বুধবার ১৯ আগস্ট ২০২৬ - ১০:৫৯
শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর ব্যক্তিত্ব, চিন্তা ও আদর্শ নিয়ে আলোচনা; কেন আজ ‘সাইয়্যেদে মুকাওয়ামা’র আদর্শ অনুসরণ করা জরুরি?

হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন আলী মিসবাহ ইয়াজদি বলেছেন, শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি শুধু সত্যকে বিশ্বাস করতেন না; বরং সেই সত্যকে নিজের জীবনাচরণ ও কর্মে বাস্তব রূপ দিয়েছিলেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর ব্যক্তিত্ব, চিন্তা ও আদর্শ নিয়ে একটি বিশেষায়িত আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন আলী মিসবাহ ইয়াজদি, মুজতবা মিসবাহ ইয়াজদি এবং ‘আমানায়ে রাসূল’ আন্তর্জাতিক কংগ্রেসের সচিবালয়ের সদস্যরা অংশ নেন।

কোমে অবস্থিত হাওযা ইলমিয়ার শিক্ষা সমিতিসমূহের অ্যাসোসিয়েশনের সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এ সভায় হিজবুল্লাহ লেবাননের শহীদ মহাসচিব সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর চিন্তাগত, জিহাদি ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করা হয়।

মুকাওয়ামা তথা প্রতিরোধের আদর্শকে জ্ঞানভিত্তিক তুলে ধরার উদ্যোগ
সভায় ‘আমানায়ে রাসূল’ আন্তর্জাতিক কংগ্রেসের বৈজ্ঞানিক পরিষদের পরিচালক হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মোহাম্মদতাকি রাব্বানি শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহকে নিয়ে কংগ্রেস আয়োজনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বক্তব্য দেন।

তিনি বলেন, এ সম্মেলন আয়োজনের সিদ্ধান্তের পর হিজবুল্লাহর কর্মকর্তাদের এবং প্রতিরোধ আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠানের সময়ও কংগ্রেসের সচিবালয়ের পক্ষ থেকে শায়খ নাঈম কাসেমের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়। তিনি চিঠিটি ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

জনাব রাব্বানি জানান, বর্তমানে শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর ব্যক্তিত্ব ও আদর্শকে কেন্দ্র করে প্রায় ১০ থেকে ১২টি গবেষণামূলক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে—সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর চিন্তায় ইসলামী সম্প্রীতির ধারণা, তাঁর আধ্যাত্মিক ও নৈতিক জীবনাচরণ, গণমাধ্যম ব্যবহারের কৌশল, জনমত গঠনের সক্ষমতা, নেতৃত্বের ধরন এবং প্রতিরোধের ভাষা ও সাহিত্য।

শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর ব্যক্তিত্ব, চিন্তা ও আদর্শ নিয়ে আলোচনা; কেন আজ ‘সাইয়্যেদে মুকাওয়ামা’র আদর্শ অনুসরণ করা জরুরি?

তিনি বলেন, শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন দিক নিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও নথি এখনো পর্যাপ্ত নয়। তাই তাঁর আচরণ, জীবনাচরণ ও নেতৃত্বের মডেলকে বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করে হাওযা ইলমিয়া ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে উপস্থাপনের জন্য আরও ব্যাপক গবেষণা প্রয়োজন।

হাসান নাসরুল্লাহর আদর্শকে বাস্তব জীবনে অনুসরণের প্রয়োজন
এরপর ‘আমানায়ে রাসূল’ আন্তর্জাতিক কংগ্রেসের সচিব হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন রেজা ইস্কান্দারি শহীদ নাসরুল্লাহর নৈতিক, আধ্যাত্মিক, শিক্ষামূলক ও রাজনৈতিক চিন্তার বিভিন্ন দিক নিয়ে গবেষণার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

তিনি বলেন, বর্তমান সমাজে বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ও হাওযার তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য সফল, বাস্তব ও অনুসরণযোগ্য আদর্শ অত্যন্ত প্রয়োজন। শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর সমন্বিত ব্যক্তিত্ব কর্মী গড়ে তোলা, তাওহিদভিত্তিক রাজনৈতিক চিন্তা, সংকট ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিরোধের নেতৃত্বের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ আদর্শ হতে পারে।

তিনি জানান, এ উদ্যোগের প্রতি জ্ঞানী ও গবেষক মহলে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে ৩০০টিরও বেশি গবেষণামূলক প্রবন্ধ কংগ্রেসের সচিবালয়ে জমা পড়েছে।

তিনি বলেন, বিশেষায়িত গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতায় এসব গবেষণা ও প্রবন্ধকে বিষয়ভিত্তিক ও ব্যবহারিক গ্রন্থে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে কংগ্রেসের গবেষণালব্ধ ফলাফলকে সুসংগঠিত জ্ঞানভিত্তিক সংকলন হিসেবে ইসলামী বিশ্বের গবেষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, ইমাম খোমেনি শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শহীদ নাসরুল্লাহর চিন্তার সঙ্গে আল্লামা মিসবাহ ইয়াজদির চিন্তাধারার জ্ঞানগত সম্পর্ক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এ প্রতিষ্ঠানের বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

‘বিলায়াতের আনুগত্য’ শুধু আনুষ্ঠানিক আনুগত্য নয়
আলোচনার মূল পর্বে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন আলী মিসবাহ ইয়াজদি তাঁর পিতা প্রয়াত আয়াতুল্লাহ মিসবাহ ইয়াজদির বক্তব্যের আলোকে শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহকে ‘বাস্তবায়িত ঈমানের’ এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, শহীদ নাসরুল্লাহর প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল—‘সত্যকে বিশ্বাস করা’ এবং ‘সেই সত্যকে নিজের আচরণ ও জীবনাচরণে বাস্তবায়ন করা’র মধ্যকার পার্থক্য তিনি দূর করেছিলেন।

তিনি আরও বলেন, প্রয়াত আল্লামা মিসবাহ ইয়াজদি বারবার উল্লেখ করতেন, শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ শুধু ধর্মীয় মূলনীতিগুলো সম্পর্কে জ্ঞান রাখতেন না; বরং তাঁর সিদ্ধান্ত, আচরণ এবং এমনকি দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট বিষয়েও এসব নীতির বাস্তব প্রতিফলন দেখা যেত।

শহীদ নাসরুল্লাহর বিলায়াত-মুখী জীবনদর্শন প্রসঙ্গে আলী মিসবাহ ইয়াজদি বলেন, আল্লামা মিসবাহর মতে, তাঁর আনুগত্য কেবল বাহ্যিক নির্দেশ পালন বা আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং তিনি সর্বদা ইসলামী নেতৃত্বের অভিপ্রায় ও প্রত্যাশা উপলব্ধি করার চেষ্টা করতেন।

তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি কোনো নির্দেশ না থাকলেও শহীদ নাসরুল্লাহ নিজের দূরদর্শিতা ও বিলায়াতের প্রতি গভীর উপলব্ধির মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত পথ অনুধাবন করে তা সর্বশক্তি দিয়ে বাস্তবায়নের চেষ্টা করতেন।

জনাব আলী মিসবাহ ইয়াজদি বলেন, এ কারণেই আল্লামা মিসবাহ ইয়াজদি বলতেন, “আমি নিশ্চিত যে সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ হযরত ওলি আসর (আ.)-এর বিশেষ সঙ্গীদের অন্তর্ভুক্ত।”

আয়াতুল্লাহ মিসবাহ ইয়াজদি ও শহীদ নাসরুল্লাহর চিন্তা ও আধ্যাত্মিক সম্পর্ক
এরপর হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মুজতবা মিসবাহ ইয়াজদি তাঁর পিতার লেবানন সফরের স্মৃতিচারণ করে আয়াতুল্লাহ মিসবাহ ইয়াজদি ও শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর মধ্যকার গভীর চিন্তাগত ও আধ্যাত্মিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, তাঁদের সম্পর্ক শুধু ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি ছিল একটি ‘আদর্শিক সম্পর্ক’। এই সম্পর্কের কেন্দ্রে ছিল নৈতিকতা, বিলায়াতে ফকিহ এবং ঐশী জ্ঞানের ভিত্তিতে প্রতিরোধ আন্দোলনের কর্মী ও নেতৃত্বকে গড়ে তোলা।

তিনি ১৩৯৬ ফারসি সনে আয়াতুল্লাহ মিসবাহ ইয়াজদির লেবানন সফরের একটি ঘটনা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ওই সফরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ ব্যক্তিগতভাবে তাঁর পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে তাঁর অবস্থানস্থলে আসেন।

ওই সাক্ষাতে ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ীর একটি বার্তা তাঁর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। ওই বার্তায় হিজবুল্লাহর সদস্যদের জন্য দোয়া, আধ্যাত্মিক সমর্থন এবং তাঁদের জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছিল।

জনাব মুজতবা মিসবাহ ইয়াজদি বলেন, এ ঘটনা দেখায়—কীভাবে বিলায়াতের ধারণা নেতৃত্ব, আলেম ও মুজাহিদদের মধ্যে একটি অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক তৈরি করে।

তিনি শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর জ্ঞানচর্চা ও অধ্যয়নপ্রবণতার কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, সাধারণভাবে তাঁকে শুধু একজন সামরিক কমান্ডার হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত অধ্যয়নশীল ও চিন্তাশীল ব্যক্তি।

তিনি নিয়মিতভাবে আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী, ইমাম খোমেনী (রহ.), শহীদ মুর্তজা মোতাহহারী এবং প্রয়াত আল্লামা মিসবাহ ইয়াজদির চিন্তাধারার ওপর লেখা বই ও বক্তব্য অধ্যয়ন করতেন। এমনকি এসব বিষয়ের কিছু অংশ তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ সহকর্মীদেরও শেখাতেন।

জনাব মুজতবা মিসবাহ ইয়াজদির মতে, এই নিয়মিত জ্ঞানচর্চাই শহীদ নাসরুল্লাহর চরিত্রে বিদ্যমান স্বচ্ছতা, দূরদর্শিতা ও অনন্য ইবাদতমুখী জীবনধারার অন্যতম ভিত্তি ছিল।

যৌথ গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশের প্রস্তাব
আলোচনার শেষ পর্বে শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অধিবেশনগুলোর পরিচালক ড. আবদিপুর আয়াতুল্লাহ মিসবাহ ইয়াজদির সন্তানদের প্রতি শহীদ নাসরুল্লাহর ব্যক্তিত্ব নিয়ে গবেষণামূলক আলোচনার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

তিনি ইমাম খোমেনি শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আল্লামা মিসবাহ ইয়াজদির দৃষ্টিতে শহীদ নাসরুল্লাহর ব্যক্তিত্ব ও চিন্তাধারা নিয়ে একটি স্বতন্ত্র গবেষণাগ্রন্থ প্রণয়নের আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, এসব আলোচনার গভীরতা ও বিষয়বস্তুর সমৃদ্ধি বিবেচনায় নিয়ে ইমাম খোমেনি শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং ‘আমানায়ে রাসূল’ কংগ্রেসের সচিবালয়ের যৌথ উদ্যোগে একটি গবেষণাপ্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে।

তাঁর মতে, এ ধরনের একটি গ্রন্থ প্রতিরোধ আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ এবং ইসলামী চিন্তাধারার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের মধ্যকার চিন্তাগত ও আধ্যাত্মিক সম্পর্ক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে গবেষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও গবেষণা দলিল ও তথ্যসূত্র হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।

শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর ব্যক্তিত্ব, চিন্তা ও আদর্শ নিয়ে আলোচনা; কেন আজ ‘সাইয়্যেদে মুকাওয়ামা’র আদর্শ অনুসরণ করা জরুরি?

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha