হাওজা নিউজ এজেন্সি: পারিবারিক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন সাইয়্যেদ আলিরেজা তারাশিয়ন কৈশোরকালীন সন্তানদের আচরণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে এক প্রশ্নোত্তর পর্বে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা তুলে ধরেছেন।
কৈশোর: পরিবর্তনের এক সংবেদনশীল অধ্যায়
বিশেষজ্ঞ তারাশিয়নের ভাষায়, কৈশোরকে ‘ছাইয়ের নিচে চাপা আগুন’-এর সঙ্গে তুলনা করা যায়। এই সময়ে সন্তানের সহনশীলতা কমে যেতে পারে, আবেগের তীব্রতা বৃদ্ধি পায় এবং বিভিন্ন বিষয়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখানোর প্রবণতা দেখা দেয়।
এ সময়ে অনেক কিশোর-কিশোরীর মধ্যে রাগ, বিরক্তি বা একাকীত্বের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। তারা পরিবার থেকে কিছুটা দূরে সরে গিয়ে নিজের ঘরে বেশি সময় কাটাতে পারে কিংবা মোবাইল ফোন ও ভার্চুয়াল জগতে ডুবে থাকতে পারে। তবে এটিকে সব সময় নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা উচিত নয়; অনেক ক্ষেত্রেই এটি তাদের ব্যক্তিগত পরিসর ও আত্মপরিচয় খোঁজার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ।
ধৈর্য ও গঠনমূলক নমনীয়তা
বিশেষজ্ঞের মতে, কৈশোরের সন্তানের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে প্রথম ও প্রধান নীতি হলো ধৈর্য ও ‘গঠনমূলক নমনীয়তা’।
এর অর্থ সন্তানকে লাগামহীন স্বাধীনতা দেওয়া নয়; বরং তার মানসিক অবস্থা ও প্রয়োজন বিবেচনা করে সচেতনভাবে কিছু সুযোগ দেওয়া এবং তার অনুভূতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা।
অনেক সময় দেখা যায়, স্নেহপূর্ণ ও সম্মানজনক ভাষায় কোনো অনুরোধ জানালে সন্তান তা সহজে গ্রহণ করে। কিন্তু একই বিষয় আদেশের সুরে বলা হলে সে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। তাই অভিভাবকদের উচিত নির্দেশ দেওয়ার পরিবর্তে সহযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসা।
সন্তানের আগ্রহকে গুরুত্ব দিন
ধরা যাক, একটি কিশোর তার প্রিয় ফুটবল ম্যাচ দেখতে চায়। ঠিক সেই সময়ে পরিবারের কোনো প্রয়োজনে তাকে বাইরে যেতে বলা হলো।
যদি তাকে ম্যাচ শুরু হওয়ার মুহূর্তে জোর করে পাঠানো হয়, তাহলে সে বিরক্ত বা অনাগ্রহী হতে পারে। কিন্তু যদি তাকে বলা হয়, “তুমি আগে ম্যাচটি দেখে নাও, এরপর একটু সময় করে কাজটি করে দিও,” তাহলে তার আগ্রহের প্রতি সম্মান দেখানো হয় এবং সে অধিক ইতিবাচকভাবে সাড়া দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
এ ধরনের নমনীয়তা পারিবারিক উত্তেজনা কমাতে এবং সন্তানের সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তুলতে সহায়ক।
নির্দেশদাতা নয়, সহযাত্রী হোন
কৈশোরের সন্তানদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কর্তৃত্ববাদী মনোভাব প্রায়ই বিপরীত ফল বয়ে আনে। উপর থেকে নির্দেশ দেওয়ার পরিবর্তে তাদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ ও সম্মানজনক সম্পর্ক গড়ে তোলা বেশি কার্যকর।
সন্তানের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে আলোচনা করা তাকে মানসিকভাবে নিরাপদ অনুভব করতে সাহায্য করে। এতে পরিবার ও সন্তানের মধ্যে দূরত্ব কমে এবং বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
কখনও কখনও সন্তানকে অগ্রাধিকার দিন
বিশেষজ্ঞের মতে, সব ক্ষেত্রে সন্তানের ইচ্ছাই চূড়ান্ত হবে—এমন নয়। তবে কিছু পরিস্থিতিতে সচেতনভাবে তাকে অগ্রাধিকার দিলে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, বাবা যদি সংবাদ দেখতে চান এবং একই সময়ে সন্তান তার পছন্দের খেলা দেখতে চায়, তাহলে কখনও কখনও সন্তানের পছন্দকে প্রাধান্য দেওয়া যেতে পারে। এতে সে অনুভব করে যে তার মতামত ও আগ্রহকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে এ ক্ষেত্রে বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানানোও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন বাবা বলতে পারেন, “আমিও আজকের খবর দেখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি যেহেতু এই খেলাটি দেখতে আগ্রহী, তাই আমি তোমার ইচ্ছাকেই অগ্রাধিকার দিলাম।”
এ ধরনের আচরণ সন্তানের মধ্যে কৃতজ্ঞতা, সম্মান ও পারিবারিক বন্ধনের অনুভূতি জাগ্রত করে এবং ভবিষ্যতে সে অভিভাবকের কথাও আরও ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে শেখে।
কৈশোর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল অধ্যায়। এ সময়ে সন্তানদের আচরণে নানা পরিবর্তন দেখা দিলেও অভিভাবকদের ধৈর্য, সহমর্মিতা, সম্মানজনক আচরণ এবং বিচক্ষণ নমনীয়তা তাদের সঙ্গে সুস্থ ও আস্থাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
নিয়ন্ত্রণ ও কঠোরতার পরিবর্তে বোঝাপড়া, সংলাপ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাকে গুরুত্ব দিলে পরিবারে ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং সন্তানও আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল ও মানসিকভাবে সুস্থ মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠতে পারে।
আপনার কমেন্ট