হাওজা নিউজ এজেন্সি: তিনি বলেন, “ইবাদতকারীরা তিন শ্রেণির। কেউ কেউ দাসের মতো ইবাদত করে; তাদের ইবাদতের ভিত্তি হলো ভয়। কেউ কেউ ব্যবসায়ীর মতো ইবাদত করে; তারা ইবাদতকে এক ধরনের লেনদেন হিসেবে দেখে এবং জান্নাত লাভের প্রত্যাশা করে।
আবার কেউ কেউ কৃতজ্ঞচিত্ত ও স্বাধীনভাবে ইবাদত করে। তারা ভয় ও প্রত্যাশার গণ্ডি অতিক্রম করে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের আকাঙ্ক্ষায় তাঁর ইবাদত করে।
দোয়ার ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। কেউ দোয়া করে আল্লাহর কাছে শাস্তি থেকে মুক্তি চায়। কেউ দোয়া করে জান্নাত লাভের জন্য। আবার কেউ দোয়া করে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য।
মহান আলী (আ.) মানুষকে উপদেশ দেওয়ার সময় কখনো ইবাদতনির্ভর ভাষায়, কখনো দুনিয়াবিমুখতার ভাষায়, আবার কখনো আরিফসুলভ ভাষায় কথা বলতেন।
কখনো তিনি বলতেন, ‘তোমরা যদি অমুক কাজ করো, তাহলে অমুক শাস্তির সম্মুখীন হবে।’ আবার কখনো বলতেন, ‘তোমরা যদি অমুক নেক কাজ করো কিংবা অমুক মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকো, তাহলে জান্নাতে তোমাদের জন্য অংশ রয়েছে।’
আবার কখনো তিনি আরিফসুলভ ভাষায় বলতেন,
‘গুনাহ একটি বিষ। তোমাদের অন্তর্দৃষ্টি যদি উন্মোচিত হতো, তাহলে দেখতে পেতে—হারাম সম্পদের দিকে হাত বাড়ানো কিংবা মানুষের সামাজিক মর্যাদা নষ্ট করা মানে বিষ নিয়ে খেলা।’
তিনি এই ধরনের কথা সবার সামনে বা সবার সঙ্গে বলতেন না; বরং বিশেষ ব্যক্তিদের সঙ্গে এভাবে কথা বলতেন।
আকিলের ঘটনা-সংক্রান্ত একটি খুতবায় এই দুই ধরনের উপদেশ পাশাপাশি এসেছে। তাঁর ভাই আকিল আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)-এর কাছে ঋণ চেয়েছিলেন। হযরত আলী (আ.) বললেন, ‘মাসের শুরুতে যখন আমি বাইতুলমাল থেকে আমার বেতন গ্রহণ করব, তখন তোমাকে এই ঋণ দিতে পারি। কিন্তু তুমি যদি এখন বাইতুলমাল থেকে এমন অর্থ নিতে চাও, যা অন্যরা পায় না, তাহলে তা আল্লাহর আজাবের কারণ হবে।’
এরপর তিনি একটি উত্তপ্ত লোহার বস্তু আকিলের শরীরের কাছে নিয়ে গেলেন, যাতে আকিল তার উত্তাপ অনুভব করতে পারেন।
এর পরপরই একই প্রসঙ্গে আশআস ইবনে কায়েসের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। আশআসের বিরুদ্ধে একটি মামলা চলছিল এবং পরদিন তাঁর বিচার হওয়ার কথা ছিল। তিনি রাতে আমিরুল মুমিনিনের কাছে একটি মিষ্টান্ন নিয়ে এলেন। হযরত আলী (আ.) যখন বুঝতে পারলেন যে, বিশেষভাবে প্যাকেটজাত করে সেই মিষ্টান্ন তাঁর কাছে আনা হয়েছে, তখন বললেন,
‘তুমি এই পঙ্কিল বস্তুটি কেন এনেছ? এই দুর্গন্ধময় জিনিসটি কেন নিয়ে এসেছ? মনে হচ্ছে, কোনো বিষধর সাপের মুখের লালা দিয়ে তোমরা এই মিষ্টান্ন তৈরি করেছ; অথবা এমন কোনো সাপের বমি দিয়ে তৈরি করেছ, যা দুবার বিষের পথ অতিক্রম করেছে!’
এ ধরনের উপদেশই হলো আরিফসুলভ উপদেশ। এখানে শুধু এ কথা বলা হচ্ছে না যে, অন্যায়ভাবে সম্পদ আত্মসাৎ করা, ঘুষ নেওয়া, প্রকাশ্য বা গোপন অবৈধ সুবিধা গ্রহণ করা এবং এ ধরনের কাজ হারাম ও জাহান্নামের কারণ। বরং বলা হচ্ছে—‘এই পঙ্কিল বস্তুতে হাত দিয়ো না।’
আমাদের সামনে মূলত তিন-চারটি পথ উন্মুক্ত করা হয়। আমাদের ফকিহ হতে বলা হয়—যাতে আমরা শরিয়তের বিধানগুলো বুঝতে পারি। আমাদের আবেদ হতে বলা হয়, জাহিদ হতে বলা হয়। আর এর চেয়েও উচ্চতর স্তরে আমাদের আরিফ হওয়ার দিকে আহ্বান জানানো হয়।
অর্থাৎ, আমাদের এমন অন্তর্দৃষ্টি অর্জন করতে হবে, যার মাধ্যমে আমরা অদৃশ্য জগতের বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারি; এমন শ্রবণশক্তি অর্জন করতে হবে, যার মাধ্যমে ফেরেশতাদের কথা শুনতে পারি; বস্তুর অন্তর্নিহিত সত্য দেখতে পারি এবং গুনাহর দুর্গন্ধ অনুভব করতে পারি।
মানুষের মধ্যে যখন এই অন্তর্দৃষ্টি ও অনুভূতিশক্তি জাগ্রত হয়, তখন সে যেমন ভালো জিনিসের সুবাস অনুভব করতে পারে, তেমনি মন্দ ও গুনাহর দুর্গন্ধও উপলব্ধি করতে পারে।”
আপনার কমেন্ট