হাওজা নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, কোমের মুসল্লায়ে কুদসে অনুষ্ঠিত জুমার নামাজের খুতবায় আয়াতুল্লাহ সাঈদি এসব কথা বলেন।
ইয়েমেনে আনসারুল্লাহর বিজয় ও খোররামশাহর মুক্তির তুলনা
ইরানের বিরুদ্ধে চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের সূচনাবার্ষিকী ও পবিত্র প্রতিরক্ষা সপ্তাহের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বছর আমরা ইয়েমেনের আনসারুল্লাহর অভিযানের বিজয় প্রত্যক্ষ করছি।
সৌদি ভাড়াটে বাহিনীর কাছ থেকে ইয়েমেনের হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার কৌশলগত অঞ্চল মুক্ত করাকে ১৯৮২ সালে খোররামশাহর মুক্তির সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, খোররামশাহর মুক্তি যেমন যুদ্ধের সমীকরণ পরিবর্তন করেছিল, তেমনি ইয়েমেনের মুসলিম যোদ্ধাদের কার্যক্রমও সৌদি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধের সমীকরণ পরিবর্তন করেছে এবং বিশ্বকে বিস্মিত করেছে।
আয়াতুল্লাহ সাঈদি বলেন, উভয় অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ও ইয়েমেনের মুসলিম যোদ্ধাদের অভিন্ন বিশ্বাস ও আদর্শ। এসব বিজয়ের প্রকৃত উৎস আল্লাহর সাহায্য।
তিনি আরও বলেন, ইসলামি প্রতিরোধ ফ্রন্টের শক্তি অর্জন ও চূড়ান্ত বিজয়ের পথে অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে। কারণ, ইসলামি যোদ্ধারা বিশ্বাস করেন,
وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ
“বিজয় তো কেবল পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময় আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।”
তিনি বলেন, আল্লাহর সাহায্যের ওপর বিশ্বাস রেখে বিপ্লবী জনতা ২০০ রাতেরও বেশি সময় ধরে ময়দানে অবস্থান করেছেন। তাঁরা বিভিন্ন পতাকা উত্তোলন করে শহীদ ইমাম, সামরিক কমান্ডার, বিজ্ঞানী, দানা যুদ্ধজাহাজের নাবিক এবং মিনাবের স্কুলের নিরপরাধ শিশুদের হত্যার জন্য অপরাধী শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ দাবি করেছেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যে কেউ ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের চিন্তা করবে, তাকে কঠোর আঘাত ও ইস্পাতকঠিন মুষ্টির মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
শিক্ষার্থীদের প্রতি মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনার আহ্বান
নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে আয়াতুল্লাহ সাঈদি শিক্ষার্থীদের মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনার আহ্বান জানান। তিনি ইমাম আলী (আ.)-এর একটি বাণী উদ্ধৃত করেন,
مَنْ لَمْ يَتَعَلَّمْ فِي الصِّغَرِ لَمْ يَتَقَدَّمْ فِي الْكِبَرِ
“যে ব্যক্তি ছোটবেলায় শিক্ষা অর্জন করে না, সে বড় হয়ে উন্নতি করতে পারে না।”
তিনি বলেন, দেশের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তত্ত্বাবধানে থাকা শিক্ষার্থী ও শিশুরা জাতির সবচেয়ে মূল্যবান ও সম্ভাবনাময় সম্পদ।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “মনোযোগ ও আন্তরিকতার সঙ্গে পড়াশোনা করো। দেশের ভবিষ্যৎ তোমাদের হাতে।”
ইমাম হাসান আসকারি (আ.)-এর জন্মবার্ষিকী
ইমাম হাসান আসকারি (আ.)-এর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়াতুল্লাহ সাঈদি বলেন, তাঁর জীবন ছিল ২৫০ বছরের পবিত্র ইমামি ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব।
তিনি বলেন, ইমাম হাসান আসকারি (আ.) গায়বতের যুগে শিয়াদের প্রয়োজন পূরণের জন্য নেতৃত্বব্যবস্থার বিকল্প কাঠামো বাস্তবায়নে প্রচেষ্টা চালান। এ প্রক্রিয়ায় বিশেষ প্রতিনিধি, সাধারণ প্রতিনিধি ও ওলায়াতে ফকিহের নেতৃত্বের ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
তিনি আরও বলেন, আব্বাসীয় শাসকদের কঠোর নিপীড়নের মধ্যেও ইমাম হাসান আসকারি (আ.) শিয়াদের গায়বাতের যুগের জন্য প্রস্তুত করেন, শেষ ইমামের পরিচয় তুলে ধরেন, আকিদাগত বিভ্রান্তি প্রতিহত করেন এবং শিয়া মতবাদের বিস্তারে ভূমিকা রাখেন।
হযরত ফাতিমা মাসুমা (সা.আ.)-এর মর্যাদা
হযরত ফাতিমা মাসুমা (সা.আ.)-এর ওফাতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়াতুল্লাহ সাঈদি বলেন, হযরত মাসুমা (সা.আ.) কোমে আগমনের মাধ্যমে ইরানের আধ্যাত্মিক ভূগোল পরিবর্তন করেছেন। তিনি পবিত্রতা, লজ্জাশীলতা ও ইসলামি সভ্যতা নির্মাণের ক্ষেত্রে ইরানি কন্যাদের জন্য আদর্শ।
তিনি বলেন, হযরত মাসুমা (সা.আ.)-এর অন্যতম বিশেষ মর্যাদা হলো, তাঁর জন্মের বহু বছর আগে ইমাম সাদিক (আ.) তাঁর সম্পর্কে বলেছেন,
تَدْخُلُ بِشَفَاعَتِهَا شِيعَتِي الْجَنَّةَ بِأَجْمَعِهِمْ
“তাঁর [ফাতিমা মাসুমা (সা.আ.)] সুপারিশের মাধ্যমে আমার সব শিয়া জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
এ প্রসঙ্গে ইমাম জাওয়াদ (আ.) বলেছেন,
مَنْ زَارَ قَبْرَ عَمَّتِي بِقُمَّ فَلَهُ الْجَنَّةُ
“যে ব্যক্তি কোমে আমার ফুফুর কবর জিয়ারত করবে, তার জন্য জান্নাত রয়েছে।”
প্রথম খুতবা: তাকওয়া ও আল্লাহর নৈকট্য
আয়াতুল্লাহ সাঈদি বলেন, তাকওয়ার ফল হলো আল্লাহর নৈকট্য অর্জন। এখানে নৈকট্য বলতে স্থানগত নৈকট্য বোঝানো হয়নি; বরং আধ্যাত্মিক নৈকট্যের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানো বোঝানো হয়েছে।
সূরা ফাতহের ২৯ নম্বর আয়াতের তাফসির
সূরা ফাতহের ২৯ নম্বর আয়াতের তাফসির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই আয়াত মুমিন সমাজের একটি গভীর চিত্র তুলে ধরে। এতে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি, নবুয়তি রিসালাত, প্রশান্তি, বিজয়, বাইআত ও ঈমানি সমাজের গঠনের মধ্যকার সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।
তিনি বলেন, এই আয়াত কেবল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিদের ঐতিহাসিক বিবরণ নয়; বরং উম্মাহ গঠনের একটি কোরআনিক আদর্শ। রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে কেন্দ্র করে ঈমানি সমাজ তাওহিদভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও ঐতিহাসিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে এবং ঐক্য, পারস্পরিক দয়া ও বিকাশের পর্যায়ে পৌঁছে।
আয়াতুল্লাহ সাঈদি বলেন, আল্লাহ সূরা ফাতহের শেষ আয়াতে মুমিন সমাজের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন:
مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ ۚ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ ۖ تَرَاهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا ۖ سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِمْ مِنْ أَثَرِ السُّجُودِ
“মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল। আর যারা তাঁর সঙ্গে রয়েছে, তারা কাফেরদের বিরুদ্ধে কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি দয়াশীল। তুমি তাদের রুকু ও সিজদারত অবস্থায় দেখতে পাবে। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে। তাদের চেহারায় সিজদার প্রভাবের চিহ্ন রয়েছে।”
তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিরা নবুয়তি কেন্দ্রকে ঘিরে গড়ে ওঠেন। তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক দয়া রয়েছে এবং কুফরের বিরুদ্ধে তাঁরা দৃঢ়। ইবাদত ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আকাঙ্ক্ষায় তাঁরা জীবন পরিচালনা করেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-কেন্দ্রিক উম্মাহর পরিচয়
আয়াতুল্লাহ সাঈদি বলেন, উম্মাহর পরিচয় জাতিগত, ভৌগোলিক বা সামষ্টিক স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে না; বরং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে সম্পর্কের মধ্য দিয়েই তা অর্থ ও পরিচয় লাভ করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাসের শিক্ষক নন; তিনি রিসালাতভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের উৎস। কোরআনের দৃষ্টিতে উম্মাহর পরিচয় ও কাঠামো ওহিভিত্তিক উৎস থেকে সামাজিক জীবনের দিকে বিকশিত হয়।
তিনি বলেন, একটি ঈমানি সমাজ তখনই কোরআনিক সমাজে পরিণত হয়, যখন তার সব উপাদান রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে সুশৃঙ্খলভাবে বিন্যস্ত হয়।
সংক্ষেপে, ইসলামি উম্মাহ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মাধ্যমে সূচিত হয়, তাঁর মাধ্যমেই পরিচয় ও সত্তা লাভ করে এবং রিসালাতের দিগন্তে পরিপক্বতা অর্জন করে।
আপনার কমেন্ট