রবিবার ২৬ জুলাই ২০২৬ - ০৯:৫৯
কেন আরবাঈন নবীন ইসলামী সভ্যতা নির্মাণের পথে উম্মাহর পুনর্জাগরণের প্রতীক?

হোসাইনি আরবাঈন কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, প্রতিরোধচেতনা, আত্মত্যাগ ও মানবিক মূল্যবোধের এক অনন্য বৈশ্বিক প্রকাশ।

হাওজা নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গবেষক ও বিশ্লেষকদের মতে, আরবাঈনের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো ইসলামী ‘উম্মাহ’ ধারণার পুনর্জাগরণ এবং নবীন ইসলামী সভ্যতা নির্মাণের উপযোগী আদর্শ মানুষ গড়ে তোলা।

সভ্যতাগত দৃষ্টিকোণ থেকে আরবাঈনের তাৎপর্য
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর স্মৃতি ও আদর্শের বরকত এবং তাঁর অনুসারী ও অনুরাগীদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হোসাইনি আরবাঈনের এই মহিমান্বিত আধ্যাত্মিক অনুষ্ঠান কেবল একটি বার্ষিক ধর্মীয় আচার হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি এক গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতাগত (Civilizational) ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘হোসাইনি আরবাঈন’ ও ‘নবীন ইসলামী সভ্যতা’-এর পারস্পরিক সম্পর্ক অনুধাবন করতে হলে কেবল বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের দিকে তাকালে হবে না; বরং এর অন্তর্নিহিত সামাজিক, রাজনৈতিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক মাত্রাগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আরবাঈন হলো বৈশ্বিক পরিসরে এক সভ্যতাভিত্তিক জীবনব্যবস্থার বাস্তব অনুশীলন।

উম্মাহর শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী (রহ.)’র পক্ষ থেকে আরবাঈনের পদযাত্রা
হাওজায়ে ইলমিয়ার শিক্ষক ও সাংস্কৃতিক কর্মী হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়্যেদ মাহমুদ মুসাভি-হাসাব বলেন, “আরবাঈনের সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত ইসলামী ‘উম্মাহ’ ধারণার পুনর্জাগরণ। আধিপত্যবাদী শক্তি বহু বছর ধরে জাতিগত পরিচয়, ভৌগোলিক সীমানা ও ক্ষণস্থায়ী স্বার্থের সংকীর্ণ পরিসরে এই ধারণাকে আবদ্ধ করে রাখতে চেয়েছে। কিন্তু আরবাঈনের এই মহিমান্বিত ঘটনাপ্রবাহ সেই প্রচেষ্টাকে কার্যত ব্যর্থ করে দিয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “বিশেষ করে এ বছর আমাদের জন্য—বিশেষত ইরানের জনগণ এবং প্রতিরোধ অক্ষের সমর্থকদের জন্য—আরবাঈনের আবহ একেবারেই ভিন্ন। আমাদের শহীদ ইমাম ও নেতার ঐতিহাসিক বিদায় এবং অভূতপূর্ব গণশোকযাত্রার স্মৃতি এখনো মানুষের হৃদয়ে অম্লান। সেই ঘটনাই আশুরার চেতনায় উদ্বুদ্ধ উম্মাহকে আমাদের সময়ে কারবালার চিরন্তন সত্য নতুনভাবে তুলে ধরতে অনুপ্রাণিত করেছে।”

তিনি বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, এ বছরের আরবাঈনের পদযাত্রা সেই পবিত্র পথেরই ধারাবাহিকতা, যার সূচনা হয়েছিল আশুরায় এবং যা আজ আমাদের মহান শহীদ নেতা ও ইসলামী উম্মাহর অন্যান্য শহীদদের রক্তে আরও সুদৃঢ় হয়েছে। তাই আমরা এ বছরের আরবাঈনের পদযাত্রা আমাদের শহীদ ইমাম ও নেতার পক্ষ থেকে আরও দৃঢ়তা, মর্যাদা ও উৎসাহের সঙ্গে পালন করব। বিশ্বকে জানিয়ে দেব—আমরাই ইমাম হুসাইন (আ.) ও হযরত যায়নাব (সা.আ.)-এর আদর্শের উত্তরসূরি; যুগের ইয়াজিদদের সঙ্গে আপস বা আত্মসমর্পণ আমাদের নীতির অংশ নয়।”

আহলে বাইত (আ.)-এর অনুসারীদের সর্ববৃহৎ সামাজিক শক্তি
হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়্যেদ মাহমুদ মুসাভি-হাসাব বলেন, আরবাঈনের মহাসমাবেশে শিয়া মুসলিম ও আহলে বাইত (আ.)-এর অনুসারীদের সবচেয়ে বড় সামাজিক শক্তি হিসেবে যে বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়, তা হলো প্রতিরোধের চেতনা। এই চেতনা একদিকে ইসলামী উম্মাহর ঐক্য ও সংহতিকে আরও সুদৃঢ় করে, অন্যদিকে আরবাঈনের মহিমা এবং লাখো পদযাত্রীর উপস্থিতি দেখে ইসলাম ও প্রতিরোধবিরোধী শক্তিগুলো গভীরভাবে শঙ্কিত হয়ে ওঠে।

তিনি আরও বলেন, আরবাঈনে আমরা এমন এক অনন্য দৃশ্যের সাক্ষী হই, যেখানে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান, জাতিগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী দল এবং কোটি কোটি মানুষ নিজ নিজ স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ রেখেই একত্রিত হয়ে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মানবসমাবেশের আয়োজন করে। মহান আল্লাহর অনুগ্রহ এবং ইমাম হুসাইন (আ.)-এর বিশেষ দৃষ্টিতে আরবাঈনের এই মহাসমাবেশ দিন দিন আরও বৈশ্বিক পরিসর লাভ করছে এবং সমগ্র মানবজাতির মধ্যে নতুন জাগরণের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে।

ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে উম্মাহর পুনর্জাগরণ
হাওজা বিষয়ক গবেষক নার্গিস শেকারজাদেহর মতে, হোসাইনি আরবাঈন বর্তমান সংবেদনশীল সময়ে উম্মাহ গঠনের সক্ষমতার এক অনন্য প্রদর্শনী। তাঁর ভাষায়, মানবসভ্যতা আজ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়েছে।

তিনি বলেন, আধুনিক বিশ্ব চরম ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার প্রসারের মাধ্যমে মানুষের পারস্পরিক বন্ধনকে দুর্বল করে দিয়েছে। অথচ আরবাঈনের এই অনন্য মহাসমাবেশ ইমাম হুসাইন (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসাকে কেন্দ্র করে ভৌগোলিক, ভাষাগত ও জাতিগত বিভাজনের প্রাচীর ভেঙে দিয়েছে। বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গির গণ্ডি অতিক্রম করে এটি এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, যেখানে ঈমানদার মানুষ আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পথে অগ্রসর হওয়ার পাশাপাশি আত্মিক ও নৈতিক বিকাশের সুযোগ লাভ করেন।

তিনি আরও বলেন, নবীন ইসলামী সভ্যতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটি মুনাফাকেন্দ্রিক পুঁজিবাদী যুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে আরবাঈন এমন একটি বিকল্প অর্থনৈতিক মডেল উপস্থাপন করে, যেখানে মানুষের প্রয়োজন পূরণের মূল ভিত্তি ব্যক্তিগত লাভ নয়; বরং নিঃস্বার্থ দান, উদারতা এবং প্রতিদানের প্রত্যাশাহীন আন্তরিক সেবা।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha