রবিবার ১৬ আগস্ট ২০২৬ - ১৩:৩৮
ইরানের প্রতিরোধ আমেরিকার একমেরু বিশ্বব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়েছে

কিরগিজস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনৈতিক একাডেমির একজন অধ্যাপক ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে আমেরিকার ব্যর্থতার বিষয়টি নিয়ে একটি নিবন্ধে আলোচনা করেছেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, কিরগিজ প্রজাতন্ত্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনৈতিক একাডেমির অধ্যাপক, ‘ধর্ম, আইন ও রাজনীতি’ বিশ্লেষণ কেন্দ্রের পরিচালক এবং ইসলামি আইন, জননিরাপত্তা ও ধর্মীয় নিরাপত্তা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ কাদির মালেকভ বিশকেকে ইরানের সাংস্কৃতিক কাউন্সেলরের অনুবাদে তাসনিম সংবাদ সংস্থার কাছে দেওয়া এক নিবন্ধে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমেরিকার ব্যর্থতার প্রসঙ্গে লিখেছেন: ইরান দেখিয়ে দিয়েছে, প্রতিপক্ষের বিপুল বস্তুগত শ্রেষ্ঠত্ব আর তার রাজনৈতিক লক্ষ্য দ্রুত অর্জনের নিশ্চয়তা দেয় না। আর ঠিক এখানেই পূর্ববর্তী একমেরু বিশ্বব্যবস্থার সংকটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ প্রকাশ পায়।

নিবন্ধটির পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ নিচে দেওয়া হলো:

বিশ্বব্যবস্থা বর্তমানে গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের একটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শীতল যুদ্ধের অবসানের পর যে একমেরু বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল এবং যা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক-রাজনৈতিক, আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শ্রেষ্ঠত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, তা ধীরে ধীরে তার পূর্বের স্থিতিশীলতা ও দৃঢ়তা হারাচ্ছে। তবে বহুমেরুকেন্দ্রিকতার দিকে এই পরিবর্তন কেবল চীনের অর্থনৈতিক উত্থান, রাশিয়ার শক্তিবৃদ্ধি কিংবা ব্রিকসের বিস্তারের কারণে ঘটছে না। এই প্রক্রিয়ায় আরও একটি বিষয় রয়েছে, যা অনেক বেশি বিতর্কিত-ইরান।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ইরানের অবস্থান সম্পূর্ণ আলাদা। চীনকে আমেরিকার প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রাশিয়া ইউরেশিয়ায় পশ্চিমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সামরিক-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি। কিন্তু ইরান এমন অল্প কয়েকটি দেশের একটি, যা কয়েক দশক ধরে প্রকাশ্যভাবে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার নিরাপত্তা কাঠামো এবং ইসরায়েলের কৌশলগত আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে আসছে। এটি একটি মৌলিক পার্থক্য।

বেইজিং মূলত অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিযোগিতা করে। মস্কো পশ্চিমের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ খোলা রেখে সামরিক-রাজনৈতিক মোকাবিলার সমন্বয় করে। কিন্তু তেহরান প্রতিরোধের আরও সরাসরি একটি মডেল গড়ে তুলেছে-রাজনৈতিক, আদর্শিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক-কৌশলগত প্রতিরোধ।

তাই ইরানের গুরুত্ব শুধু তার অর্থনীতির আকার বা সামরিক সক্ষমতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত নয়। ইরানের প্রধান গুরুত্ব হলো কৌশলগত স্বাধীনতার একটি বাস্তব নজির ও কার্যকর মডেল তৈরি করা। ইরান প্রমাণ করেছে, অনেক বেশি শক্তিশালী একটি পক্ষের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ করা সম্ভব।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রচলিত শক্তির ভারসাম্যের দৃষ্টিকোণ থেকে বিপুল অসমতা রয়েছে। আমেরিকার অর্থনীতি অনেক বড়, বিশ্বজুড়ে সামরিক ঘাঁটির নেটওয়ার্ক রয়েছে, সবচেয়ে শক্তিশালী বিমান ও নৌবাহিনী রয়েছে, মিত্রদের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক রয়েছে, বিশ্বের একটি বড় অংশের আর্থিক অবকাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েলও প্রযুক্তির দিক থেকে অঞ্চলের অন্যতম উন্নত সামরিক শক্তি এবং ব্যাপক মার্কিন সমর্থন পেয়ে থাকে।

তবু বহু বছরের নিষেধাজ্ঞা, চাপ ও সামরিক প্রতিরোধের নীতি ইরানকে তার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির পথ থেকে সরে আসতে বাধ্য করতে পারেনি। ২০২৬ সালের ঘটনাবলি বিষয়টি আরও স্পষ্ট করেছে। সক্ষমতার বিপুল পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও দুই পক্ষের সংঘাত এমন দ্রুত রাজনৈতিক ফলাফল তৈরি করেনি, যা আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিপুল শ্রেষ্ঠত্বের কারণে প্রত্যাশিত হতে পারত।

এ ছাড়া ওয়াশিংটন বর্তমানে একই সঙ্গে চাপ অব্যাহত রাখছে এবং সংঘাত থেকে কূটনৈতিকভাবে বেরিয়ে আসার পথও খুঁজছে। ১১ আগস্ট রয়টার্স পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় আলোচনা অব্যাহত থাকার খবর জানিয়েছে, যদিও দুই পক্ষের মধ্যে এখনও ব্যাপক দূরত্ব রয়েছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও একই সময়ে চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা এবং সামরিক বা অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখার কথা বলছেন।

তাই এখনই ‘ইরানের সামরিক বিজয়’ সম্পর্কে কথা বলা অকাল। তবে অন্য একটি ফলাফল নিয়ে কথা বলা যায়, যার গুরুত্ব হয়তো আরও বেশি: ইরান দেখিয়েছে, প্রতিপক্ষের বিপুল বস্তুগত শ্রেষ্ঠত্ব আর তার রাজনৈতিক লক্ষ্য দ্রুত অর্জনের নিশ্চয়তা দেয় না। ঠিক এখানেই পূর্ববর্তী একমেরু বিশ্বব্যবস্থার সংকটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ প্রকাশ পায়।

ইরানের শক্তি শুধু তার সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কয়েক দশক ধরে ইরানের প্রতিরোধের মডেল গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে দেশীয় সামরিক-শিল্পভিত্তি, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, সমাজের রাজনৈতিক সংগঠন, দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও টিকে থাকার ক্ষমতা এবং সর্বোপরি আঞ্চলিক মিত্র ও অংশীদারদের একটি নেটওয়ার্ক, যাকে সাধারণত ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ বলা হয়।

এই নেটওয়ার্ক গুরুতর ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং বর্তমানে রূপান্তরের একটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই এটিকে অপরাজেয় কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা ভুল হবে। তবে ২০২৬ সালের গবেষণাগুলো অন্য একটি বিষয়ের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছে: ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাঠামোগুলো বহু পশ্চিমা মূল্যায়নে যে মাত্রার সক্ষমতা প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তার তুলনায় অনেক বেশি সহনশীল ও অভিযোজনক্ষম প্রমাণিত হয়েছে।

এটি সমকালীন যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম তুলে ধরে। একবিংশ শতাব্দীতে কোনো দেশের শক্তি শুধু তার বিমান, জাহাজের সংখ্যা কিংবা জিডিপির আকার দিয়ে নির্ধারিত হয় না। চাপ সহ্য করার ক্ষমতা, রাজনৈতিক সংকল্প ধরে রাখা, নিজস্ব প্রযুক্তিগত সমাধান তৈরি করা এবং সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার ব্যয় প্রতিপক্ষের জন্য বাড়িয়ে তোলার সক্ষমতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর ঠিক এই দৃষ্টিকোণ থেকেই ইরানের অভিজ্ঞতা গভীরভাবে পর্যালোচনার যোগ্য।

আমেরিকার অভ্যন্তরীণ সমস্যা হলো, যুদ্ধের বিষয়ে দেশটির জনগণের মধ্যে ঐকমত্য নেই। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরানের সঙ্গে সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও দ্বন্দ্ব ও বিভাজন সৃষ্টি করেছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের বসন্তে প্রায় ৫৯ শতাংশ আমেরিকান ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্তকে ভুল মনে করতেন, আর ৩৮ শতাংশ এটিকে সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করতেন। প্রায় ৬২ শতাংশ উত্তরদাতা ইরান বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপ অনুমোদন করেননি।

একই সঙ্গে গভীর দলীয় বিভাজনও রয়েছে। রিপাবলিকানদের মধ্যে সামরিক অভিযানের সমর্থন অনেক বেশি, অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা মূলত এর বিরোধিতা করেন। এমনকি রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে, বিশেষ করে বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে।

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসার কারণে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো মার্কিন সরকারের জন্য দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুধু সামরিক ব্যয়ের বিষয় নয়। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, বাজেটের ওপর চাপ, গোলাবারুদের ব্যবহার, মার্কিন সেনাদের জন্য ঝুঁকি এবং ভোটারদের অনিবার্য প্রশ্ন-যুদ্ধের চূড়ান্ত রাজনৈতিক লক্ষ্য কী এবং কী মূল্যে তা অর্জন করা হবে?-এসব প্রশ্নও সামনে আসে।

এখানেই অপেক্ষাকৃত দুর্বল পক্ষের একটি সুবিধা রয়েছে: তারা শক্তিশালী পক্ষের স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধকে দীর্ঘমেয়াদি ও রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল সমস্যায় পরিণত করতে পারে।

এ ছাড়া ওয়াশিংটন ও তেলআবিব সবসময় একটি একক রাজনৈতিক সত্তার মতো কাজ করে-এমন সরলীকৃত ধারণা থেকেও বিরত থাকা প্রয়োজন। আমেরিকা ও ইসরায়েলের কৌশলগত জোট এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী। তবে মিত্র হওয়া মানেই স্বার্থের সম্পূর্ণ অভিন্নতা নয়।

ইসরায়েলের কাছে ইরান মূলত একটি সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের প্রশ্ন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরান একটি অনেক বৃহত্তর বৈশ্বিক কৌশলের একটি অংশ, যার মধ্যে রয়েছে চীন, রাশিয়া, ইউরোপ, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং আমেরিকার অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বিষয়গুলো।

তাই ইসরায়েল বাস্তবিক অর্থে ইরানকে আরও গভীরভাবে দুর্বল করতে চাইতে পারে, অন্যদিকে ওয়াশিংটনকে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের ব্যয় এবং তা আমেরিকার বৈশ্বিক কৌশলের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, সেটিও বিবেচনা করতে হয়।

সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, এই দুই প্রশ্নের মধ্যে সম্ভাব্য ব্যবধান তত বাড়বে: ‘ইরানের বিরুদ্ধে কী করা কাম্য?’ এবং ‘এর জন্য আমেরিকা কতটা মূল্য দিতে প্রস্তুত?’ সময়ের সঙ্গে এই পার্থক্য কৌশলগত গুরুত্ব অর্জন করতে পারে।

আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ-সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন চুক্তি। ৭ আগস্ট ২০২৬-এ এই তিন দেশ মক্কায় যৌথ প্রতিরক্ষা বিষয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। সম্মিলিত নিরাপত্তার এই কাঠামো অনুযায়ী, কোনো একটি সদস্যের ওপর হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

এই চুক্তি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হতে পারে। তবে মূল প্রশ্ন জোটটির অস্তিত্ব নয়; বরং এর কৌশলগত অভিমুখ। অন্তত দুটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি রয়েছে:

প্রথমত, ইতিবাচক পরিস্থিতি: মুসলিম বিশ্বে একটি স্বাধীন শক্তিকেন্দ্র গড়ে উঠবে, যা ধীরে ধীরে বিদেশি নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর অঞ্চলের নির্ভরতা কমাতে সক্ষম হবে।

দ্বিতীয়ত, আরও বিপজ্জনক পরিস্থিতি: নতুন কাঠামোটি ইরানকে নিয়ন্ত্রণের একটি হাতিয়ারে পরিণত হবে এবং মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরে নতুন একটি বিভাজনরেখা তৈরি করবে।

বর্তমানে এই জোটকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইরানবিরোধী হিসেবে বিবেচনা করার মতো যথেষ্ট কারণ নেই। তাছাড়া ১০ আগস্ট ইরান প্রকাশ্যভাবে জানিয়েছে যে নতুন চুক্তি নিয়ে তাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ তারা দেখছে না। তাই এই নতুন জোটকে শুধু তেহরানের জন্য হুমকি হিসেবে ব্যাখ্যা করা কৌশলগত ভুল হবে।

তবে ইরান, তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে এই কাঠামো সুন্নি-শিয়া কিংবা আরব-ইরান সংঘাতের নতুন বিভাজনরেখায় পরিণত না হয়। এমন পরিস্থিতিতে প্রকৃত লাভবান হবে না মুসলিম বিশ্ব।

বাস্তব বহুমেরুকেন্দ্রিকতায় ইরানকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, তাকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা যদি সত্যিই স্বাধীনতার দাবি করে, তাহলে ইরানকে সেখান থেকে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়।

ইরান এই অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ দেশ। এর রয়েছে দীর্ঘ রাষ্ট্র পরিচালনার ঐতিহ্য, বিপুল জ্বালানি সম্পদ, ৯ কোটির বেশি জনসংখ্যা, শিল্প ও বৈজ্ঞানিক অবকাঠামো এবং পারস্য উপসাগর, কাস্পিয়ান সাগর, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে ভৌগোলিক সংযোগ।

ইরান একই সঙ্গে শাংহাই সহযোগিতা সংস্থা ও ব্রিকসের সদস্য। তাই ইরানকে কেন্দ্র করে নয়, বরং ইরানের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা মুসলিম বিশ্বের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কাঠামো প্রায় অনিবার্যভাবেই অঞ্চলটিকে পুরোনো বৈরী শিবিরে বিভক্ত করার ব্যবস্থা পুনরুৎপাদন করবে।

এর চেয়ে অনেক বেশি সম্ভাবনাময় একটি কাঠামো হতে পারে: তুরস্ক–ইরান–সৌদি আরব–পাকিস্তান, এর সঙ্গে মধ্য এশিয়ার দেশ ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে নিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা একটি স্বাধীন ইউরেশীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা।

বর্তমানে এই পরিকল্পনা রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে। এসব দেশের মধ্যে গুরুতর মতপার্থক্য রয়েছে। তবে কৌশলগত পরিবর্তন প্রায় সবসময় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার আগেই শুরু হয়।

আমার মতে, সমকালীন ইরানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ঠিক এখানেই নিহিত। ইরানকে আদর্শায়িত করা উচিত নয়। দেশটি গুরুতর অর্থনৈতিক সমস্যায় রয়েছে, নিষেধাজ্ঞার পরিণতি বহন করছে, অভ্যন্তরীণ সামাজিক দ্বন্দ্বের মুখোমুখি এবং সংঘাত ও মোকাবিলার জন্য বড় মূল্য দিচ্ছে। অর্থনৈতিক গবেষণাও সত্যিই দেখায় যে দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ইরানের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত বড় ব্যয় সৃষ্টি করেছে।

কিন্তু এসব সমস্যা স্বীকার করলেও মূল বিষয়টি বদলে যায় না। দশকের পর দশক নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ও সামরিক চাপের মধ্যেও ইরান তার রাষ্ট্রীয় কাঠামো, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ধারা এবং জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা ধরে রেখেছে।

এ কারণেই মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ইরানের অভিজ্ঞতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ইরান গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে দেখাচ্ছে যে একটি পরাশক্তির চাপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করা সম্ভব। তবে একই সঙ্গে ইরানের অভিজ্ঞতা এমন প্রতিরোধের মূল্যও দেখিয়ে দিচ্ছে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, যা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

ইরানের পথ যান্ত্রিকভাবে বা হুবহু অনুসরণ করা সম্ভব নয়। তবে এর মূল শিক্ষা অন্য জায়গায়: সরকার অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিকভাবে স্বাধীনতার মূল্য দিতে প্রস্তুত না থাকলে কৌশলগত সার্বভৌমত্ব অর্জন সম্ভব নয়।

সুতরাং, ইরানের চারপাশে যা ঘটছে, তা শুধু ইরান-সংক্রান্ত বিষয় নয়। আমরা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দুটি ভিন্ন মডেলের মুখোমুখি হচ্ছি।

প্রথম মডেলটি এমন একটি ব্যবস্থা বজায় রাখার ওপর প্রতিষ্ঠিত, যেখানে একটি পরাশক্তি ও তার মিত্রদের নেটওয়ার্ক অন্যান্য দেশগুলোর জন্য গ্রহণযোগ্য আচরণের কাঠামো নির্ধারণে অধিক অধিকার ও ক্ষমতা রাখে।

দ্বিতীয় মডেলটি একাধিক শক্তিকেন্দ্রের অস্তিত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যেখানে তাদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।

ইরান বাস্তবিক অর্থে দ্বিতীয় মডেলের দিকে পরিবর্তনে সহায়তা করছে, কারণ তার প্রতিরোধই আমেরিকার একতরফাভাবে শক্তি প্রয়োগের সক্ষমতাকে সীমিত করছে।

তবে এখানে আরেকটি মৌলিক বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। বহুমেরুকেন্দ্রিকতা নিজে থেকেই ন্যায়বিচারের সমার্থক নয়।

একাধিক বৃহৎ শক্তির মধ্যে বিভক্ত একটি বিশ্ব দুর্বল দেশগুলোর জন্য একমেরু বিশ্বের মতোই অন্যায্য হতে পারে। তাই প্রকৃত লক্ষ্য শুধু আমেরিকান একমেরু আধিপত্যের জায়গায় রাশিয়া, চীন, ইরান বা অন্য কোনো শক্তির আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা নয়।

প্রয়োজন এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, যা রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক আইন, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, পারস্পরিক সম্মান এবং বাস্তব শক্তির ভারসাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha