হাওজা নিউজ এজেন্সি’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জন্যই কেন আরবাঈন পালিত হয়—এ প্রশ্নে আলেমদের মধ্যে মূলত দু’টি মত রয়েছে।
একদল আলেমের মতে, আরবাঈন ইমাম হুসাইন (আ.)-এর একান্ত বৈশিষ্ট্য। কারণ, অন্যান্য নিষ্পাপ ইমামদের (আ.) ক্ষেত্রে আরবাঈন পালনের নির্ভরযোগ্য কোনো বর্ণনা হাদিসের উৎসগুলোতে পাওয়া যায় না। তাই আশুরার বিপ্লবের অন্যতম স্বাতন্ত্র্যসূচক বৈশিষ্ট্য হিসেবেই আরবাঈনকে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, আরেকদল আলেমের মতে, চল্লিশতম দিনের স্মরণানুষ্ঠান কেবল ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জন্য সীমাবদ্ধ নয়; অন্যদের জন্যও তা পালন করা বৈধ। তাঁদের মতে, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আরবাঈনের জিয়ারত প্রতি বছর ধারাবাহিকভাবে পালিত হলেও, অন্যান্য ইমামদের (আ.) শাহাদাতের পর তাঁদের চল্লিশতম দিনের স্মরণানুষ্ঠান সাধারণত প্রথম বছরেই অনুষ্ঠিত হতো।
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন তুরকাশভান্দ বলেন, এই দুটি মতের মধ্যে সমন্বয় করা সম্ভব। তাঁর মতে, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আরবাঈনের জিয়ারত শরিয়তসম্মত এবং বিশেষভাবে সুপারিশকৃত (মুস্তাহাব) একটি ইবাদত। তবে অন্যান্য ইমাম (আ.) কিংবা সাধারণ মানুষের জন্য চল্লিশতম দিনের অনুষ্ঠান আয়োজন বৈধ হলেও, সেটিকে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আরবাঈনের জিয়ারতের সমমর্যাদার বিশেষ মুস্তাহাব আমল বলা যাবে না।
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জন্য আরবাঈনের জিয়ারত বিশেষ হওয়ার চারটি প্রজ্ঞা
১. শক্তিশালী হাদিসভিত্তিক ভিত্তি
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন তুরকাশভান্দ বলেন, আরবাঈনের জিয়ারতকে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জন্য বিশেষভাবে নির্ধারণের প্রথম কারণ হলো এর দৃঢ় হাদিসভিত্তিক ভিত্তি। আহলুল বাইত (আ.)-এর বাণী, আমল এবং নীরব সমর্থন—তিনটিই এর বৈধতা ও বিশেষ মর্যাদার প্রমাণ বহন করে।
তিনি বলেন, মাসুমের বাণী-এর ক্ষেত্রে ইমাম জাফর আস-সাদিক (আ.) কর্তৃক সাফওয়ান আল-জাম্মালকে আরবাঈনের জিয়ারত পাঠের নির্দেশ এবং ইমাম হাসান আল-আসকারি (আ.)-এর সেই প্রসিদ্ধ হাদিস—যেখানে আরবাঈনের জিয়ারতকে মুমিনের পাঁচটি নিদর্শনের একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—এ বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
মাসুমের আমল-এর ক্ষেত্রে তিনি উল্লেখ করেন, আরবাঈনের দিনে আহলুল বাইতের (আ.) কারবালায় আগমন, আশুরার শহীদদের কবর জিয়ারত এবং ইমাম সাজ্জাদ (আ.) কর্তৃক ইমাম হুসাইন (আ.)-এর পবিত্র শির মোবারক তাঁর দেহের সঙ্গে পুনঃসংযুক্ত করার বিষয়টি বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও বর্ণনামূলক সূত্রে উল্লেখিত হয়েছে।
আর মাসুমের অনুমোদন (তাকরির)-এর উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, মহান সাহাবি জাবির ইবনে আবদুল্লাহ আনসারি ও আতিয়্যা আওফির কারবালায় উপস্থিত হয়ে জিয়ারত করা এবং ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর পক্ষ থেকে এ কাজের অনুমোদন—এসবই আরবাঈনের জিয়ারতের প্রতি আহলুল বাইতের (আ.) সমর্থনের নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়।
২. ইমাম হুসাইন (আ.)-এর অতুলনীয় আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা
তিনি বলেন, দ্বিতীয় প্রজ্ঞা হলো ইমাম হুসাইন (আ.)-এর অনন্য আত্মত্যাগ ও কোরবানিকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া।
আল্লাহর দ্বীনকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে ইমাম হুসাইন (আ.) যে বিপুল ত্যাগ, কষ্ট ও মুসিবত সহ্য করেছেন, তা ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এ কারণে আরবাঈনের জিয়ারতের প্রতি আহলুল বাইত (আ.)-এর বিশেষ উৎসাহকে তাঁর সেই মহান কোরবানির প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হয়।
৩. আরবাঈন: জুলুম ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন তুরকাশভান্দ বলেন, আরবাঈনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য হলো জুলুম, অবিচার ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের চেতনাকে জীবন্ত রাখা।
তিনি বলেন, আশুরার ঘটনার পর মুসলিম সমাজে দমন-পীড়নের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে জাবির ইবনে আবদুল্লাহ আনসারি তাঁর সামাজিক মর্যাদাকে কাজে লাগিয়ে কারবালায় গিয়ে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জিয়ারত করেন। এর মাধ্যমে তিনি ইয়াজিদের শাসনের বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদ জানান এবং আহলুল বাইতের (আ.) প্রতি আনুগত্যের বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেন।
তাঁর মতে, এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপই জিয়ারতের সংস্কৃতি, আহলুল বাইতের (আ.) প্রতি ভালোবাসা এবং জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থানের চেতনাকে সুদৃঢ় করে। ইতিহাসজুড়ে আরবাঈনের জিয়ারতের ধারাবাহিকতা ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা, প্রতিরোধ এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের বার্তাকে জীবন্ত রেখেছে।
৪. আশুরার অনন্য মর্যাদা সংরক্ষণ
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন তুরকাশভান্দ বলেন, চতুর্থ প্রজ্ঞা হলো আশুরার মহিমা, স্বাতন্ত্র্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকে অক্ষুণ্ন রাখা।
তিনি বলেন, আশুরা মানব ইতিহাসের এক অতুলনীয় ঘটনা, যার সঙ্গে অন্য কোনো ঘটনার তুলনা হয় না। তাই আরবাঈনের অনুষ্ঠান কেবল ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জন্য নির্ধারিত হওয়ায় আশুরার অনন্য মর্যাদা ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব সংরক্ষিত থাকে এবং মুসলিম উম্মাহর সম্মিলিত স্মৃতিতে এই মহান বিপ্লবের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন থাকে।
আপনার কমেন্ট