বৃহস্পতিবার ২৩ জুলাই ২০২৬ - ১২:৪৯
সামাজিক জাগরণে ও কুফাবাসীর বিদ্রোহের ভিত্তি তৈরিতে হযরত উম্মে কুলসুম (আ.)-এর ভূমিকা

হযরত উম্মে কুলসুম (সা.আ.) ছিলেন একটি স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব এবং আশুরার আন্দোলনের অন্যতম প্রভাবশালী নারী। তিনি কারবালায় উপস্থিত থাকা, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর সঙ্গে পথচলা, কুফায় সত্য উদ্ঘাটনকারী ভাষণ প্রদান, দান-সদকা গ্রহণে অস্বীকৃতি, ইবনে জিয়াদের সামনে সাহসিকতার সঙ্গে দাঁড়ানো এবং শামের পথে আহলে বাইতের নারীদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পরিবারের মর্যাদা সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, পর্ব ১- আশুরার ঘটনা ইমাম আবু আব্দিল্লাহ আল-হুসাইন (আ.) এবং তাঁর বিশ্বস্ত সঙ্গীদের শাহাদাতের মধ্য দিয়ে শেষ হয়নি। বরং সেই মুহূর্ত থেকেই আহলে বাইতের (আ.) নারীদের সচেতন ও সাহসী ভূমিকার মাধ্যমে হুসাইনি আন্দোলনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।

এ কারণেই জয়নাবি মক্তব শীর্ষক ধারাবাহিক সাক্ষাৎকারে ইসলামের ইতিহাসের গবেষক ও বিশেষজ্ঞ হুজ্জাতুল ইসলাম আমির হাসান মুজাফ্ফারিজাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে আশুরার আন্দোলনকে জীবন্ত রাখার ক্ষেত্রে আহলে বাইতের নারীদের বহুমাত্রিক ও তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত ভূমিকা তুলে ধরা হচ্ছে। নিচে সেই ঐতিহাসিক ও বিশ্লেষণধর্মী সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত অংশ উপস্থাপন করা হলো।

যদি হযরত জয়নাবে কুবরা (সা.)-এর পর আশুরার ঘটনায় আরেকজন প্রভাবশালী নারীর নাম উল্লেখ করতে চাই, তবে নিঃসন্দেহে প্রথম দিকেই যার নাম আসে, তিনি হলেন তাঁর সম্মানিতা বোন হযরত উম্মে কুলসুম (সা.আ.)।

কিছু মানুষের মতে, উম্মে কুলসুম ছিল হযরত জয়নাব (সা.)-এর উপাধি (কুনিয়াত)। তাই ঐতিহাসিক সূত্রে যেখানে উম্মে কুলসুমের নাম এসেছে, সেখানে আসলে হযরত জয়নাবে কুবরা (সা.)-কেই বোঝানো হয়েছে। এই মতানুসারে, আমিরুল মুমিনীন ইমাম আলী (আ.) ও হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.)-এর মাত্র একজন কন্যা ছিলেন, আর তিনি ছিলেন হযরত জয়নাবে কুবরা (সা.)।

তবে এই ধারণা সঠিক বলে মনে হয় না। কারণ বহু ঐতিহাসিক ও হাদিসভিত্তিক সূত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত উম্মে কুলসুম (সা.আ.) ছিলেন একটি স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব এবং তিনি হযরত জয়নাবে কুবরা (সা.) থেকে ভিন্ন ব্যক্তি। অতএব, তাঁকে ইমাম আলী (আ.) ও হযরত ফাতিমা (সা.)-এর আরেক কন্যা এবং আশুরার ঘটনা ও তার পরবর্তী সময়ের অন্যতম বিশিষ্ট ও প্রভাবশালী নারী হিসেবে গণ্য করা উচিত।

ঐতিহাসিক সূত্রে হযরত উম্মে কুলসুম (সা.)-এর স্বতন্ত্র উপস্থিতির প্রমাণ

উদাহরণস্বরূপ, যখন ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর পরিবার-পরিজনকে নিয়ে মদিনা ত্যাগ করেন, তখন তৃতীয় হিজরি শতাব্দীর বিশিষ্ট আলেম আবু হানিফা দিনাওয়ারি তাঁর আখবারুত তিওয়াল গ্রন্থে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, ইমামের দুই বোন-হযরত জয়নাব (সা.আ.) ও হযরত উম্মে কুলসুম (সা.)-উভয়েই সেই সফরে উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়াও, আশুরার বিকেলে ইমাম হুসাইন (আ.) যখন বিদায় নিচ্ছিলেন, তখন তিনি হারেমের নারীদের নাম ধরে সম্বোধন করে বলেন: হে জয়নাব, হে উম্মে কুলসুম, হে সাকিনা, হে রুবাব, হে রুকাইয়া-তোমাদের প্রতি আমার সালাম এই বিদায়ের সময় হযরত জয়নাব (সা.) এবং হযরত উম্মে কুলসুম (সা.)-এর নাম পৃথকভাবে উল্লেখ করা তাঁদের স্বতন্ত্র পরিচয়ের সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে।

এছাড়া, বহু ঐতিহাসিক-যেমন সাইয়্যিদ ইবন তাউস তাঁর আল-লুহুফ গ্রন্থে-কারবালার বন্দিদের কুফায় প্রদত্ত ভাষণ বর্ণনা করতে গিয়ে হযরত জয়নাব (সা.)-এর ভাষণ এবং হযরত উম্মে কুলসুম (সা.)-এর ভাষণ পৃথকভাবে উল্লেখ করেছেন। এই পৃথক উপস্থাপনাও প্রমাণ করে যে, তাঁদের দৃষ্টিতে ইসলামের ও শিয়া ইতিহাসের দুইজন স্বতন্ত্র ও উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব ছিলেন-হযরত জয়নাবে কুবরা (সা.), এবং হযরত জয়নাবে সুগরা (সা.), যাঁকেই হযরত উম্মে কুলসুম (সা.) নামে অভিহিত করা হয়।

খলিফা দ্বিতীয়ের সঙ্গে হযরত উম্মে কুলসুম (সা.)-এর বিবাহের দাবির পর্যালোচনা

মূল আলোচনায় প্রবেশের আগে ইতিহাসের একটি বহুল আলোচিত বিষয়-অর্থাৎ হযরত উম্মে কুলসুমের সঙ্গে দ্বিতীয় খলিফার বিবাহের প্রশ্ন-উল্লেখ করা সমীচীন। বিশেষ করে বিরোধী ধারা ও খোলাফায়ে মাদরাসার অনুসারীরা এই বিষয়টিকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে থাকেন।

কিছু গবেষকের মতে, যে উম্মে কুলসুম দ্বিতীয় খলিফাকে বিয়ে করেছিলেন, তিনি ছিলেন আসমা বিনতে উমাইসের গর্ভে আবু বকরের কন্যা উম্মে কুলসুম। আবু বকরের মৃত্যুর পর আসমা আমিরুল মুমিনীন ইমাম আলী (আ.)-কে বিয়ে করেন। ফলে আবু বকরের কন্যা উম্মে কুলসুম ইমাম আলী (আ.)-এর ঘরেই লালিত-পালিত হন এবং তিনি তাঁর সৎ-কন্যা (রবীবা) হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অতএব, তাঁকে ইমাম আলী (আ.)-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করা মানেই তিনি তাঁর জৈবিক কন্যা ছিলেন-এমনটি নয়।

অন্যদিকে, ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, দ্বিতীয় খলিফার স্ত্রী হিসেবে পরিচিত সেই উম্মে কুলসুম কারবালার ঘটনার আগেই, মুয়াবিয়ার শাসনামলে ইন্তেকাল করেন। অথচ হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.)-এর কন্যা হযরত উম্মে কুলসুম (সা.) কারবালার ঘটনায় উপস্থিত ছিলেন এবং ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাতের পর কুফা ও অন্যান্য স্থানে তাঁর ভাষণ ও বক্তব্যের মাধ্যমে আহলে বাইতের (আ.) ওপর সংঘটিত জুলুম তুলে ধরেন এবং শত্রুদের অপরাধ প্রকাশ করেন।

হযরত উম্মে কুলসুম (সা.)-এর স্বামী ছিলেন আউন ইবনে জাফর ইবনে আবি তালিব, যিনি তাঁর চাচাতো ভাই এবং জাফরে তাইয়ারের পুত্র ছিলেন। তিনি আশুরার দিনে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর পাশে যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করেন এবং কারবালার শহীদদের তালিকায় তাঁর নাম লিপিবদ্ধ রয়েছে। সুতরাং, দ্বিতীয় খলিফার স্ত্রী উম্মে কুলসুমকে ইমাম আলী (আ.) ও হযরত ফাতিমা (সা.)-এর কন্যা হযরত উম্মে কুলসুম (সা.)-এর সঙ্গে এক ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়।

কারবালা ও আশুরার রাতে হযরত উম্মে কুলসুম (সা.)-এর উপস্থিতি

আশুরার ঘটনা এবং তার পরবর্তী সময়ে হযরত উম্মে কুলসুম (সা.)-এর উপস্থিতি ও ভূমিকা সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক বর্ণনা রয়েছে।

প্রথম দিকের একটি বর্ণনা কারবালার প্রান্তরে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কাফেলার আগমনের সময়ের। তখন হযরত উম্মে কুলসুম (সা.) তাঁর ভাই ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কাছে এসে বলেন-

«یا أَخی، هذِهِ بادِیَةٌ مَهُولَةٌ»

‘হে আমার ভাই! এই প্রান্তরটি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর; এটি আমাকে ভীত ও উদ্বিগ্ন করে তুলছে।‘

জবাবে ইমাম হুসাইন (আ.) স্মরণ করিয়ে দেন যে, একসময় তাঁরা তাঁদের পিতা আমিরুল মুমিনীন ইমাম আলী (আ.)-এর সঙ্গে এই পথ অতিক্রম করেছিলেন। সেই সময় ইমাম আলী (আ.) কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে পড়েন। জেগে ওঠার পর তিনি অত্যন্ত কাঁদতে থাকেন। কান্নার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্বপ্নে দেখেছেন তাঁর পুত্র হুসাইন (আ.) এই ভূমিতে রক্তের সাগরে ছটফট করছেন, কিন্তু তাঁকে সাহায্য করার মতো কেউ নেই।

শিয়া জগতের প্রাচীন ও বিশিষ্ট আলেম শাইখ সাদূক তাঁর মূল্যবান গ্রন্থ “আল-আমালী”-এর ৮৭তম মজলিসে এই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন।

আশুরার রাতে দুই বোনের সঙ্গ

আরেকটি ঐতিহাসিক বর্ণনা আশুরার রাতের।

সেই রাতে ইমাম হুসাইন (আ.) যখন নিজের তলোয়ার প্রস্তুত ও ধার দিচ্ছিলেন, তখন তিনি এই পংক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কিছু কবিতা আবৃত্তি করছিলেন-

«یا دَهرُ أُفٍّ لَکَ مِن خَلیلٍ...»

“হে সময়! ধিক তোমাকে, তুমি কতই না নিকৃষ্ট বন্ধু!”

সেই সময় হযরত জয়নাবে কুবরা (সা.) ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। তিনি এই কবিতা শুনে বুঝতে পারেন যে, তাঁর ভাইয়ের শাহাদাতের মুহূর্ত ঘনিয়ে এসেছে। তখন তিনি দ্রুত ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কাছে এসে অশ্রুসিক্ত হন।

কিছু ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে যে, হযরত উম্মে কুলসুম (সা.)-ও এই সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং দুই বোন তাঁদের ভাইয়ের পাশে অবস্থান করেন।

এই সময় ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁদের ধৈর্য, সহনশীলতা এবং আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকার উপদেশ দেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, পৃথিবীর সব সৃষ্টি একদিন বিলীন হবে; কেবল মহান আল্লাহর সত্তাই চিরস্থায়ী। সবাই তাঁর কাছেই ফিরে যাবে এবং চূড়ান্ত বিচারও তাঁরই হাতে। তিনি আরও বলেন, আল্লাহ নিজেই হত্যাকারী ও জালিমদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নেবেন এবং তাদের অপরাধের শাস্তি প্রদান করবেন।

এসব বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, কারবালায় আগমনের শুরু থেকে আশুরার আগের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হযরত উম্মে কুলসুম (সা.) ইমাম হুসাইন (আ.) ও হযরত জয়নাবে কুবরা (সা.)-এর পাশে ছিলেন এবং হুসাইনি আন্দোলনের প্রতিটি ঘটনা ও বেদনাবিধুর মুহূর্তের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha