বুধবার ২৯ জুলাই ২০২৬ - ১৩:২৪
সচেতনতার অভাব পরিবারকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঝুঁকির মুখে ফেলে

সময়ের চাহিদা অনুযায়ী জ্ঞান ও সচেতনতা বৃদ্ধি না করলে পরিবার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নানা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে মন্তব্য করেছেন জ্যেষ্ঠ কাউন্সেলিং বিশেষজ্ঞ হাসান মীরহায়দারী।

ইরানের ইস্ফাহানে হাওজা নিউজ এজেন্সি’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হাসান মীরহায়দারী বলেন, একটি পরিবার তখনই প্রকৃত অর্থে আধ্যাত্মিক বিকাশের পথে এগোতে পারে, যখন তার সদস্যরা ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের জ্ঞান সমৃদ্ধ করেন এবং কেবল একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন না। তাঁর মতে, বর্তমান যুগে পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি ধর্মীয়, সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক জ্ঞানও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, প্রযুক্তি, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে মিডিয়া-সচেতনতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি প্রয়োজন। কারণ, ভুয়া খবর ও গুজব সহজেই একটি পরিবারের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে। অনেক বিভ্রান্তিকর সংবাদে সত্য ও মিথ্যার মিশ্রণ থাকে। যথেষ্ট সচেতনতা না থাকলে পরিবারগুলো সহজেই এসবের প্রভাবে পড়ে।

সন্তানদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে অভিভাবকদের
মীরহায়দারী বলেন, অতীতে বাবা-মা ও সন্তানদের মধ্যে জ্ঞানের ব্যবধান তুলনামূলকভাবে কম ছিল। তখন পরিবারের প্রধান তথ্যসূত্র ছিলেন অভিভাবকেরাই। কিন্তু ডিজিটাল যুগে অনেক সন্তান এমন তথ্যের নাগাল পাচ্ছে, যা অনেক সময় বাবা-মায়ের কাছেও অজানা। তাই সন্তানদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে অভিভাবকদেরও নিয়মিত নিজেদের জ্ঞান ও সচেতনতা বাড়াতে হবে।

তিনি বলেন, একটি পরিবারের প্রকৃত বিকাশ তখনই সম্ভব, যখন সব সদস্য একসঙ্গে শেখার ও উন্নতির পথে এগিয়ে যায় এবং ধর্মীয়, সামাজিক, মানসিক ও শারীরিকসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের জ্ঞান সমৃদ্ধ করে।

তিনি আরও বলেন, শিশুদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান, শোকানুষ্ঠান ও দ্বীনি সমাবেশে অংশগ্রহণ তাদের চরিত্র গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ, শিশুরা মূলত দেখা ও শোনার মাধ্যমে শেখে এবং এসব অভিজ্ঞতা তাদের ভবিষ্যৎ ব্যক্তিত্বে গভীর প্রভাব ফেলে।

তাঁর ভাষায়, মানুষের ব্যক্তিত্বের বড় অংশ শৈশবেই গড়ে ওঠে। ভবিষ্যতের আচরণ অনেকাংশে নির্ভর করে শিশু তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে কী ধরনের আদর্শ গ্রহণ করেছে তার ওপর। তাই অভিভাবকদের উচিত নিজেদের আচরণের মাধ্যমে সন্তানদের জন্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করা।

পরিবার পরিচালনায় স্বামী-স্ত্রীর যৌথ দায়িত্ব
মীরহায়দারী বলেন, পরিবারের মূল ভিত্তি স্বামী ও স্ত্রী। পরিবার পরিচালনার দায়িত্ব উভয়েরই সমান। একজন কখনোই নিজের দায়িত্ব পুরোপুরি অন্যজনের ওপর চাপিয়ে দিতে পারেন না।

তিনি বলেন, পারিবারিক উন্নতি তখনই সম্ভব, যখন স্বামী-স্ত্রী পারস্পরিক সমন্বয় ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে এগিয়ে যান। যদি প্রত্যেকে শুধু নিজের মতামতের ওপর অনড় থাকেন, তাহলে পরিবারের অগ্রগতি ব্যাহত হয়।

তাঁর মতে, পারস্পরিক সহযোগিতা শুধু অর্থনৈতিক বিষয়ে সীমাবদ্ধ নয়। কোনো কারণে একজন যদি নিজের কিছু দায়িত্ব পালন করতে না পারেন, তবে পারিবারিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অন্যজনের উচিত সেই দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া।

তিনি বলেন, পারিবারিক আন্তরিকতা শুধু ভালোবাসার প্রকাশ নয়; বরং অংশীদারিত্ব, সহমর্মিতা এবং একে অপরকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার মধ্যেই এর প্রকৃত প্রকাশ ঘটে। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে স্বামী-স্ত্রীর একে অপরের নির্ভরযোগ্য সহযাত্রী হওয়া উচিত।

আধ্যাত্মিকতা সামাজিক বিপথগামিতা প্রতিরোধে সহায়ক
জনাব মীরহায়দারী বলেন, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সন্তানদের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা যত দৃঢ় হয়, তাদের মাদকাসক্তি ও অন্যান্য সামাজিক অপরাধ বা ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তত কমে। কারণ, ধর্ম মানুষের জীবনে লক্ষ্য, অর্থ ও সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করে।

তিনি বলেন, ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষ শুধু নিজেদের নৈতিক বিশ্বাসের কারণেই ক্ষতিকর কাজ থেকে বিরত থাকেন না; তারা এমন একটি সামাজিক পরিবেশেও বেড়ে ওঠেন, যেখানে বন্ধু ও আশপাশের মানুষও তাদের ভুল পথে যেতে নিরুৎসাহিত করেন।

তিনি আরও বলেন, বিশ্বের বহু চিন্তাবিদও মানসিক সুস্থতার ক্ষেত্রে আধ্যাত্মিকতার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁদের মতে, ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাওয়া নানা মানসিক সমস্যার জন্ম দিতে পারে, আর আধ্যাত্মিকতার দিকে ফিরে আসা এসব সমস্যা মোকাবিলায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, শৈশব থেকেই সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষা, আহলে বাইত (আ.)-এর আদর্শ এবং ধর্মীয় বিধান-বিধেয় সম্পর্কে পরিচিত করে তোলা উচিত। কারণ, জীবনের প্রথম দিকের ধর্মীয় শিক্ষা ব্যক্তিত্ব গঠনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।

আন্তরিক পারিবারিক পরিবেশই নিরাপত্তার ভিত্তি
তিনি বলেন, পরিবারের প্রতিটি সদস্যের কাছে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হওয়া উচিত নিজের ঘর। যদি কোনো সন্তান ঘরে নিরাপত্তা ও স্বস্তি অনুভব না করে, তবে সে সহজেই বিভিন্ন সামাজিক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

তিনি আরও বলেন, আন্তরিকতা শুধু মুখের ভালোবাসায় সীমাবদ্ধ নয়। পরিবারের সদস্যদের জন্য সময় দেওয়া, সন্তানদের সঙ্গে কথা বলা, খেলাধুলা করা, তাদের মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং তাদের মানসিক ও আবেগগত চাহিদা বোঝার মধ্য দিয়েই প্রকৃত পারিবারিক নিরাপত্তা গড়ে ওঠে।

শেষে তিনি বলেন, অনেক সন্তান তাদের সমস্যার কথা বাবা-মায়ের সঙ্গে ভাগ করে না, কারণ তারা মনে করে ঘরে নিজেদের কথা বলার মতো নিরাপদ পরিবেশ নেই। অথচ পরিবারে যদি পারস্পরিক বিশ্বাস, আন্তরিকতা ও উন্মুক্ত যোগাযোগের পরিবেশ গড়ে ওঠে, তাহলে সন্তানরা নির্ভয়ে নিজেদের সমস্যা ও উদ্বেগ অভিভাবকদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারবে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha