হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, রুশ গণমাধ্যমগুলো তাদের প্রতিবেদনে শহীদ নেতার দাফনের স্থান, শোকানুষ্ঠানের বিবরণ, জনসাধারণের প্রতিক্রিয়া এবং তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানসহ বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করেছে।
রাশিয়ার সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো থেকে বোঝা যায়, এ অনুষ্ঠানকে তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অনুসরণ করেছে। কারণ এটি ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কোনো সংবাদমাধ্যম দাফনের স্থান ও অনুষ্ঠানের ধাপগুলো বর্ণনা করেছে, আবার কেউ অনুষ্ঠানের পরিবেশ, শহীদ নেতার জীবন এবং অংশগ্রহণকারীদের প্রতিক্রিয়ার ওপর আলোকপাত করেছে।
বিবিসি নিউজ রাশিয়ান (BBC News Russian): দাফনের স্থান ও অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে গুরুত্ব
বিবিসির রুশ ভাষা বিভাগ তাদের প্রতিবেদনে শহীদ নেতার দাফন অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে এবং মাশহাদে অনুষ্ঠিত দাফন ও সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসলামী বিপ্লবের শহীদ নেতার দাফন অনুষ্ঠান মাশহাদে সম্পন্ন হয়েছে এবং ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন শহরে টানা ছয় দিন ধরে শোক ও বিদায় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
বিবিসি জানায়, অনুষ্ঠানের শেষ দিনে হাজার হাজার মানুষ শহীদ নেতার জন্মস্থান ও ইরানের অন্যতম পবিত্র শহর মাশহাদের রাস্তায় সমবেত হন এবং সেখান থেকে তাঁর দাফনস্থল ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র মাজারের দিকে অগ্রসর হন।
সংবাদমাধ্যমটি লিখেছে, শহরের রাস্তাগুলো জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল এবং অনেক অংশগ্রহণকারীর হাতে শহীদ নেতার ছবি, ইরানের জাতীয় পতাকা এবং রাজনৈতিক স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড ছিল।
প্রতিবেদনের শেষে উল্লেখ করা হয়, আয়াতুল্লাহুল উযমা ইমাম শহীদ সাইয়্যিদ আলী খামেনেয়ী-কে শিয়া মুসলমানদের অন্যতম প্রধান পবিত্র স্থান ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র মাজারের পাশে দাফন করা হয়েছে।
‘ফোনতানকা’ (Fontanka): অনুষ্ঠানের বিবরণ ও দাফনস্থল
রুশ সংবাদমাধ্যম ফোনতানকা একটি বিস্তারিত প্রতিবেদনে শহীদ নেতার দাফন অনুষ্ঠান, দাফনের স্থান, শোকানুষ্ঠানের পরিবেশ, অংশগ্রহণকারীদের প্রতিক্রিয়া এবং তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেছে।
তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার ৯ জুলাই (১৮ তির) এক সপ্তাহব্যাপী শোকানুষ্ঠানের পর দাফন সম্পন্ন হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর মরদেহ উত্তর-পূর্ব ইরানের জন্মস্থান মাশহাদে, ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র মাজারে সমাহিত করা হয়।
ফোনতানকা জানায়, দাফনের আগে তাঁর মরদেহ জনাকীর্ণ রাস্তা অতিক্রম করে ধীরে ধীরে মাজারের সোনালি গম্বুজ ও মিনারের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। কালো পোশাক পরিহিত হাজারো শোকাহত মানুষ, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং হাতে ইরানের পতাকা ও শহীদ নেতার ছবি বহনকারী জনগণ এ শোভাযাত্রায় অংশ নেন।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং পথজুড়ে রাজনৈতিক বার্তাসংবলিত প্ল্যাকার্ড টানানো ছিল।
ফোনতানকা আরও জানায়, প্রচণ্ড গরম থাকা সত্ত্বেও মাজারের দিকে যাওয়া সব রাস্তা হাজারো মানুষের ভিড়ে পূর্ণ ছিল। শোকাহতদের স্বস্তির জন্য তাদের ওপর পানি ছিটিয়ে দেওয়া হচ্ছিল।
ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যমের উদ্ধৃতি দিয়ে তারা এ অনুষ্ঠানকে "কয়েক দিনের জাতীয় শোকানুষ্ঠানের চূড়ান্ত পর্ব" হিসেবে বর্ণনা করেছে, যেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শোকানুষ্ঠান প্রথমে তেহরানে শুরু হয় এবং পরে কোম, নাজাফ ও কারবালাসহ ইরান ও ইরাকের অন্যান্য ধর্মীয় কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয়। শেষে শহীদ নেতা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের মরদেহ চূড়ান্ত অনুষ্ঠানের জন্য মাশহাদে নিয়ে যাওয়া হয়।
ফোনতানকা আরও উল্লেখ করে, শিয়া ঐতিহ্যে শাহাদাতের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে এবং বিদেশি শত্রুর হামলায় শহীদ নেতার মৃত্যু ইরানে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উভয় দিক থেকেই বিশেষ তাৎপর্য অর্জন করেছে।
‘লেন্তা’ (Lenta.ru): জানাজা অনুষ্ঠানের প্রত্যক্ষ চিত্র
রুশ ওয়েবসাইট Lenta.ru শহীদ নেতার বিদায় অনুষ্ঠান নিয়ে একটি ভিন্নধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এটি তাদের আলোকচিত্রী ভ্যালেরি মেলনিকভ-এর তেহরানে সরেজমিন পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়।
প্রতিবেদনটি অনুষ্ঠানের বিবরণের পাশাপাশি রাজধানীর পরিবেশ, জনগণের ব্যাপক উপস্থিতি, সাংবাদিকদের কার্যক্রম, শোকাহত মানুষের আবেগ এবং অনুষ্ঠান পরিচালনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছে।
লেন্তা লিখেছে, তাদের আলোকচিত্রী অনুষ্ঠানের দিনগুলোতে তেহরানে উপস্থিত ছিলেন এবং শহীদ নেতাকে শেষ বিদায় জানাতে আসা মানুষের ওপর প্রতিবেদন তৈরি করেন।
ভ্যালেরি মেলনিকভের বর্ণনায় বলা হয়েছে, ভোর থেকেই মানুষ অনুষ্ঠানস্থলের দিকে যেতে শুরু করেন। বিদায় অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান স্থান ছিল ইমাম খোমেনী মুসাল্লা কমপ্লেক্স, যেখানে শহীদ নেতা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রধান বিদায় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদমাধ্যমটি জানায়, তেহরানের রাস্তায় বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম হয়েছিল। অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী কালো পোশাক পরেছিলেন এবং অনেকের হাতে ছিল ইরানের পতাকা ও শহীদ নেতার ছবি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনসমাগম এতটাই বেড়ে যায় যে সাংবাদিক সেটিকে মস্কোতে পূর্বে দেখা সবচেয়ে বড় জনসমাবেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করেছেন।
লেন্তা আরও জানায়, প্রচণ্ড গরমের প্রভাব কমাতে আয়োজকেরা শোকাহতদের মধ্যে পানি বিতরণ করেন এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর রাস্তা ও জনতার ওপর ঠান্ডা পানি ছিটিয়ে দেন।
তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অনুষ্ঠান চলাকালে সাংবাদিকরা কঠোর নিরাপত্তা বিধিনিষেধের মধ্যে কাজ করেন। তারা কেবল নির্ধারিত দলের সঙ্গে চলাচল করতে পারতেন এবং কিছু এলাকায় প্রবেশ সীমিত ছিল।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অংশগ্রহণকারীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন এবং মার্কিন ও ইসরায়েলি রাজনীতিবিদদের সমালোচনামূলক বার্তাসংবলিত প্ল্যাকার্ড বহন করেন।
লেন্তা আরও উল্লেখ করে, শেষ মুহূর্তে শহীদ নেতা ও তাঁর পরিবারের মরদেহ বহনকারী শোভাযাত্রার মূল পথ পরিবর্তন করা হয়, ফলে সাংবাদিকদেরও জনস্রোতের সঙ্গে নিজেদের পথ পরিবর্তন করতে হয়।
প্রতিবেদনের শেষে বলা হয়েছে, প্রচণ্ড গরম ও জনসমাগম সত্ত্বেও শোকাহতরা অনুষ্ঠান শেষ হওয়া পর্যন্ত উপস্থিত ছিলেন এবং স্বেচ্ছাসেবকেরা পানি বিতরণ ও ঠান্ডা পানি ছিটিয়ে তাদের সহায়তা করছিলেন।
আপনার কমেন্ট