হাওজা নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলাকারীরা শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর বেশ কিছু নৃশংস ঘটনা ঘটায়। এর মধ্যে পাওয়ে হাসপাতালের ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যেখানে ২৫ জন আহত বিপ্লবী গার্ড সদস্যকে হাসপাতালের শয্যা ও ছাদে হত্যা করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
এই আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রায় ২০০ জন স্থানীয় বিপ্লবী গার্ড (সেপাহ), ৬০ জন অস্থানীয় সদস্য এবং কয়েকজন জেন্ডারমেরি সদস্য প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। কিন্তু সংঘর্ষ তীব্রতর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং পাওয়ে পতনের আশঙ্কা দেখা দেয়।
এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে তৎকালীন সর্বাধিনায়ক ইমাম রুহুল্লাহ খোমেনি (রহ.) একটি ঐতিহাসিক নির্দেশ জারি করেন। তিনি সেনাবাহিনীর প্রধানকে অবিলম্বে পূর্ণ সামরিক সক্ষমতা নিয়ে পাওয়ের দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন এবং সরকারকে বিপ্লবী গার্ড সদস্যদের দ্রুত সেখানে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে বলেন।
এই নির্দেশের পর শহীদ ড. মোস্তফা চামরান, তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী, এবং স্থলবাহিনীর কমান্ডার জেনারেল ওয়ালিউল্লাহ ফাল্লাহির নেতৃত্বে সেনাবাহিনী, সেপাহ ও স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর সদস্যরা হেলিকপ্টারযোগে এলাকায় পৌঁছান।
ইরানি বর্ণনা অনুযায়ী, ইমামের এই নির্দেশ যোদ্ধাদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। তারা নিজেদের আঘাত-যন্ত্রণা উপেক্ষা করে একের পর এক প্রতিপক্ষের অবস্থান দখলমুক্ত করতে সক্ষম হন। দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর চামরানের নেতৃত্বাধীন বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ শহর, সড়ক ও কৌশলগত অবস্থানগুলো পুনর্দখল করে। অবশেষে ১৭ আগস্ট ১৯৭৯ (২৬ মোরদাদ ১৩৫৮) পাওয়ের অবরোধ ভেঙে যায় এবং শহরটি পতনের হাত থেকে রক্ষা পায়।
পরবর্তীতে ইমাম খোমেনি (রহ.) কুর্দিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতাদের উদ্দেশে এক বার্তায় সংঘাত বন্ধ করার আহ্বান জানান এবং যারা অস্ত্র ত্যাগ করে ফিরে আসবে, তাদের ক্ষমা করার আশ্বাস দেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অবস্থানের ফলে বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো আশপাশের পাহাড়ি এলাকায় সরে যেতে বাধ্য হয় এবং সরকারি বাহিনী পাওয়ের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
পাওয়ে মুক্তির এই অভিযানে শহীদ মোস্তফা চামরান, শহীদ আলী সাইয়াদ শিরাজি, শহীদ হেম্মত, শহীদ আহমদ মোতাওয়াসেলিয়ান, শহীদ দাস্তওয়ারেহ, শহীদ খলিলি এবং স্থানীয় মুসলিম কুর্দি পেশমার্গাদের অবদান বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। প্রতিরোধযুদ্ধে বহু যোদ্ধা প্রাণ উৎসর্গ করেন এবং অস্থানীয় নয়জন প্রতিরক্ষকের সমাধি আজও পাওয়ের শহীদ স্মৃতিসৌধে সংরক্ষিত রয়েছে।
সীমিত অস্ত্র ও সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও পাওয়ের সাধারণ মানুষ অসাধারণ সাহসিকতার পরিচয় দেন। তারা ঘরবাড়ি, গলি ও আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করে নিজেদের শহর রক্ষায় সর্বাত্মক ভূমিকা পালন করেন। এই প্রতিরোধ পরবর্তীতে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের জন্যও আত্মত্যাগ ও দৃঢ়তার এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। প্রতিবেদনে শিয়া-সুন্নি ঐক্যকে এই বিজয়ের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাওয়ের অবরোধমুক্তি শুধু একটি সামরিক বিজয়ই নয়, বরং জাতীয় সংহতি এবং সংকটকালে নেতৃত্বের দৃঢ়তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। ইরানের সরকারি ক্যালেন্ডারে এ ঘটনাকে স্মরণ করে দিনটি ‘পাওয়ে জাতীয় দিবস’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পাওয়ে জেলা ৬৪০ জন শহীদ, ৮৭৫ জন আহত যোদ্ধা এবং ২৭ জন সাবেক যুদ্ধবন্দির আত্মত্যাগ ও অবদানের জন্য বিশেষভাবে স্মরণীয়। শহরের বিখ্যাত শহীদ স্মৃতিসৌধ পশ্চিম ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হিসেবে পরিচিত। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ীও কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চল সফরকালে সেখানে গিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন।
আপনার কমেন্ট