হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, হজরত রুকাইয়া (আ.)-এর শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে কোম শহরে শহীদ বিপ্লবী নেতা ও তাঁর শহীদ পরিবারের স্মরণে নারীদের জন্য বিশেষ এক স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়।
নারীরা হজরত জয়নাব (আ.)-এর দায়িত্বের ধারক
অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে ফাখর রুহানি তাঁর বক্তব্যে নারীদের মর্যাদার ওপর জোর দিয়ে বলেন, কারবালার ঘটনায় হজরত জয়নাব (আ.) শুধু বন্দিত্বই সহ্য করেননি, বরং তিনি এক মহান দায়িত্ব পালন করেছিলেন, যার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা আমাদেরও কর্তব্য।
তিনি বলেন, হজরত জয়নাব (আ.)-এর প্রধান দায়িত্ব ছিল সত্যকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা। তাঁর ভাষায়, সত্যের ব্যাখ্যা অলৌকিক শক্তির মতো প্রভাবশালী। যেমন হযরত জয়নাব (আ.) কুফায় তাঁর ভাষণের মাধ্যমে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করেছিলেন, তেমনি আমাদেরও সত্য তুলে ধরতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের মহান ব্যক্তিত্বদের শাহাদাতে যেন আমরা মনে না করি যে আমরা কিছু হারিয়েছি; বরং আমরা অর্জন করেছি। কারণ আল্লাহ তাআলা এ বিষয়ে সুসংবাদ দিয়েছেন।
জামে'আতুয জাহরা (সা.)-এর এই শিক্ষিকা আরও বলেন, সত্য ও অসত্যের সংগ্রাম কিয়ামত পর্যন্ত চলবে এবং আমরা ইতিহাসের সঠিক অবস্থানে রয়েছি।
তিনি বিপ্লবের পথে অবিচল থাকার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলেন, বিপ্লবের পথে অনেকেই মাঝপথে থেমে গেছেন। আমাদের আল্লাহর কাছে দৃঢ়তার জন্য দোয়া করতে হবে, যাতে আমরা এই পথ থেকে বিচ্যুত না হই।
তিনি আরও বলেন, ইসলামী বিপ্লবের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত নারীরাই বিপ্লবের দায়িত্বের বড় অংশ বহন করেছেন। সন্তান লালন-পালন, দাম্পত্য জীবন এবং সত্য প্রচারের মাধ্যমে নারীরাও জিহাদে অংশ নিতে পারেন। ইতিহাসের কোনো সময়েই নারীদের জন্য এত সুযোগ সৃষ্টি হয়নি।
শহীদা বুশরা খামেনেইর ব্যক্তিত্ব
এরপর শহীদা বুশরা খামেনেইর স্বামীর আত্মীয় মিসেস মুসাভি তাঁর ব্যক্তিত্ব ও নৈতিক গুণাবলি নিয়ে বক্তব্য দেন।
তিনি বলেন, মানুষের সৃষ্টির উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর গুণাবলি-যেমন দয়ালু, ক্ষমাশীল ইত্যাদি-অর্জন করা। মানুষ যত বেশি এই গুণগুলো অর্জন করতে পারে, ততই সে আহলে বাইত (আ.)-এর আদর্শের কাছাকাছি পৌঁছে।
তিনি বলেন, একজন মুমিন মানুষের তিনটি বৈশিষ্ট্য হলো-অন্যদের প্রতি ভালোবাসা, প্রফুল্লতা এবং অন্তরের প্রশান্তি। যখন এসব গুণ কারও মধ্যে থাকে এবং আমরা তাকে হারাই, তখন সেই শোক আরও গভীর হয়, যদিও তার প্রকৃতি ভিন্ন।
তিনি আরও বলেন, শহীদা বুশরা খামেনেয়ী এমনভাবে জীবনযাপন করতেন যাতে আল্লাহ, আহলে বাইত (আ.) এবং মানুষের সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারেন।
তিনি জানান, বুশরা খামেনেই কিছু সময় তাঁর পিতার সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। তবে তিনি বলেন, আসলে তিনি শুধু তাঁর পিতার সেবা করেননি, বরং নেতৃত্ব ও ইসলামী কর্তৃত্বের (বিলায়াতের) সেবা করেছিলেন। তাঁর মতে, এই বৈশিষ্ট্য তাঁকে হযরত ফাতিমা (আ.)-এর আদর্শের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ করে তুলেছিল।
মিসেস মুসাভি আরও বলেন, বিনয়, সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে থাকা এবং জিকির ও দোয়ার প্রতি গুরুত্ব ছিল তাঁর আরও কয়েকটি বৈশিষ্ট্য। তিনি নিজেকে কখনোই সাধারণ মানুষের থেকে আলাদা ভাবতেন না। তিনি যেমন শহীদ বিপ্লবী নেতার একজন আদর্শ কন্যা ছিলেন, তেমনি তাঁর চিন্তা ও শিক্ষার একজন ভালো অনুসারীও ছিলেন।
তিনি আরও বলেন, শহীদা বুশরা খামেনেয়ী তাঁর সন্তানদের গভীরভাবে ভালোবাসতেন। তিনি বলতেন, আমার সন্তানরা যখন আমার পাশে থাকে, তখন আমি আনন্দ অনুভব করি। তিনি সন্তান জন্মদান ও মাতৃত্বের গুরুত্বের ওপর জোর দিতেন এবং মায়ের সন্তানের প্রতি ভালোবাসার কথা প্রায়ই বলতেন। তাঁর হাসিমুখ ও আন্তরিক আচরণের কারণে তাঁর কথাগুলো মানুষের ওপর গভীর প্রভাব ফেলত।
তিনি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার ওপরও গুরুত্ব দিতেন। স্বামীর পরিবারের প্রতিও তিনি অত্যন্ত স্নেহশীল ছিলেন। পাশাপাশি তিনি বই পড়া ও কবিতা ভালোবাসতেন। সাহিত্যপ্রেমের কারণে তিনি কুম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফারসি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন।
শহীদ মিসবাহ আল-মাহদি বাকেরির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল সরল জীবনযাপন
অনুষ্ঠানের পরবর্তী অংশে শহীদ মিসবাহ আল-মাহদি বাকেরির এক আত্মীয়া বলেন, তিনি অত্যন্ত বিনয়ী ও সরল জীবনযাপন করতেন। শিশু থেকে প্রবীণ-সবাইকে তিনি সম্মান করতেন।
তিনি বলেন, শহীদ বাকেরি কখনো নিজেকে পরিপূর্ণ মনে করতেন না এবং সবসময় আলেমদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতেন। মানুষের সমস্যা ও কষ্ট দূর করার বিষয়ে তিনি সবসময় উদ্বিগ্ন থাকতেন। পাশাপাশি ফরজ ইবাদত পালন এবং হারাম কাজ থেকে বিরত থাকার ওপর জোর দিতেন।
তিনি আরও বলেন, সন্তানদের সুশিক্ষা ও সঠিক লালন-পালনের বিষয়ে তিনি অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। তাঁর ভাষায়, শিশুরা নিষ্পাপ হয়ে জন্মায়; খারাপ বিষয়গুলো তারা আমাদের কাছ থেকেই শেখে। এমনকি সন্তানদের পাশে না থাকার মতো ছোট ভুলও তাদের চরিত্র গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে।
অনুষ্ঠানের অন্যান্য অংশের মধ্যে ছিল আতেফেহ খোররামির কবিতা আবৃত্তি এবং হোসেইন দারেস্তানির ধর্মীয় সংগীত (মাদাহ) পরিবেশনা।
আপনার কমেন্ট