন। আমরা আল্লাহর নির্ধারিত বিধানসমূহ পালনে উদ্যত হই; নামাজ পড়ি, রুকু-সিজদা করি এবং অন্যান্য ইবাদত সম্পাদন করি। সুতরাং, সেই বিশ্বাসের ভিত্তিতেই আমাদের আচরণ প্রকাশ পায়।

এখন, আমাদের আকিদা (বিশ্বাস) অনুযায়ী ধর্মীয় নেতাদের প্রতিও আমাদের কিছু কর্তব্য রয়েছে; প্রথমত, নবী ও ইমামদের (আ.) প্রতিও এরূপ।

মাসুম ইমামগণ সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস কী?
আমাদের বিশ্বাস হলো, মাসুম ইমামগণ মহান আল্লাহর কাছে সর্বাধিক নৈকট্যপ্রাপ্ত ও শ্রেষ্ঠ মানুষ। তারা পাপমুক্ত (মাসুম) এবং আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।

এই ভিত্তিতে, যদি আমরা তাদের সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান (মারিফত) রাখি, তবে নিশ্চয়ই আমরা তাদের অত্যন্ত সম্মান করব; তা তাদের জীবদ্দশায় হোক বা শাহাদাতের পরে—আমাদের কাছে তা একই, কারণ তাঁরা সর্বদা আমাদের কাছে সম্মানিত ও প্রিয়পাত্র। তাই এরূপ প্রিয়জনদের হারানো আমাদের জন্য বেদনাদায়ক ও হৃদয়বিদারক।

এখানেই ‘মুসিবত’ (বিপদ-দুঃখ) শব্দটির অর্থ সুস্পষ্ট হয়। প্রিয়জনকে হারিয়ে শোক করা একটি স্বাভাবিক মানবিক বিষয়। আমরা এমনকি নিজেদের নিকটাত্মীয়দের জন্যও শোক করি, অশ্রুপাত করি এবং অনুষ্ঠানের আয়োজন করি। যেমন, কেউ পিতা, মাতা, ভাই বা সন্তানকে হারালে তাদের প্রতি ভালোবাসা ও আসক্তির কারণে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে শোক পালন করে।

কিন্তু আমরা যদি এই দৃষ্টিভঙ্গির চেয়ে আরও গভীরে যাই, তাহলে দেখি আমরা একজন ইমামকে হারিয়েছি; একজন মাসুমকে হারিয়েছি—যিনি সৃষ্টিগত (তাকউইনি) ও বিধানগত (তাশরিইয়ি) উভয় ক্ষেত্রেই আল্লাহর ফয়জ (অনুগ্রহ) বর্ষণের মাধ্যম। তাই তাঁর শোকে আমরা শোকাহত হব; তা সাধারণ শোক নয় এবং তা একটি স্বাভাবিক মৃত্যুর শোকও নয়। আমরা এমন এক মহা বিপর্যয়ের কথা বলছি, যার প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত বেদনাদায়ক; এমন এক বিপর্যয় যার জন্য আসমানসমূহ ও জমিনের বাসিন্দারা ক্রন্দন করেছে।

এখন আমি এই প্রশ্নটি উত্থাপন করছি: আমরা মানুষ কি আসমান ও জমিনের চেয়ে পিছিয়ে থাকতে পারি? আমরা কি ফেরেশতাদের চেয়ে পিছিয়ে থাকতে পারি?

আমাদের হাদিসসমূহের ভিত্তিতে—এখানে আমাদের প্রধান ভিত্তি হলো আকিদা—ফেরেশতাগণ ও সমগ্র আসমান-জমিন এই ঘটনার শোকে শোকাহত, বিপর্যস্ত ও ক্রন্দনরত। অতএব, আমাদের শোক পালনের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও সুদৃঢ় প্রামাণ্য ভিত্তি রয়েছে।

ইনশাআল্লাহ, আগামী পর্বগুলোতে কুরআনি ও হাদিসভিত্তিক সেই সমর্থনসমূহ আপনাদের কাছে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হবে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha