হাওজা নিউজ এজেন্সি: শুক্রবারের খুতবায় তিনি বলেন, আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ) ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিধান। সমাজে অন্যায়, দুর্নীতি ও নৈতিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে এ দায়িত্ব কখনো পরিত্যাগ করা যায় না।
তিনি বলেন, সাবেক ইরাকি শাসনামল কিংবা সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সময় বিশেষ পরিস্থিতির কারণে নীরবতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে যুক্তিসঙ্গত ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই অজুহাত আর গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলামী বর্ণনা এবং সাহাবি আবু যর আল-গিফারির অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, সত্য কথা বলার কারণে আবু যর নির্বাসন ও নির্যাতন সহ্য করেছিলেন। আলেমদেরও সেই আদর্শ অনুসরণ করা উচিত।
দুর্নীতিবিরোধী লড়াই
আয়াতুল্লাহ মুসাভি বলেন, দুর্নীতিবাজদের বিচারের আওতায় আনা এবং আত্মসাৎ করা রাষ্ট্রীয় সম্পদ উদ্ধার করা বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও আইনসভার যৌথ জাতীয় দায়িত্ব। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, দুর্নীতিবিরোধী অভিযান যেন জনমতকে বিভ্রান্ত করা বা প্রকৃত দুর্নীতিবাজদের আড়াল করার হাতিয়ারে পরিণত না হয়।
তিনি আরও সমালোচনা করেন এমন প্রস্তাবের, যেখানে অভিযুক্তরা আত্মসাৎ করা অর্থের একটি অংশ ফেরত দিলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের কথা বলা হয়। তাঁর ভাষায়, এ ধরনের ব্যবস্থা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে না; বরং তা অর্থপাচারকে বৈধতা দেওয়ার পাশাপাশি অভিযুক্তদের আবারও ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতার সমালোচনা
খুতবার আরেক অংশে তিনি কয়েকজন ইরাকি কর্মকর্তার যুক্তরাষ্ট্র সফর এবং ওয়াশিংটনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ইরাকের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা উচিত নয়। বিশেষ করে মার্কিন দূত টম ব্যারাকের সঙ্গে বৈঠকগুলোরও তিনি সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরাকি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে ইরাকি কমান্ডারদের হত্যার প্রসঙ্গ তুলে গর্ব প্রকাশ করেন এবং ইরাকি কর্তৃপক্ষের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রত্যাশা করেন। আয়াতুল্লাহ মুসাভির মতে, এসব মন্তব্যের যথাযথ ও মর্যাদাপূর্ণ জবাব না দেওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক এবং তা ইরাকের শহীদদের আত্মত্যাগ ও জাতীয় মর্যাদার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট
তিনি বলেন, ইরাক শুধু অর্থনৈতিক সংকটেই নয়, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোগত সংকটেও জর্জরিত। তাঁর মতে, পর্যাপ্ত পরিকল্পনা ও বিশেষজ্ঞ মতামত ছাড়া রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি থেকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় রূপান্তরের ফলে দেশে অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, একটি রাষ্ট্র পরিচালনা কেবল সফল বেসরকারি উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করতে পারে না। রাষ্ট্র পরিচালিত হয় শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, সুস্পষ্ট নীতি এবং কার্যকর শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে।
দক্ষতা ও সততার ভিত্তিতে সংস্কারের আহ্বান
আয়াতুল্লাহ মুসাভি বলেন, প্রকৃত সংস্কার তখনই সম্ভব, যখন দক্ষতা ও সততা একসঙ্গে নিশ্চিত করা হবে। তাঁর মতে, কোনো কর্মকর্তার আর্থিক সততা শুধু দাবির মাধ্যমে প্রমাণিত হয় না; বরং তাঁর সম্পদের উৎস ও আর্থিক লেনদেনের ইতিহাস স্বচ্ছভাবে যাচাই করা জরুরি। তিনি অভিযোগ করেন, উচ্চপদস্থ কিছু কর্মকর্তার ক্ষেত্রে এই মানদণ্ড অনুসরণ করা হয় না।
তিনি আরও বলেন, ইরাক এখনও একটি স্থিতিশীল ও প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। দেশ পরিচালনায় রাজনৈতিক কোটাভিত্তিক বণ্টন বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়; বরং দক্ষতা, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একইভাবে সামরিক বাহিনীসহ রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সংস্কারও কেবল পেশাদারিত্ব ও যোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমেই সম্ভব।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জাতীয় মর্যাদা রক্ষার আহ্বান
তিনি বিদেশ সফরে ইরাকি কর্মকর্তাদের আচরণের সমালোচনা করে বলেন, আন্তর্জাতিক আলোচনায় ইরাকের মর্যাদা, সার্বভৌমত্ব এবং শহীদদের আত্মত্যাগের সম্মান রক্ষা করা প্রত্যেক দায়িত্বশীল নেতার কর্তব্য।
এ প্রসঙ্গে তিনি মরহুম সাইয়্যিদ আবদুল আজিজ হাকিমের সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সঙ্গে বৈঠকের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দুর্বল অবস্থানকে কখনো কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। কারণ, এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব দেশের ওপর পড়ে।
গণজানাজার রাজনৈতিক তাৎপর্য
খুতবার শেষ অংশে আয়াতুল্লাহ মুসাভি বলেন, “শহীদ ইমাম সাইয়্যিদ আলী খামেনেয়ীর গণজানাজা শুধু একটি শোকানুষ্ঠান ছিল না; এটি ইরাকি সরকারের প্রতি একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তাও বহন করেছে। এর মূল বার্তা হলো—ইরাকের জনগণ বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভরতার বিরোধী এবং এমন নেতৃত্বের প্রতি অনুগত, যারা নিজেদের আদর্শ ও জাতির জন্য আত্মত্যাগ করেন।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং দেশটির প্রতিনিধিদের ইরাকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেওয়া দেশের স্বার্থের পরিপন্থী।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের বৈধতা জনগণের সেবা, জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং শহীদদের রক্তের প্রতি আনুগত্য থেকে আসে; বিদেশি শক্তির সন্তুষ্টি থেকে নয়।
খুতবার সমাপ্তিতে তিনি ইরাকি নেতাদের প্রতি জনগণের এই বার্তা অনুধাবনের আহ্বান জানান এবং স্মরণ করিয়ে দেন, কোনো ক্ষমতা বা পদ চিরস্থায়ী নয়। জনগণের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও আত্মসম্মানই রাষ্ট্রের বৈধতার প্রকৃত ভিত্তি।
শেষে তিনি ইরাকের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং দেশের সব জনগোষ্ঠীর ঐক্য ও শান্তি কামনা করে দোয়া করেন।
আপনার কমেন্ট