হাওজা নিউজ এজেন্সি: এর উত্তর নিহিত রয়েছে দুটি মৌলিক ধারণায়—সহনশীলতা (Resilience) ও প্রতিরোধ (Resistance)।
সহনশীলতা: সক্রিয় ভূমিকার মানসিক ভিত্তি
সহনশীলতা বলতে কেবল প্রতিকূলতা সহ্য করাকে বোঝায় না; বরং সংকট মোকাবিলা করে পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার সক্ষমতাকেও বোঝায়। একজন মুসলিম নারীর ক্ষেত্রে এর বিভিন্ন দিক রয়েছে—
১. ব্যক্তিগত সহনশীলতা: পারিবারিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করেও নিজের আত্মপরিচয় ও মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখা।
২. পারিবারিক সহনশীলতা: পরিবারকে এমন একটি নিরাপদ পরিবেশে পরিণত করা, যেখানে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ লালিত ও বিকশিত হয়।
৩. সামাজিক সহনশীলতা: সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও সমাজে ইতিবাচক ও কার্যকর উপস্থিতি বজায় রাখা।
ইসলামী দৃষ্টিতে সহনশীলতা কোনো নিষ্ক্রিয় গুণ নয়; এটি একটি সচেতন ও সক্রিয় কর্মধারা। পবিত্র কুরআনে ‘সবর’ বলতে নীরব আত্মসমর্পণ নয়; বরং প্রতিকূলতার মুখে দৃঢ়, সচেতন ও অবিচল অবস্থান গ্রহণকে বোঝানো হয়েছে।
প্রতিরোধ: আত্মরক্ষা থেকে গঠনমূলক সমাজ বিনির্মাণ
এ প্রেক্ষাপটে প্রতিরোধের দুটি দিক রয়েছে—
• প্রতিরক্ষামূলক দিক: সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, পরিচয়ের বিকৃতি এবং সামাজিক চাপের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ, যা মুসলিম নারীকে তার আদর্শ ও মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত করতে চায়।
• গঠনমূলক দিক: প্রতিরোধকে বিকল্প সাংস্কৃতিক ধারা গড়ে তোলার এক সৃজনশীল শক্তিতে রূপান্তর করা।
মুসলিম নারী শুধু অন্যায়ের বিরুদ্ধে ‘না’ বলেন না; তিনি একটি আদর্শ জীবনব্যবস্থার পক্ষেও ‘হ্যাঁ’ বলেন—যেখানে হিজাব, শালীনতা ও পরিবারকে সীমাবদ্ধতা নয়, বরং ব্যক্তিত্বের বিকাশ ও আত্মপ্রকাশের অনুকূল পরিবেশ হিসেবে দেখা হয়।
দ্বীনি সমাজে নারীর সক্রিয় ভূমিকার চ্যালেঞ্জ
ঐতিহ্য ও আধুনিকতার দ্বন্দ্ব: অনেক সময় ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা সম্পর্কে অজ্ঞতা কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাখ্যার কারণে কিছু সামাজিক রীতি ধর্মের নামে প্রতিষ্ঠিত হয়, যা নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। ফলে তিনি ‘নিষ্ক্রিয় ঐতিহ্যবাদ’ ও ‘উচ্ছৃঙ্খল আধুনিকতা’—এই দুই চরম অবস্থানের মাঝে আটকে পড়েন।
নারীর প্রতি উপকরণগত দৃষ্টিভঙ্গি: কিছু ক্ষেত্রে নারীকে হয় ভোগ্যপণ্য, নয়তো কেবল অলংকারস্বরূপ প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। উভয় ক্ষেত্রেই তার স্বাধীন সামাজিক ভূমিকা ও সক্ষমতাকে অস্বীকার করা হয়।
বাস্তবধর্মী আদর্শের অভাব: হযরত খাদিজা (সা.আ.), হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.) এবং হযরত জয়নাব (সা.আ.)-এর মতো মহান আদর্শ ইসলামী ইতিহাসে বিদ্যমান। তবে তাঁদের জীবনাদর্শকে সমকালীন বাস্তবতায় কার্যকরভাবে উপস্থাপন ও প্রয়োগের জন্য নতুনভাবে বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে।
নারীর সামাজিক ভূমিকা শক্তিশালী করার করণীয়
১. ভূমিকার পুনর্মূল্যায়ন: লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক ভূমিকা ও মানবিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ পার্থক্য নির্ধারণ করা জরুরি। একজন নারী একই সঙ্গে আদর্শ মা এবং সমাজসচেতন কর্মী হতে পারেন—একটি ভূমিকার জন্য অন্যটি বিসর্জন দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
২. জ্ঞানভিত্তিক সক্ষমতা বৃদ্ধি: টেকসই সামাজিক ভূমিকা পালনের জন্য ধর্মীয় জ্ঞান ও সমসাময়িক বাস্তবতা—উভয় বিষয়ে গভীর উপলব্ধি অপরিহার্য। সচেতন নারী সেই, যিনি যেমন ইসলামের মৌলিক শিক্ষা সম্পর্কে অবগত, তেমনি যুগের ভাষা ও বাস্তবতাও বোঝেন।
৩. নারীদের পারস্পরিক সহযোগিতার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা: প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সহযোগিতা ও সংহতির মাধ্যমে ইতিবাচক সাংস্কৃতিক উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়া।
৪. নিজেদের গল্প নিজেরাই বলা: নারীদের উচিত নিজেদের অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম ও সাফল্যের বয়ান নিজেরাই তুলে ধরা। নারীর প্রতিরোধ ও অবদানের এই বয়ান নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক কর্ম।
আজকের মুসলিম নারী একদিকে এমন আধুনিকতার চাপে রয়েছেন, যা তাকে ভোগবাদী সংস্কৃতির উপকরণে পরিণত করতে চায়; অন্যদিকে ধর্মের নামে প্রচলিত কিছু বিকৃত সামাজিক রীতিও তাকে সমাজের প্রান্তে ঠেলে দেয়। এই দ্বৈত সংকট থেকে উত্তরণের পথ হলো সচেতন, জ্ঞাননির্ভর এবং মূল্যবোধভিত্তিক সামাজিক অংশগ্রহণ।
এই দৃষ্টিভঙ্গিতে নারী কোনো অসহায় ভুক্তভোগী নন, আবার কল্পিত নায়িকাও নন; বরং তিনি সমাজ পরিবর্তনের একজন কার্যকর শক্তি। নিজের ধর্মীয় পরিচয় ও আদর্শ অক্ষুণ্ণ রেখে তিনি একটি দৃঢ়, ন্যায়ভিত্তিক ও গতিশীল সমাজ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন।
— মারিয়াম ফালাহি
আপনার কমেন্ট