শনিবার ১১ জুলাই ২০২৬ - ১০:৪২
ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর নূরানি বাণীর আলোকে ঈমানভিত্তিক জীবনাচারের উপাদানসমূহ

পবিত্র ‘সহিফায়ে সাজ্জাদিয়া’-এর দোয়াসমূহ গভীরভাবে অধ্যয়ন করলে ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর নির্দেশনায় ঈমানভিত্তিক জীবনাচারের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ও মৌলিক উপাদানগুলো স্পষ্টভাবে জানা যায়।

হাওজা নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইমাম যায়নুল আবিদীন (আ.)-এর বরকতময় দোয়াসংকলন ‘সহিফায়ে সাজ্জাদিয়া’ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। এতে ইসলামী সংস্কৃতির মৌলিক বৈশিষ্ট্য ও মূল্যবোধ সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং একজন মুমিনের জীবনধারা গঠনে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

সহিফায়ে সাজ্জাদিয়ার গবেষক এবং কুরআন ও হাদিস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এহসান পুর-ইসমাঈল বলেন, জীবনধারা হলো এমন একটি পদ্ধতি, যা মানুষ তার সমগ্র জীবন পরিচালনার জন্য বেছে নেয়। এর ভিত্তি পরিবারে গড়ে ওঠে এবং সংস্কৃতি, জাতিগত পরিচয়, ধর্ম, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা, বিশ্বাস ও মূল্যবোধ দ্বারা প্রভাবিত হয়।

তিনি বলেন, মানুষের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয়ের মতো জীবনধারারও শিকড় ধর্মে নিহিত। মানবজাতির পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে পবিত্র কুরআন মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিক পথনির্দেশনা দিয়েছে। আর আহলে বাইত (আ.) কুরআনের শিক্ষাকে ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি নিজেদের জীবনাচরণে কুরআনিক জীবনধারার বাস্তব প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। তাই জীবনধারা বলতে এমন এক সুসংগঠিত আচরণব্যবস্থাকে বোঝায়, যার ভিত্তি গড়ে ওঠে বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও সামাজিক রীতিনীতির ওপর এবং যা ধর্মীয় শিক্ষার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত।

ধর্ম ছাড়া প্রকৃত জীবন নেই
ড. পুর-ইসমাঈল বলেন, প্রকৃত জীবন বিশুদ্ধ ধর্মীয় শিক্ষার ওপর প্রতিষ্ঠিত। যদিও মানুষ বিভিন্ন সময়ে এই জীবনধারাকে তার মৌলিক পথ থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করেছে, তবুও আমাদের বিশ্বাস—ধর্মপরায়ণ মানুষই প্রকৃত অর্থে জীবিত। যেমন আমিরুল মুমিনিন ইমাম আলী (আ.) বলেছেন:

لا حياةَ إلا بالدِّين.

ধর্ম (দ্বীন) ছাড়া প্রকৃত জীবন নেই।

তিনি বলেন, এই নূরানি বাণীর আলোকে বোঝা যায়, আমাদের চারপাশে অনেক মানুষ শারীরিকভাবে জীবিত থাকলেও প্রকৃত অর্থে জীবনযাপন করছেন না।

ধর্মীয় চরিত্র গঠনে পরিবারের অপরিসীম গুরুত্ব
তিনি আরও বলেন, একজন মানুষকে প্রকৃত আদর্শের সঙ্গে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। সৎ ও আদর্শবান পিতা-মাতার ঘরেই আদর্শ সন্তান বেড়ে ওঠে। যেমন প্রবাদে বলা হয়, "গম থেকে গম, যব থেকে যব জন্মায়।"

তিনি বলেন, পবিত্র কুরআন তার সমগ্র মহিমা সত্ত্বেও সবার জন্য নয়; বরং মুত্তাকিদের জন্য হিদায়াত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ.

"এটি মুত্তাকিদের জন্য পথনির্দেশ।" (সূরা আল-বাকারা, ২:২)

অর্থাৎ ইসলামের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি সেই ব্যক্তির অন্তরে স্থান করে নেয়, যার মধ্যে প্রাথমিক তাকওয়া বিদ্যমান। অন্যথায় আল্লাহ তাআলা বলেন—

 وَلَا يَزِيدُ الظَّالِمِينَ إِلَّا خَسَارًا.

"আর এটি জালিমদের ক্ষতিই বৃদ্ধি করে।"  (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৮২)

ড. পুর-ইসমাঈল বলেন, এই প্রাথমিক তাকওয়ার ভিত্তি পরিবারেই নির্মিত হয়। এরপর সমাজের অন্যান্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে পরিকল্পিতভাবে সেই ভিত্তিকে আরও সমৃদ্ধ করতে হবে। যার মধ্যে প্রাথমিক তাকওয়া রয়েছে, সে অহংকার ও গোঁড়ামিতে লিপ্ত হয় না; বরং সত্য গ্রহণে প্রস্তুত থাকে। এমন মানসিকতা সেই পরিবারেই গড়ে ওঠে, যেখানে সন্তান তার পিতা-মাতার আচরণে প্রবৃত্তির ওপর দ্বীনের প্রাধান্য প্রত্যক্ষ করে।

তিনি আরও বলেন, পরিবারের পর ইসলামী জীবনধারা গঠনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো বিদ্যালয় এবং এরপর উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কারণ, শিক্ষক ও অধ্যাপকদের চরিত্র ও আচরণ নতুন প্রজন্মের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। আর তৃতীয় স্তম্ভ হলো সমাজের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ, যাদের দায়িত্ব পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গড়ে ওঠা জ্ঞান ও মূল্যবোধকে আরও শক্তিশালী করা।

উদ্বেগ থেকে জন্ম নেওয়া কিছু প্রশ্ন
ড. পুর-ইসমাঈল বলেন, একটি প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে আমাকে ভাবিয়ে তোলে—আজ আমাদের দেশের কোন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান তরুণদের হালাল উপার্জনের শিক্ষা দেয়? কোন প্রতিষ্ঠান তাদের সফল দাম্পত্য জীবন গঠনের প্রয়োজনীয় শিক্ষা প্রদান করে?

তিনি বলেন, আজ প্রয়োজন সমাজের গুরুত্বপূর্ণ জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়গুলো নতুনভাবে পর্যালোচনা করা এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সুস্পষ্ট দায়িত্ব বণ্টন করা, যাতে প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠান মানুষের জীবন গঠনের নির্দিষ্ট একটি ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, আমরা যেমন তরুণ প্রজন্মকে ইসলামী জীবনধারার পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা দিতে পারিনি, তেমনি মধ্যবয়সী প্রজন্মও জানে না কীভাবে বর্তমান তরুণদের সঙ্গে আচরণ করতে হয়। তারা ইমাম আলী (আ.)-এর সেই শিক্ষা—নিজ সময়কে যথাযথভাবে উপলব্ধি করা—বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারেনি। এখান থেকেই প্রজন্মগত ব্যবধান সৃষ্টি হয় এবং এর ফলে সমাজকে অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।

তিনি আরও বলেন, মানুষের সৃষ্টিগত ফিতরাত যেহেতু তাওহীদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত, তাই সময় ও স্থানের পরিবর্তন তার মৌলিক মূল্যবোধকে পরিবর্তন করতে পারে না। সততা, মানবিক মর্যাদা ও মনুষ্যত্ব অতীতেও মূল্যবোধ ছিল, আজও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তেমনি জুলুম সব যুগেই নিন্দনীয় ছিল এবং থাকবে। তাই ইসলামী জীবনধারার আদর্শ কখনো যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তিত হয় না।

হুসাইনি অশ্রুর মাধ্যমে শিয়া সমাজকে বিচ্যুতি থেকে রক্ষা
সহিফায়ে সাজ্জাদিয়ার এই গবেষক বলেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির উপযোগী আদর্শ জীবনধারা যে কোনো যুগ ও স্থানে কেবল আল্লাহর মনোনীত হুজ্জতের মাধ্যমেই জানা সম্ভব।

তিনি বলেন, ইমাম যায়নুল আবিদীন (আ.)-এর জীবনধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো কারবালার অতুলনীয় ঘটনার প্রতি তাঁর অবস্থান। তিনি সারাজীবন কারবালার স্মৃতি জীবন্ত রেখে শিয়া সমাজকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, হুসাইনি আন্দোলনের রক্তিম ধারা আজীবন আজাদারি ও শোকানুষ্ঠানের মাধ্যমে সংরক্ষণ করতে হবে। এভাবেই তিনি হুসাইনি অশ্রু ও শোকের মাধ্যমে শিয়া সমাজকে বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করার পথ সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha