হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী মার্কিন জনগণ, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষার্থী ও গণমাধ্যমের উদ্দেশে ২৬ পৃষ্ঠার এই খোলা চিঠি প্রকাশ করেছে। চিঠিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের উত্তেজনা, সাম্প্রতিক যুদ্ধ, ইরানের প্রতিরোধ সক্ষমতা, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি এবং এই অঞ্চলে ইসরায়েলের ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।
আইআরজিসি বর্তমান ইরান-আমেরিকা সংঘাতকে শুধু একটি সামরিক সংঘর্ষ হিসেবে না দেখে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, আদর্শিক ও ঐতিহাসিক মতপার্থক্যের ধারাবাহিকতা হিসেবে উল্লেখ করেছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ইরান কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ মোকাবিলা করে আসছে। তবে ইরানি জনগণ তাদের সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা রক্ষায় প্রতিরোধ অব্যাহত রেখেছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের লক্ষ্য ব্যর্থ
চিঠিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ইরান সরকারকে দুর্বল করা, দেশটিকে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত করা, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করা, দেশটির পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা এবং আঞ্চলিক প্রভাব কমানোর চেষ্টা করেছে। তবে চিঠির দাবি অনুযায়ী, এসব লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।
ইরানের পাল্টা হামলার উল্লেখ করে নথিতে বলা হয়েছে, অঞ্চলটির বিভিন্ন মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা ইরানি হামলার মুখোমুখি হয়েছে এবং যুদ্ধ চলাকালে ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।
ধর্মীয় বিশ্বাস, জাতীয় ঐক্য ও নেতৃত্ব
চিঠিতে ইরানের প্রতিরোধের ভিত্তি শুধু সামরিক শক্তি নয়; বরং ধর্মীয় বিশ্বাস, জাতীয় ঐক্য ও ধর্মীয় নেতৃত্বকেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আইআরজিসির মতে, পবিত্র কোরআনের শিক্ষা থেকে ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা, সমতা, মানবিক মর্যাদা এবং জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের মতো নীতিগুলো ইরানি সমাজের চিন্তাগত কাঠামো গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
নথিতে কারবালার ঘটনাকেও ইরানের প্রতিরোধের চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইমাম হুসাইন (আ.), হযরত আব্বাস (আ.) ও হযরত জয়নাব (সা.)-এর আত্মত্যাগকে দৃঢ়তা, আনুগত্য এবং জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
চিঠিতে ইরানের নেতৃত্বকেও প্রতিরোধব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, যুদ্ধ ও সংকটের সময় ইরানি জনগণের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে জাতীয় ঐক্য আরও শক্তিশালী হয়েছে।
মার্কিন সামরিক নীতির সমালোচনা
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর চিঠিতে গত কয়েক দশকের মার্কিন পররাষ্ট্র ও সামরিক নীতিরও সমালোচনা করা হয়েছে। ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের উল্লেখ করে আইআরজিসি বলেছে, ব্যাপক সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র এসব যুদ্ধে তার প্রত্যাশিত সব রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।
চিঠিতে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং তালেবানের পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসাকে মার্কিন নীতির ফলাফলের একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে ইরাকে সাদ্দাম হুসাইনের সরকার পতনের পর সৃষ্ট পরিস্থিতিকেও মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
‘আমেরিকা নিপাত যাক’ স্লোগানের ব্যাখ্যা
ইরানে ব্যবহৃত ‘মার্গ বার আমেরিকা’ বা ‘ডেথ টু আমেরিকা’ স্লোগানের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে চিঠিতে বলা হয়েছে, এই স্লোগান আমেরিকার জনগণের বিরুদ্ধে নয়; বরং ইরানের দৃষ্টিতে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মার্কিন সরকারের নীতির বিরুদ্ধে।
আইআরজিসি বলেছে, ইরানি ও মার্কিন জনগণের মধ্যে মানবিক ও সামাজিক পর্যায়ে অনেক অভিন্নতা রয়েছে এবং ইরান মার্কিন জনগণের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক কামনা করে। তবে নিজেদের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে আপস করবে না।
১৯৫৩ থেকে বর্তমান পর্যন্ত উত্তেজনার ঐতিহাসিক পটভূমি
নথিতে ১৯৫৩ সালে ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের সরকারের বিরুদ্ধে সংঘটিত রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং এতে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর ভূমিকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। চিঠির ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনার পর শাহের শাসন শক্তিশালী হয়। অন্যদিকে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবকে ইরানের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার এবং বিদেশি প্রভাবের অবসানের প্রচেষ্টা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
চিঠিতে বিপ্লবের পর দুই দেশের কূটনৈতিক উত্তেজনা, তেহরানে মার্কিন দূতাবাস সংকট এবং ১৯৮০ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধকেও বর্তমান অবিশ্বাসের ঐতিহাসিক কারণগুলোর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
নথিতে ১৯৮৮ সালে ইরান এয়ারের ৬৫৫ নম্বর ফ্লাইটকে একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজের মাধ্যমে ভূপাতিত করার ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ঘটনায় বিমানে থাকা ২৯০ জনই নিহত হন।
নিষেধাজ্ঞা, জেনারেল কাসেম সোলাইমানি ও আঞ্চলিক প্রতিরোধ
চিঠিতে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞারও সমালোচনা করা হয়েছে। আইআরজিসির মতে, এসব নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য হলো ইরানের অর্থনীতিকে দুর্বল করে জনগণের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা। মার্কিন ও ইউরোপীয় গণমাধ্যমের বিরুদ্ধেও ইরানের বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে ভূমিকা রাখার অভিযোগ আনা হয়েছে।
নথিতে শহীদ জেনারেল কাসেম সোলাইমানির বিশেষভাবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ইরাক, সিরিয়া ও অঞ্চলের অন্যান্য স্থানে আইএসআইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ২০২০ সালে বাগদাদে মার্কিন হামলায় তাঁর নিহত হওয়ার ঘটনাকে চিঠিতে ইরানের জাতীয় সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
গাজা, ইসরায়েল ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি
চিঠিতে গাজার পরিস্থিতি এবং ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন সমর্থনেরও তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী গাজায় প্রাণহানি, অবকাঠামো ধ্বংস এবং ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত হওয়ার কথা উল্লেখ করে মার্কিন জনগণের প্রতি তাদের সরকারের নীতি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি প্রসঙ্গে চিঠিতে মার্কিন উদ্বেগ প্রত্যাখ্যান করে বলা হয়েছে, ইরান বরাবরই তার পারমাণবিক কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত বলে দাবি করে আসছে। আইআরজিসির মতে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানকে পারমাণবিক হুমকির সঙ্গে যুক্ত করা যুদ্ধের রাজনৈতিক যৌক্তিকতা তৈরির একটি প্রচেষ্টা।
যুদ্ধনীতি পুনর্বিবেচনার জন্য মার্কিন জনগণের প্রতি আহ্বান
চিঠির শেষাংশে মার্কিন জনগণের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, তারা যেন নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাব ও ভোটের মাধ্যমে বিদেশে যুদ্ধ, সামরিক হস্তক্ষেপ এবং অন্যান্য দেশের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপের বিষয়ে তাদের সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনে।
ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব। তবে এর জন্য মার্কিন সরকারকে চাপ, সামরিক হস্তক্ষেপ ও যুদ্ধের নীতি থেকে সরে আসতে হবে।
সামগ্রিকভাবে, চিঠিতে এই অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে যে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও চাপ প্রয়োগের নীতি প্রত্যাশিত ফল অর্জন করতে পারেনি এবং ধর্মীয় পরিচয়, জাতীয় ঐক্য, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতার মাধ্যমে ইরানি সমাজ প্রতিরোধ অব্যাহত রাখার সক্ষমতা রাখে। একই সঙ্গে মার্কিন জনগণের প্রতি যুদ্ধের পরিবর্তে শান্তি, পারস্পরিক সম্মান, অন্যান্য দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মার্কিন সম্পদ দেশের উন্নয়নে ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে।
আপনার কমেন্ট