বৃহস্পতিবার ২৩ জুলাই ২০২৬ - ১৩:১১
সামাজিক জাগরণে ও কুফাবাসীর বিদ্রোহের ভিত্তি তৈরিতে হযরত উম্মে কুলসুম (আ.)-এর ভূমিকা

হযরত উম্মে কুলসুম (সা.আ.) ছিলেন একটি স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব এবং আশুরার আন্দোলনের অন্যতম প্রভাবশালী নারী। তিনি কারবালায় উপস্থিত থাকা, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর সঙ্গে পথচলা, কুফায় সত্য উদ্ঘাটনকারী ভাষণ প্রদান, দান-সদকা গ্রহণে অস্বীকৃতি, ইবনে জিয়াদের সামনে সাহসিকতার সঙ্গে দাঁড়ানো এবং শামের পথে আহলে বাইতের নারীদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পরিবারের মর্যাদা সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, পর্ব-২ কুফায় হযরত উম্মে কুলসুম (সা.)-এর ভাষণ এবং তার জাগরণমূলক প্রভাব

এরপরের সময়ে নির্ভরযোগ্য প্রাচীন ঐতিহাসিক সূত্রগুলোতে হযরত উম্মে কুলসুম (সা.) সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। তবে ইমাম হুসাইন (আ.) যখন হারেমের নারীদের বিদায় জানিয়েছিলেন, তখন তিনি পৃথকভাবে ‘হে জয়নাব’ এবং ‘হে উম্মে কুলসুম’ বলে সম্বোধন করেন। এটিও তাঁদের স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।

অন্যদিকে, হযরত উম্মে কুলসুম (সা.)-এর সবচেয়ে উজ্জ্বল উপস্থিতিগুলোর একটি হলো কারবালার ঘটনার পর কুফায় প্রদত্ত তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ।

সাইয়্যিদ ইবন তাউস তাঁর মূল্যবান গ্রন্থ ‘আল-লুহুফ’-এ এই ভাষণ বর্ণনা করেছেন। তিনি এটি জায়েদ ইবনে মূসা ইবনে জাফর (আ.)-এর সূত্রে ইমাম জাফর সাদিক (আ.) থেকে এবং ধারাবাহিকভাবে অন্যান্য ইমামদের (আ.) সূত্রে বর্ণনা করেছেন। প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে যে, ইমাম সাদিক (আ.) এই বর্ণনা তাঁর পিতা ইমাম বাকির (আ.) থেকে গ্রহণ করেছিলেন।

এই ভাষণে হযরত উম্মে কুলসুম (সা.) শুধু কুফাবাসীকে ইমাম হুসাইন (আ.)-কে সাহায্য না করার জন্য তিরস্কারই করেননি; বরং অত্যন্ত শক্তিশালী ভাষায় তাদের সুপ্ত বিবেককে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম ছিল-

‘তোমরা কি জানো, তোমাদের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে কাকে হত্যা করা হয়েছে? তোমরা কি জানো, কার পবিত্র রক্ত এই মাটিতে ঝরেছে?’

এই প্রশ্নগুলোর মাধ্যমে তিনি মানুষের দায়িত্ববোধ জাগ্রত করতে, নীরবতার শৃঙ্খল ভাঙতে এবং এমন এক জনগোষ্ঠীর অন্তরে সাহস ও আত্মমর্যাদা জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যারা ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধ প্রত্যক্ষ করেও নীরব ছিল।

এই ভাষণের সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রভাব

এই ভাষণের গুরুত্ব কেবল এর বিষয়বস্তু ও ভাষার অলঙ্কারপূর্ণ সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রভাবেও তা সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। যখন একজন বন্দিনী নারী এমন দৃঢ়তা ও সাহসের সঙ্গে কুফাবাসীর সামনে ভাষণ দেন, তখন তিনি ইতিহাসের কাছে এই বার্তাই পৌঁছে দেন যে, হুসাইনি আন্দোলন শুধু পুরুষদের তরবারির মাধ্যমে নয়, বরং আহলে বাইতের (আ.) নারীদের সত্য উদ্ঘাটনকারী ভাষা ও জাগ্রত চেতনার মাধ্যমেও জীবিত ছিল।

এখান থেকেই বোঝা যায় যে, কুফায় হযরত উম্মে কুলসুম (সা.আ.) এবং হযরত জয়নাবে কুবরা (সা.আ.)-এর ভাষণ সমাজজাগরণের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল। পরবর্তীকালে তাওয়াবীন আন্দোলন এবং মুখতারের বিদ্রোহ-সহ হুসাইনের (আ.) রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণের যে আন্দোলনগুলো গড়ে ওঠে, সেগুলোর পেছনেও এই ভাষণগুলোর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল। প্রকৃতপক্ষে, এই মহীয়সী নারীরা তাঁদের বক্তব্যের মাধ্যমে সমাজের সুপ্ত বিবেককে জাগিয়ে তুলেছিলেন এবং ইতিহাসের বুকে প্রতিবাদ ও বিদ্রোহের বীজ বপন করেছিলেন।

এরপর ঐতিহাসিক সূত্রে হযরত উম্মে কুলসুম (সা.আ.)-এর সঙ্গে ইবনে জিয়াদের দরোয়ানের একটি সংলাপ বর্ণিত হয়েছে। তিনি দরোয়ানকে অনুরোধ করেন যেন শহীদদের পবিত্র মস্তকগুলো কাফেলার সামনে বহন করা হয়, যাতে মানুষের দৃষ্টি আহলে বাইতের (আ.) নারীদের দিকে কম পড়ে। এই আচরণ থেকে বোঝা যায় যে, আহলে বাইতের পরিবার চরম বিপর্যয় ও আপাত দুর্বল অবস্থার মধ্যেও নারীদের সম্মান, মর্যাদা এবং সামাজিক শালীনতা রক্ষার বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। বন্দিত্বের কঠিন পরিস্থিতিও তাঁদের আহলে বাইতের মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব থেকে বিরত রাখতে পারেনি।

এছাড়াও, যখন কারবালার বন্দিরা কুফায় প্রবেশ করেন, তখন কুফার কিছু মানুষ কাফেলার শিশুদের মধ্যে কিছু খাবার ও খেজুর বিতরণ করতে থাকে। আল্লামা মাজলিসী (রহ.) তাঁর "বিহারুল আনওয়ার"-এর ৪৫তম খণ্ডে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত উম্মে কুলসুম (সা.) শিশুদের হাত থেকে সেই খাবারগুলো নিয়ে মাটিতে ফেলে দেন এবং উচ্চস্বরে ঘোষণা করেন-

«یَا أَهْلَ الْکُوفَةِ، إِنَّ الصَّدَقَةَ عَلَیْنَا حَرَامٌ»

‘হে কুফাবাসী! আমাদের জন্য সদকা হারাম।‘

এই ঘোষণায় আহলে বাইতের (আ.) পরিবারের দৃঢ়তা, আত্মমর্যাদা এবং অবিচল ঈমান স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। এর বার্তা ছিল-আমরা ক্ষুধার্ত, আমরা শত্রুর অবরোধে এবং চরম কষ্টের মধ্যে আছি; তবুও আমাদের ঈমান ও দ্বীনি শিক্ষা আমাদের মর্যাদা বিসর্জন দিতে কিংবা শত্রুর সামনে মাথা নত করতে অনুমতি দেয় না। আমরা ক্ষুধা, কষ্ট, এমনকি মৃত্যুকেও বরণ করতে প্রস্তুত; কিন্তু যে সম্পদ আমাদের জন্য শরিয়তসম্মত নয়, তা গ্রহণ করব না।

অন্যদিকে, এই প্রতিবাদী ঘোষণা আহলে বাইতের (আ.) প্রকৃত মর্যাদা জনগণকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ারও একটি প্রচেষ্টা ছিল। কারণ তখনকার কুফাবাসী প্রায় বিশ বছর ধরে আমিরুল মুমিনীন ইমাম আলী (আ.) ও তাঁর পরিবারের প্রত্যক্ষ সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত ছিল। শহরের বহু তরুণ ও কিশোর শুধু আহলে বাইতের ফজিলতই জানত না, বরং এমন এক রাজনৈতিক ও প্রচারণামূলক পরিবেশে বেড়ে উঠেছিল, যেখানে ইমাম আলী (আ.)-কে প্রকাশ্যে অপমান করা হতো। তাই হযরত উম্মে কুলসুম (সা.) তাঁর এই স্পষ্ট অবস্থানের মাধ্যমে একদিকে শরিয়তের বিধান ও রাসূলুল্লাহ (সা.আ.)-এর পরিবারের মর্যাদা রক্ষা করেন, অন্যদিকে কুফার জনমতের সামনে আহলে বাইতের প্রকৃত অবস্থান, মর্যাদা ও ন্যায্যতা তুলে ধরেন।

ইবনে জিয়াদের মুখোমুখি হযরত উম্মে কুলসুম (সা.) যখন কারবালার বন্দিদের ইবনে জিয়াদের দরবারে উপস্থিত করা হয়, তখন সে বিদ্রূপ, অপমান ও কটূক্তির মাধ্যমে আহলে বাইতের (আ.) পরিবারকে হেয় করার চেষ্টা করে। সে ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর সঙ্গীদের শাহাদাতকে নিজের আনন্দ ও তৃপ্তির কারণ হিসেবে প্রকাশ করে।

শাইখ সাদূক (রহ.) তাঁর ‘আল-আমালী’ গ্রন্থের ৩০তম মজলিসে বর্ণনা করেছেন যে, এর জবাবে হযরত উম্মে কুলসুম (সা.) বলেন-

«یَا ابْنَ زِیَادٍ، لَعِینٌ أَنْتَ! قَرَّتْ عَیْنُکَ بِقَتْلِ الْحُسَیْنِ؟ فَقَدْ کَانَ قُرَّةَ عَیْنِ جَدِّی.»

‘হে ইবনে জিয়াদ! তুমি অভিশপ্ত। হুসাইনকে হত্যা করে যদি তোমার চোখ শীতল হয়ে থাকে, তবে জেনে রাখো-আমার নানাজান রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চোখ বহু বছর ধরে হুসাইনকে দেখেই শীতল হতো।‘

এই বজ্রকঠিন উত্তরের মাধ্যমে হযরত উম্মে কুলসুম (সা.আ.) জনমতকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শ এবং তাঁর উত্তরসূরি বলে দাবি করা শাসকদের আচরণের মধ্যে থাকা গভীর ব্যবধানের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.) ইমাম হুসাইন (আ.)-কে দেখলে আনন্দিত হতেন, তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরতেন এবং প্রকাশ্যে তাঁর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতেন। অথচ যারা নিজেদের নবীর শাসনব্যবস্থার ধারক বলে পরিচয় দিত, তারাই নবীর দৌহিত্রের শাহাদাতে আনন্দ প্রকাশ করত এবং ইমাম হুসাইন (আ.)-এর পবিত্র শির মোবারক দেখে উল্লাস করত।

এভাবে হযরত উম্মে কুলসুম (সা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইমাম হুসাইন (আ.)-এর প্রতি বিশেষ ভালোবাসার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে উমাইয়া শাসকদের প্রকৃত চেহারা এবং তাদের নীতির সঙ্গে নববী আদর্শের সুস্পষ্ট বিরোধ সবার সামনে উন্মোচিত করেন।

সিবূরবাসীর জন্য হযরত উম্মে কুলসুম (সা.)-এর দোয়া

কুফার ঘটনাবলির পর যখন কারবালার বন্দিদের শামের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন পথিমধ্যে দুটি স্থানে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। মরহুম মাহাল্লাতী তাঁর ‘রিয়াহীনুশ শরিয়াহ’ গ্রন্থে এসব ঘটনার উল্লেখ করেছেন।

এই স্থানগুলোর একটি ছিল হালাবের (আলেপ্পো) নিকটবর্তী ‘সিবূর’ নামের একটি শহর। আহলে বাইতের (আ.) বন্দি কাফেলা যখন সেখানে পৌঁছায়, তখন একদল শিয়া যুবক আহলে বাইতের পবিত্র পরিবারকে উদ্ধার করে জালিম শাসকদের কবল থেকে মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তারা সেই প্রচেষ্টায় সফল হতে পারেনি।

তাদের ভালোবাসা, ঈমান, আত্মত্যাগের মানসিকতা এবং আহলে বাইতের (আ.) প্রতি আনুগত্যের প্রশংসাস্বরূপ হযরত উম্মে কুলসুম (সা.) তাদের জন্য দোয়া করেন এবং বলেন-

«أَعْذَبَ اللّٰهُ شَرَابَهُمْ، وَأَرْخَصَ أَسْعَارَهُمْ، وَرَفَعَ أَیْدِیَ الظَّلَمَةِ عَنْهُمْ.»

অর্থাৎ-আল্লাহ যেন তাদের পানীয় জলকে সুস্বাদু ও মধুর করে দেন, তাদের শহরে দ্রব্যমূল্য সহজলভ্য ও সস্তা করে দেন এবং জালিমদের হাত তাদের ওপর থেকে সরিয়ে নেন।

এই বর্ণনায়, যা আবু মিখনাফের সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, বলা হয়েছে যে আহলে বাইত (আ.)-এর আগমন এবং হযরত উম্মে কুলসুম (সা.)-এর দোয়ার পর সেই এলাকার পানি মিষ্টি ও সুপেয় হয়ে যায়, দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে এবং এমন সময়েও, যখন আশপাশের বহু শহর অত্যাচারী শাসকদের নির্যাতনের শিকার হয়, তখনও সেই শহর তুলনামূলকভাবে তাদের অত্যাচার থেকে নিরাপদ থাকে।

এই ঘটনা আহলে বাইতের (আ.) মহান চরিত্রের আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এত দুঃখ-কষ্ট, বিপর্যয় ও বন্দিদশার মধ্যেও হযরত উম্মে কুলসুম (সা.) সেই যুবকদের আন্তরিকতা, সাহস ও আত্মত্যাগের মানসিকতাকে উপেক্ষা করেননি। যদিও তাদের প্রচেষ্টা বন্দিদের মুক্ত করতে পারেনি, তবুও তাদের নিষ্ঠা ও ঈমানের মূল্য তিনি কল্যাণের দোয়ার মাধ্যমে দিয়েছেন।

এ থেকে বোঝা যায় যে, আহলে বাইতের (আ.) দৃষ্টিতে কোনো কাজের মূল্য কেবল তার বাহ্যিক সাফল্যের ওপর নির্ভর করে না; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা নিয়ত, দায়িত্ববোধ এবং জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসও সমানভাবে মূল্যবান ও সম্মানের দাবিদার।

শামের পথে আহলে বাইতের (আ.) মর্যাদা রক্ষায় হযরত উম্মে কুলসুম (সা.)-কারবালার বন্দিদের আত্মমর্যাদা ও দৃঢ়তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

কারবালার বন্দিরা যে আরেকটি শহর অতিক্রম করেছিলেন এবং যেখানে আবারও হযরত উম্মে কুলসুম (সা.)-এর ভূমিকা প্রকাশ পায়, সেটি ছিল বালবাক (বালবেক)।

মরহুম মাহাল্লাতী তাঁর ‘রিয়াহীনুশ শরিয়াহ’ গ্রন্থে লিখেছেন, যখন বন্দিদের কাফেলা শামের নিকটবর্তী বালবাকে পৌঁছায়, তখন শহরের লোকেরা ইয়াজিদের সৈন্যদের আগমনে আনন্দ প্রকাশ করে বাদ্যযন্ত্র বাজায় এবং নাচ-গান ও আমোদ-প্রমোদের আসর বসায়।

এই দৃশ্য দেখে হযরত উম্মে কুলসুম (সা.) তাদের জন্য বদদোয়া করেন এবং বলেন-

«أبادَ اللّٰهُ خَضراءَهُم، ولا أَعذَبَ اللّٰهُ شَرابَهُم، ولا رَفَعَ اللّٰهُ أیدِیَ الظَّلَمَةِ عَنهُم.»

অর্থাৎ-আল্লাহ যেন তাদের ভূমির সবুজ শ্যামলতা ধ্বংস করে দেন, তাদের পানি যেন কখনো সুপেয় না হয় এবং জালিমদের হাত যেন তাদের ওপর থেকে কখনো না সরে।

এই বর্ণনা অনুযায়ী, আবু মিখনাফ উল্লেখ করেছেন যে, হযরত উম্মে কুলসুম (সা.)-এর এই বদদোয়াও পরবর্তীকালে বাস্তবায়িত হয়েছিল।

শামে প্রবেশের আগে শিমরের সঙ্গে হযরত উম্মে কুলসুম (সা.)-এর সংলাপ

আরেকটি বর্ণনা শামের প্রবেশদ্বারে শিমর (অভিশপ্ত)-এর সঙ্গে হযরত উম্মে কুলসুম (সা.)-এর কথোপকথন সম্পর্কিত।

তিনি শিমরকে অনুরোধ করেন, শহীদদের পবিত্র মস্তকগুলো যেন কাফেলার সামনে বহন করা হয় এবং বন্দি নারীদের এমন একটি অপেক্ষাকৃত নির্জন দরজা দিয়ে শহরে প্রবেশ করানো হয়, যাতে মানুষের দৃষ্টি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পরিবারের নারীদের দিকে কম পড়ে।

কিন্তু সপ্তম শতকের আলেম ইবন নামা তাঁর ‘মুসীরুল আহযান’ গ্রন্থে লিখেছেন, তাঁর এই অনুরোধ ইচ্ছাকৃতভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়। বরং কারবালার বন্দিদের ‘বাবুস সাআত’ নামে শামের সবচেয়ে জনবহুল প্রবেশদ্বার দিয়ে শহরে আনা হয় এবং শহীদদের পবিত্র মস্তকগুলো নারীদের মাঝখানে রাখা হয়, যাতে আহলে বাইতের (আ.) পরিবারকে আরও বেশি অপমান ও কষ্ট দেওয়া যায়।

তবে এতসব নির্যাতন, অপমান ও লাঞ্ছনার পরও আহলে বাইতের (আ.) সদস্যরা শত্রুর সামনে মাথা নত করেননি। বরং অসীম দৃঢ়তা, মর্যাদা ও আত্মসম্মান নিয়ে তাঁরা ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আসমানি আন্দোলনের পতাকা বহন করেন এবং সেই মহান বিপ্লবের বার্তা সর্বত্র পৌঁছে দেন।

শেষ বর্ণনা: উমর ইবনে মুনযিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ

এই প্রসঙ্গে হযরত উম্মে কুলসুম (সা.) সম্পর্কে সর্বশেষ যে বর্ণনা আমাদের কাছে পৌঁছেছে, তা হলো উমর ইবনে মুনযির-এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ।

তিনি উমর ইবনে মুনযিরকে অনুরোধ করেন, যেন তিনি বর্শাধারীদের কিছু অর্থ দেন, যাতে তারা শহীদদের পবিত্র মস্তকগুলো কাফেলার অনেকটা সামনে নিয়ে চলে। এর ফলে মানুষের দৃষ্টি মূলত সেই পবিত্র মস্তকগুলোর দিকেই নিবদ্ধ থাকবে এবং আল্লাহর পরিবারের নারীরা পরপুরুষের দৃষ্টি থেকে কিছুটা হলেও নিরাপদ থাকবেন।

উমর ইবনে মুনযির তাঁর অনুরোধ গ্রহণ করেন। তিনি বর্শাধারীদের অর্থ প্রদান করেন এবং তাদের রাজি করান যাতে তারা কাফেলার আগে আগে অগ্রসর হয়।

এই সমস্ত ঐতিহাসিক বর্ণনা আবারও প্রমাণ করে যে আহলে বাইত (আ.) এবং কারবালার মুক্তচেতা বন্দিরা স্বাধীনচেতা মনোভাব, আত্মমর্যাদা এবং সম্মানজনক জীবনযাপনের আদর্শ কখনো বিসর্জন দেননি।

তাঁরা আপাতদৃষ্টিতে দুর্বল ও বন্দি অবস্থায় থাকলেও আচরণে ছিলেন মহিমান্বিত, মর্যাদাবান ও অবিচল। তাঁরা রাসূলের (সা.) পরিবারের পবিত্র মর্যাদা রক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছেন, অপাত্রের দৃষ্টি থেকে তাঁদের নারীদের রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন এবং সীমাহীন দুঃখ-কষ্ট ও নির্যাতনের মধ্যেও শহীদদের রক্তের উদ্দেশ্য সফল করা ও আশুরার মহান বার্তা বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার পথে দৃঢ়সংকল্পে অগ্রসর হয়েছেন।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha