হাওজা নিউজ এজেন্সি’র এক প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে ফাজেলে দেহকানি শিশুর ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব গঠনে মায়ের ভূমিকা ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, সন্তানের লালন-পালন ও চরিত্র গঠনের প্রকৃত নিয়ামক আল্লাহ। বাবা-মা এই প্রক্রিয়ার একটি অংশমাত্র। তাই প্রত্যেক বাবা-মায়ের উচিত নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা করা এবং যা তাদের সামর্থ্যের বাইরে, তা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া।
সন্তানের সুশিক্ষা শুরু হয় বাবা-মায়ের নিজেদের পরিবর্তন থেকে
এই শিক্ষা ও শিশুর লালন-পালন বিশেষজ্ঞ বলেন, সৎ ও যোগ্য সন্তান গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয় বাবা-মায়ের নিজেদের থেকেই। কেউ যদি সৎ ও আদর্শবান সন্তান চান, তাহলে বিয়ে এবং সন্তান গ্রহণের আগেই তাকে নিজের চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব গঠনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
তিনি বলেন, মানুষ আল্লাহপ্রদত্ত স্বভাবজাত পবিত্র প্রবৃত্তি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। মায়ের দায়িত্ব শিশুর ওপর ধর্মীয় ধারণা চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং ভালোবাসা ও সম্মানের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তার অন্তর্নিহিত পবিত্র প্রবৃত্তিকে জাগ্রত করা। এর ফলে শিশু এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে, যখন সে নিজেই নিজের কাজের বিচার ও সংশোধন করতে সক্ষম হবে।
শিশু ধর্ম সম্পর্কে ভাষা ও উপদেশের মাধ্যমে জানার আগেই মায়ের আচরণ ও জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় মূল্যবোধ দেখতে শেখে।
তিনি বলেন, সন্তানকে সঠিকভাবে গড়ে তোলা অনেকটা বীজ বপনের মতো। মায়ের আন্তরিক ভালোবাসা শিশুর হৃদয়কে প্রস্তুত করে, যাতে তার অন্তর্নিহিত সুস্থ ও পবিত্র প্রবৃত্তির বীজ বিকশিত হয়ে পরিণত হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আদর্শভিত্তিক শিক্ষা ও লালন-পালন শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠনের প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করতে পারে। আমাদের কাছে সর্বোত্তম আদর্শ হিসেবে আহলে বাইত (আ.) রয়েছেন। তবে শিশুদের বয়স, মানসিকতা ও জগতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আকর্ষণীয় উপায়ে তাদের সঙ্গে আহলে বাইতের জীবন ও আদর্শ পরিচয় করিয়ে দিতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে ধর্মীয় মূল্যবোধ গঠনের চ্যালেঞ্জ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে সন্তানকে ধর্মীয় মূল্যবোধে গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তিনি বলেন, গণমাধ্যম এখন আর শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি এক ধরনের শিক্ষকের ভূমিকাও পালন করছে। চলচ্চিত্র, কার্টুন, ভিডিও গেম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশুর চিন্তাভাবনা, মূল্যবোধ ও আচরণগত আদর্শ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, পরিবার যদি এ ক্ষেত্রে উদাসীন থাকে, তাহলে গণমাধ্যম কার্যত সন্তানের লালন-পালনের একটি অংশ বাবা-মায়ের কাছ থেকে নিজেদের হাতে তুলে নিতে পারে।
জনাব দেহকানি আরও বলেন, বিষয়টি শুধু গণমাধ্যমের বিষয়বস্তু নিয়ে নয়; বরং গণমাধ্যম শিশুর সামনে কোন ধরনের আদর্শ ও ব্যক্তিত্বকে অনুসরণীয় হিসেবে তুলে ধরছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, আমরা যদি ধর্মীয় আদর্শগুলোকে সঠিক ও আকর্ষণীয়ভাবে শিশুর সামনে উপস্থাপন করতে না পারি, তাহলে গণমাধ্যম সেই শূন্যস্থান পূরণ করবে। তাই শুধু শিশুর গণমাধ্যম ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করাই যথেষ্ট নয়; তার বিশ্লেষণ ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে, যাতে সে নিজেই গণমাধ্যমের বিভিন্ন বিষয় থেকে সঠিক ও ভুল আলাদা করতে পারে।
ঐতিহ্যবাহী ও আধুনিক পদ্ধতির মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য তৈরি করা যায়?
এ বিষয়ে তিনি আরও বলেন, বিষয়টি ‘ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি নাকি আধুনিক পদ্ধতি’—এমন কোনো দ্বন্দ্বের বিষয় নয়। কারণ ধর্মীয় শিক্ষার মৌলিক নীতিগুলো অপরিবর্তনীয় হলেও সময়ের সঙ্গে তা শেখানোর পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হয়।
তিনি বলেন, মানুষের স্বভাবজাত পবিত্রতা, ভালোবাসা, সম্মান ও মানবিক মর্যাদা—এসব চিরস্থায়ী নীতি। তবে আজকের শিশুর কাছে এসব মূল্যবোধ পৌঁছে দেওয়ার পদ্ধতি আগের প্রজন্মের মতো হুবহু হতে পারে না।
অন্যদিকে, নতুন কোনো পদ্ধতি দেখলেই তার ভিত্তি ও প্রভাব বিবেচনা না করে গ্রহণ করাও উচিত নয়। আমাদের এমন একটি শিক্ষা ও লালন-পালন পদ্ধতি প্রয়োজন, যা ইসলামী মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি আধুনিক বিশ্বের বাস্তবতা এবং শিশুর গণমাধ্যমনির্ভর জীবনযাপনকেও বুঝতে সক্ষম।
এই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য অভিভাবকদের প্রথমে গণমাধ্যম সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা এবং ইসলামী সন্তান প্রতিপালন বিষয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
অভিভাবকদের উদ্বিগ্ন না হয়ে দায়িত্বশীল হতে হবে
তিনি বলেন, অভিভাবকদের মানসিক প্রশান্তি বজায় থাকলেই সন্তান লালন-পালনে ভারসাম্য তৈরি করা সম্ভব। আমরা যদি সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে নিজেদের মানবিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করি, ঘরে গণমাধ্যম ব্যবহারের জন্য সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও সময়সীমা নির্ধারণ করি, সন্তানের সঙ্গে গভীর আবেগীয় সম্পর্ক গড়ে তুলি এবং ঘরে আহলে বাইত (আ.)-এর বাস্তব ও অনুসরণযোগ্য আদর্শ তুলে ধরি, তাহলে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই।
তিনি বলেন, আমাদের সামর্থ্যের বাইরে যা কিছু রয়েছে, তা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিতে হবে এবং বিশ্বাস রাখতে হবে—মহান আল্লাহই আমাদের সন্তানদের পবিত্র স্বভাবের প্রকৃত রক্ষক ও পথপ্রদর্শক।
আপনার কমেন্ট