রবিবার ২ আগস্ট ২০২৬ - ১৭:২২
আরবাইনের কোটি মানুষের সমাবেশ ইমাম হুসাইন (আ.)–এর প্রতি ভালোবাসার শক্তির বহিঃপ্রকাশ

ইরানের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন ও বক্তা হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন আলীরেজা পানাহিয়ান বলেছেন, ইমাম হুসাইন (আ.)–এর প্রতি ভালোবাসার মতো মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম আর কোনো শক্তি নেই। আরবাইনের মহাসমাবেশ আহলে বাইত (আ.)–এর প্রতি ভালোবাসা থেকে উৎসারিত সেই ঐক্য ও শক্তিরই বাস্তব প্রকাশ, যা দ্বীনের বিজয় এবং ইমাম মাহদি (আ.)–এর আবির্ভাবের জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক শক্তি গড়ে তুলতে পারে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: তেহরানে সম্প্রচারিত ‘আফতাবে শারকি’ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, আহলে বাইত (আ.) মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গভীর দূরদর্শিতার ভিত্তিতে মানুষের হৃদয়কে ইমাম হুসাইন (আ.)–এর সঙ্গে যুক্ত করার বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। এর লক্ষ্য ছিল মুসলিম সমাজের মধ্যে এমন একটি ঐক্য সৃষ্টি করা, যা তাদের শক্তিশালী করে তুলবে।

তিনি বলেন, ইমাম হুসাইন (আ.)–এর জিয়ারত, তাঁর মুসিবতে অশ্রুপাত, তাঁর প্রশংসায় কবিতা রচনা এবং তাঁর পবিত্র রওজার উদ্দেশে সফরের জন্য ইমামগণ (আ.) যে বিপুল সওয়াবের কথা বর্ণনা করেছেন, তা কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের জন্য নয়; বরং এর পেছনে মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী করার এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিহিত রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ইমাম হুসাইন (আ.)–এর প্রতি ভালোবাসার মতো মানুষের হৃদয়কে একত্রিত করার ক্ষমতা আর কোনো কিছুর নেই। এই ভালোবাসাই মুসলিম উম্মাহর জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ ঐক্যের ভিত্তি।

ইমাম খোমেনি (রহ.)–এর দৃষ্টিভঙ্গির প্রসঙ্গ তুলে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন পানাহিয়ান বলেন, আজকের মতো বিশাল আরবাইন সমাবেশ গড়ে ওঠার বহু আগেই তিনি এই ভবিষ্যতের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ইরান-ইরাক যুদ্ধের পর আহলে বাইত (আ.)–কে কেন্দ্র করে দুই জাতির মধ্যে এমন এক ঐক্য গড়ে উঠবে, যা মুসলিম সমাজকে এমন শক্তি দান করবে যে তাদের আর অন্য কোনো শক্তির ওপর নির্ভর করতে হবে না।

তিনি ইরান-ইরাক যুদ্ধের ত্যাগ ও আত্মদানের কথা স্মরণ করে বলেন, সেই যুদ্ধে ইরান ও ইরাক—উভয় দেশের জনগণই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। ইরাকের হাওজাগুলো বহু শহীদ উপহার দিয়েছে এবং দেশটির সাধারণ মানুষও বাথ শাসনের নির্যাতন ভোগ করেছে। অথচ আজ সেই দুই জাতিই ইমাম হুসাইন (আ.)–এর ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে একই পথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাঁটছে।

তিনি বলেন, একসময় কেউ কেউ মনে করতেন, ইমাম হুসাইন (আ.)–এর জন্য শোকপালন সমাজকে দুর্বল করে। এমনকি ইসলামি বিপ্লবের পরও কেউ কেউ শোকানুষ্ঠান সীমিত করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু ইমাম খোমেনি (রহ.) এ ধারণার দৃঢ় বিরোধিতা করে বলেছিলেন, আজাদারির মিছিল নিজেরাই একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন।

এই বক্তা আরও বলেন, ইমাম খোমেনি (রহ.) যদি আজ জীবিত থাকতেন, তবে আরবাইনের কোটি মানুষের এই মহাসমাবেশ এবং ভালোবাসা ও ঐক্যের এই অনন্য প্রদর্শনের প্রশংসা করতেন। কারণ, এটি মাকতাবে সাইয়্যিদুশ শুহাদা (আ.)–এর শক্তি সৃষ্টির এক উজ্জ্বল নিদর্শন।

তিনি বলেন, এই শক্তির মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক মাওয়াদ্দাত (ভালোবাসা)। আরবাইনের পথে মানুষের ভিড়, দীর্ঘ পথচলার কষ্ট কিংবা শারীরিক ক্লান্তি—কোনোটিই মানুষকে নিরুৎসাহিত করে না। বরং তারা এমন এক পরিবেশে প্রবেশ করে, যেন একটি বৃহৎ পরিবারের সদস্যদের মাঝে অবস্থান করছে।

তিনি আরও বলেন, সাধারণত জনসমাগম মানুষের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। কিন্তু আরবাইনে যত মানুষের সমাগম বাড়ে, ততই ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও উদ্দীপনা বৃদ্ধি পায়। এমনকি ইমাম হুসাইন (আ.)–এর পবিত্র রওজার নিকট, যেখানে সবচেয়ে বেশি ভিড় থাকে, সেখানেও মানুষ গভীর ভালোবাসা ও আবেগ নিয়ে উপস্থিত হয়।

তিনি পবিত্র কুরআনের এ আয়াতটি উদ্ধৃত করেন—

قُل لَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَى.

এবং বলেন, আল্লাহ তাআলা আহলে বাইত (আ.)–এর প্রতি মাওয়াদ্দাত বা গভীর ভালোবাসার নির্দেশ দিয়েছেন। এই ভালোবাসা কেবল অন্তরের অনুভূতি নয়; বরং তা মানুষের আচরণ ও কর্মে প্রতিফলিত হওয়া উচিত।

তিনি বলেন, সবাই জানে মানবপ্রেম, সহমর্মিতা ও পরোপকার মহৎ গুণ। কিন্তু বাস্তবে এগুলো বাস্তবায়ন করা সবসময় সহজ নয়। ইমাম হুসাইন (আ.)–এর প্রতি ভালোবাসাই মানুষকে এই মূল্যবোধগুলো বাস্তবে রূপ দিতে উদ্বুদ্ধ করে এবং একে অপরের জন্য আত্মত্যাগে অনুপ্রাণিত করে।

আরবাইনের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, আজ আরবাইনের মাধ্যমে যে সামাজিক শক্তি গড়ে উঠছে, ইমাম মাহদি (আ.)–এর বিশ্বব্যাপী ন্যায়ভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সেই শক্তিই প্রয়োজন। কারণ, তাঁর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো ঈমানদার মানুষের ঐক্য ও সমবেত শক্তি।

তিনি আরও বলেন, ইমাম মাহদি (আ.)–এর সাহাবিদের ঐক্য সম্পর্কিত বর্ণনাগুলো থেকেও বোঝা যায় যে, ইমাম হুসাইন (আ.)–এর প্রতি ভালোবাসাই মানুষকে একত্রিত করে। আর আরবাইনের এই মহাসমাবেশ সেই ঈমানভিত্তিক শক্তির একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

সবশেষে পানাহিয়ান বলেন, যাদের আরবাইনে অংশগ্রহণের সামর্থ্য রয়েছে, তাদের উচিত এ সুযোগ হাতছাড়া না করা—যদি না তাদের ওপর এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো শরয়ি দায়িত্ব বর্তায়। আর যারা যেতে সক্ষম নন, তারা অন্য কাউকে নিজের পক্ষ থেকে পাঠিয়ে কিংবা আর্থিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই মহৎ আন্দোলনে শরিক হতে পারেন।

তিনি বক্তব্য শেষ করেন এই বলে যে, আল্লাহ তাআলা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—

وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا.

অর্থাৎ, যারা আল্লাহর পথে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালায়, আল্লাহ তাদের জন্য হিদায়াত ও সাহায্যের পথ উন্মুক্ত করে দেন। তাঁর মতে, আরবাইনের কোটি মানুষের এই মহাসমাবেশ সেই ঐশী প্রতিশ্রুতিরই এক বাস্তব নিদর্শন।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha