হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, হাওজা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন আলী রেজা পানাহিয়ান শনিবার «আফতাবে শারঘি» (পূর্বের সূর্য) অনুষ্ঠানে হুসাইনি আরবাঈন জিয়ারতের বিশেষ মর্যাদা সম্পর্কে বলেন: যদি আরবাঈনের জিয়ারত আল্লাহর দরবারে কবুল হয়, তবে এর প্রভাব ও পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে ব্যাপক হবে। কারণ এই আন্দোলন কেবল সাধারণ হাঁটা বা স্বাভাবিক কোনো ভ্রমণ নয়; বরং এটি একটি সক্রিয় আন্দোলন এবং শহীদ নেতার ভাষায়, নতুন বৈশ্বিক সভ্যতা গঠনের সূচনালগ্ন।
তিনি বলেন, মহান সওয়াবসম্পন্ন প্রতিটি ইবাদতেরই বড় সামাজিক ও বাস্তব প্রভাব থাকে। একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি, যার ওপর ইমাম খোমেনী (রহ.)-ও জোর দিয়েছেন, তা হলো-যখন ইমাম হুসাইনের (আ.) জন্য এক ফোঁটা অশ্রুর মতো ব্যক্তিগত আমলের জন্য এত বড় সওয়াব বর্ণনা করা হয়েছে, তখন তার সামাজিক প্রভাবের দিকেও নজর দিতে হবে। এমন কোনো মহান কাজ হতে পারে না যার পৃথিবী ও মানুষের জীবনে সামান্য প্রভাব থাকবে।
হুজ্জাতুল ইসলাম পানাহিয়ান আরও বলেন, আরবাঈনের পদযাত্রা সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, আবা আব্দিল্লাহ আল-হুসাইনের (আ.) পবিত্র মাজারের পথে একজন জিয়ারতকারী যে প্রতিটি পদক্ষেপ নেন, তার জন্য এমন সওয়াব রয়েছে যা হজ ও উমরার মর্যাদা থেকে শুরু করে রাসুলে আকরাম (সা.)-এর সঙ্গী হয়ে শাহাদাতের মর্যাদার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এই বিশাল প্রতিদানের বিষয়টি প্রমাণ করে যে এর অবশ্যই বড় বাস্তব ও সামাজিক প্রভাব রয়েছে।
এই হাওজা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বলেন, আরবাঈন ইসলামী সভ্যতা ও মাহদাভি সমাজের প্রস্তুতির একটি মাধ্যম। আমরা সবসময় বলি, ইমাম মাহদি (আ.) পৃথিবীকে ন্যায় ও ইনসাফে পরিপূর্ণ করবেন। তবে এই ঘটনা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সে বিষয়েও আলোচনা করা দরকার। অনেক সময় ভুল ধারণা তৈরি হয় যে, তিনি মানুষের কোনো ভূমিকা ছাড়াই অলৌকিক শক্তির মাধ্যমে পৃথিবীতে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন; অথচ এ ক্ষেত্রে জনগণের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, ইমাম মাহদির (আ.) শাসনে ন্যায় প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান কারণ হবে মানুষের দায়িত্ববোধ ও সমাজ পরিচালনায় তাদের ব্যাপক অংশগ্রহণ-যা আজ আমরা হুসাইনি আরবাঈনে প্রত্যক্ষ করছি। আরবাঈন হলো একটি বৃহৎ সামাজিক আন্দোলন পরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণের সুস্পষ্ট উদাহরণ।
হুজ্জাতুল ইসলাম পানাহিয়ান আরবাঈন আয়োজনের ক্ষেত্রে জনগণের ভূমিকার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন: এই মহান আন্দোলনে মানুষ ভালোবাসা ও ব্যক্তিগত আগ্রহ নিয়ে অংশগ্রহণ করে। কোনো মোখেব (সেবাকেন্দ্র) সরকারি নির্দেশ বা আদেশে তৈরি হয় না, কেউ বাধ্য হয়ে জিয়ারতকারীদের জন্য খরচ বহন করে না; বরং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই এমন এক মহাকাব্যের সৃষ্টি করে।
তিনি বলেন, আরবাঈনে আমরা এমন একটি সমাজের চিত্র দেখি যেখানে আইন ও আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার প্রয়োজন কমে যায়, কারণ ভালোবাসা ও আত্মত্যাগ অনেক কাজের স্থান পূরণ করে। মানুষ নিজেদের সম্পদ পরস্পরের মধ্যে ভাগ করে নেয়, অপরিচিতদের সেবা করে এবং অন্যদের জন্য নিজেদের স্বার্থ ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকে।
এই শিক্ষক আরও বলেন, সাধারণ ধর্মীয় সমাবেশে মানুষ হয়তো একই সংগঠনের সদস্যদের জন্য খাবার ও সুযোগ-সুবিধা প্রস্তুত করে, কিন্তু আরবাঈনে মানুষ এমন ব্যক্তিদের সেবা করে যাদের তারা চেনেও না। এই মনোভাবই একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের ভিত্তি হতে পারে।
তিনি ইসলামী ও পশ্চিমা সভ্যতার ন্যায়বিচারের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য তুলে ধরে বলেন: পশ্চিমা সভ্যতা আইন বৃদ্ধি এবং ব্যক্তিগত অধিকার রক্ষার ওপর জোর দিয়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। কিন্তু যখন সমাজ স্বার্থপরতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে, তখন তার ফল হয় ভালোবাসার হ্রাস এবং অসুস্থ প্রতিযোগিতা। প্রকৃত ন্যায় তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন মানুষ অন্যদের জন্য ত্যাগ ও ক্ষমার মানসিকতা ধারণ করে।
হুজ্জাতুল ইসলাম পানাহিয়ান বলেন: ন্যায় ভালোবাসা ও দানের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে পারে? তারাই পারে যারা নিজেরা আত্মত্যাগী, ক্ষমাশীল এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের পেছনে ছুটে বেড়ায় না। যে সমাজের মানুষ অন্যদের সেবায় এগিয়ে আসে, সেই সমাজই ব্যাপকভাবে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।
তিনি বলেন, মাহদাভি সমাজের কর্মকর্তারাও সেবামুখী দৃষ্টিভঙ্গি রাখবেন। ইমাম সাদিক (আ.)-এর বাণীতে এসেছে, যদি ইমাম মাহদির (আ.) সরকারের কর্মকর্তারা বিলাসী জীবনযাপন করেন এবং সমাজের নিম্নস্তরের মানুষের জীবনযাপন অনুভব না করেন, তবে তারা সেই মর্যাদার অধিকারী হবেন না। সেই সমাজে দায়িত্ব গ্রহণ ভোগের জন্য নয়, বরং সেবার জন্য হবে।
এই হাওযা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আরবাঈনের মোখেবদের আদর্শের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন: সমাজের কর্মকর্তাদের মোখেবদের মতো হওয়া উচিত-যারা ভালোবাসা, নিষ্ঠা ও কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই মানুষের সেবা করেন। এই মানসিকতা দেশের সামাজিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেও বিস্তৃত হওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন: আমাদের মসজিদগুলো যদি আরবাঈনের মোখেবগুলোর মতো সেবা প্রদান, জনগণের অংশগ্রহণ এবং মানুষের সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রে পরিণত হয়, তাহলে জনগণের অংশগ্রহণেই সমাজের অনেক সমস্যা সমাধান হতে পারে। মসজিদের মানুষের সেবায় বড় সম্ভাবনা রয়েছে এবং সমাজ পরিচালনায় তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শেষে হুজ্জাতুল ইসলাম পানাহিয়ান কুরআনের আয়াত «لِیَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ» (যাতে মানুষ ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য দাঁড়ায়)-এর প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন: নবীদের লক্ষ্য ছিল মানুষ নিজেরাই যেন ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য এগিয়ে আসে। মনে রাখতে হবে, এই আন্দোলন শুধু আবেগনির্ভর কোনো পদক্ষেপ নয়; বরং এর অর্থ হলো ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে সমাজ গঠনে জনগণের অংশগ্রহণ। আরবাঈন এই সামাজিক ও সভ্যতাগত আন্দোলনের একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ।
আপনার কমেন্ট