হাওজা নিউজ এজেন্সি: কুরআনের দৃষ্টিতে মুসলিম নারীর আদর্শের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে তিনি বলেন, কুরআনের দৃষ্টিতে মুসলিম নারীর আদর্শ গড়ে ওঠে ঈমানি ও ইবাদতমূলক পরিচয়ের ভিত্তিতে। সূরা নিসার ৩৪ নম্বর আয়াত এবং সূরা তাহরিমে হযরত মরিয়ম (সা.আ.) ও হযরত আসিয়া (সা.আ.)-এর যেসব আদর্শ তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলোতে এর উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, আজকের মুসলিম নারী একজন স্বাধীন ও স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তা, যিনি আল্লাহর সঙ্গে সচেতন সম্পর্ক এবং সামাজিক দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে নিজের পরিচয় নির্ধারণ করেন। এই আদর্শে মর্যাদা ও ব্যক্তিগত সীমারেখা রক্ষা—যার মধ্যে পোশাক, দৃষ্টি ও আচরণে শালীনতা অন্তর্ভুক্ত—এবং শিক্ষা, সংস্কৃতি, পরিবার ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যকর উপস্থিতির মধ্যে সক্রিয় ভারসাম্য বজায় থাকে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, মুসলিম নারীর আদর্শ কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি বা ভারসাম্যহীনতার শিকার হওয়া উচিত নয়। এই আদর্শের অর্থ যেমন নারীকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা বা তাঁকে একঘরে করে দেওয়া নয়, তেমনি ভোগবাদী ও লাগামহীন জীবনধারার ভিত্তিতে নারীর পরিচয় নির্ধারণ করাও নয়।
তিনি আরও বলেন, মুসলিম নারী পাশ্চাত্য বা আমদানিকৃত উদারপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ মডেলের অন্ধ অনুকরণ না করে ফিকহভিত্তিক প্রজ্ঞা, আত্মিক আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক দায়িত্বশীলতাকে নিজের কর্মের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেন। সমাজে তাঁর উপস্থিতি পুরুষের প্রতিদ্বন্দ্বী বা কোনো বস্তু হিসেবে নয়; বরং ইসলামী ও মানবিক সমাজব্যবস্থা বাস্তবায়নে একজন পরিপূরক ও দায়িত্বশীল অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, বর্তমান সমাজে পরিচয়সংকট ও সাংস্কৃতিক অস্থিরতার মুখে মুসলিম নারীর আদর্শকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা কোনো বিমূর্ত আলোচনা নয়; বরং মানবিক মর্যাদা রক্ষা এবং সমাজের উন্নয়নে নারীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিশ্চিত করার জন্য এটি একটি অপরিহার্য বিষয়।
মুসলিম নারীর পূর্ণাঙ্গ আদর্শের তিনটি ভিত্তি
মুসলিম নারীর পূর্ণাঙ্গ আদর্শের ভিত্তিগুলো তুলে ধরে ওই নারী আলেম বলেন, প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো ঈমানি পরিচয় ও স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তা। এই আদর্শে নারী অন্যের দৃষ্টির বিষয় বা আমদানিকৃত জীবনধারার অনুসারী নন; বরং তিনি একজন স্বতন্ত্র ও আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তিসত্তা, যিনি আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক এবং সচেতন ইবাদতের মাধ্যমে নিজের পরিচয় গড়ে তোলেন।
তিনি বলেন, দ্বিতীয় ভিত্তি হলো ব্যক্তিগত সীমারেখা রক্ষা ও কার্যকর সামাজিক উপস্থিতির মধ্যে ভারসাম্য। কাঙ্ক্ষিত মুসলিম নারী-আদর্শ যেমন সমাজ থেকে নেতিবাচক অর্থে বিচ্ছিন্নতার দিকে যাবে না, তেমনি মর্যাদা ও মানবিক সীমারেখা বিসর্জন দিয়ে ইসলামী মূল্যবোধের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো মডেলেও পরিণত হবে না।
তিনি সামাজিক ব্যবস্থায় নারীর ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, মুসলিম নারীকে পুরুষের প্রতিদ্বন্দ্বী কিংবা সমাজের প্রান্তিক কোনো উপাদান হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং সামাজিক ও সভ্যতাগত লক্ষ্য অর্জনে তিনি একজন পরিপূরক ও কার্যকর অংশীদার হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারেন।
কাশানের কাওসার মহিলা মাদ্রাসার সাংস্কৃতিক বিভাগের উপপরিচালক ইসলামী সভ্যতার গঠন ও ধারাবাহিকতায় নারীর ভূমিকা প্রসঙ্গে বলেন, নারীরা শুধু পরিবারে নৈতিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের ধারক নন; তাঁরা শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সামাজিক ক্ষেত্রের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবেও ইসলামী সভ্যতার ধারাবাহিকতা ও অগ্রগতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, নারীর কার্যকর ভূমিকা বাড়াতে হলে প্রান্তিক উপস্থিতি থেকে বুদ্ধিদীপ্ত ও কার্যকর সামাজিক ভূমিকার দিকে অগ্রসর হতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন বিশেষায়িত জ্ঞান বৃদ্ধি, বৈজ্ঞানিক ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন, সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনায় নারীদের অবস্থান শক্তিশালী করা এবং প্রয়োজনীয় সহায়ক অবকাঠামো গড়ে তোলা। এর ফলে নারীরা পারিবারিক ভিত্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে বিভিন্ন সামাজিক ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবেন এবং সভ্যতাগত লক্ষ্য অর্জনের পথে অগ্রণী শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, ইসলামী সভ্যতা আধ্যাত্মিকতা ও নৈতিক মূল্যবোধকে উন্নয়নের অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে নারী কেবল সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত একজন ব্যক্তি নন; বরং মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি এবং সভ্যতার ধারাবাহিকতা রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
পরিবার: নারীর সভ্যতাগত ভূমিকার প্রথম ক্ষেত্র
নারীর মাধ্যমে নৈতিকতা ও সংস্কৃতির বিকাশের বিষয়ে তিনি বলেন, পরিবার হলো সভ্যতার ক্ষুদ্রতম একক। এই কাঠামোয় নারী সন্তানের প্রথম শিক্ষক হিসেবে প্রজন্ম গঠন ও মূল্যবোধের উত্তরাধিকার পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, কোনো সভ্যতার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়লে সেই সভ্যতা নানা সংকটের মুখে পড়ে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলা এবং নৈতিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিম নারীর ভূমিকা মৌলিক ও সভ্যতানির্মাণকারী।
তিনি বলেন, মুসলিম নারী সমাজের বস্তুগত প্রয়োজন এবং নৈতিক ও আধ্যাত্মিক প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারেন। উৎপাদন, বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ এমন একটি বস্তুবাদী, প্রাণহীন ও নৈতিক ভিত্তিহীন উন্নয়নব্যবস্থা গড়ে ওঠা ঠেকাতে সহায়তা করতে পারে।
বিশ্বায়নের যুগে সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নারীরা নিজস্ব ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং ইসলামী মূল্যবোধ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। সাংস্কৃতিক অস্থিরতার মুখে সমাজ যেন তার পরিচয়ের শিকড় ও মৌলিক মূল্যবোধের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে, নারীরা সে ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন।
ওই হাওজা গবেষক নারীদের সচেতনতা ও বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন। তিনি বলেন, পর্যাপ্ত জ্ঞান ও দক্ষতা ছাড়া সামাজিকভাবে কার্যকর ভূমিকা পালন করা সম্ভব নয়। নারীদের মৌলিক বিজ্ঞান, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান, আধুনিক প্রযুক্তি এবং অন্যান্য বিশেষায়িত ক্ষেত্রে উচ্চতর জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে হবে, যাতে তাঁরা সমাজের বৈজ্ঞানিক ও সভ্যতাগত কাঠামোতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।
মহিলা মাদ্রাসার এই শিক্ষক ব্যবস্থাপনা ও নীতিনির্ধারণে নারীর সামাজিক ভূমিকা শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন। তিনি বলেন, প্রান্তিক উপস্থিতির মডেল থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় কার্যকর অংশগ্রহণের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংস্থার ব্যবস্থাপনায় নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা হলে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতে ভারসাম্যপূর্ণ ও পরিবারকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হবে।
পেশাগত দক্ষতা ও পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য জরুরি
তিনি বলেন, নারীদের সামনে থাকা গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো সামাজিক কর্মকাণ্ড ও পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবনের মধ্যে দ্বন্দ্ব যেন নারীর অগ্রগতির স্থায়ী বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। এ জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক অবকাঠামো গড়ে তোলা—যেমন শিক্ষা ও কল্যাণমূলক সহায়তা এবং পরিবারকেন্দ্রিক সহায়ক সেবার সম্প্রসারণ—নারীদের পারিবারিক ভিত্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সামাজিক ক্ষেত্রে সক্রিয় থাকার সুযোগ করে দিতে পারে।
তিনি নারীর ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমের বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ডিজিটাল যুগে ভার্চুয়াল জগৎ সংস্কৃতি সৃষ্টি ও প্রচারের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ, ডিজিটাল যুগে নরম শক্তির লড়াইয়ের ময়দানেই সভ্যতা নির্মিত কিংবা ধ্বংস হয়।
তিনি বলেন, নারীরা গণমাধ্যম-সচেতনতা বৃদ্ধি এবং যোগাযোগের আধুনিক সরঞ্জামগুলোতে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে মূল্যবান ও ইতিবাচক কনটেন্ট তৈরি করতে পারেন এবং ইসলামী সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত আদর্শ প্রচারে এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন।
সবশেষে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মুসলিম নারীর আদর্শকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা কোনো নিছক তাত্ত্বিক বা বিমূর্ত আলোচনা নয়। বরং নারীর মর্যাদা রক্ষা, পারিবারিক ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং সমাজের অগ্রগতি ও উৎকর্ষের পথে নারীদের কার্যকর অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করার জন্য এটি একটি সামাজিক প্রয়োজন।
আপনার কমেন্ট