মঙ্গলবার ২৫ আগস্ট ২০২৬ - ১১:১৫
শরিয়তের উদ্দেশ্য (মাকাসিদুশ শরিয়া) সম্পর্কে আয়াতুল্লাহ সুবহানির মতামত

মাকাসিদুশ শরিয়া’ বলতে যদি নিজের ইচ্ছামতো শরিয়তের বিধানের অন্তর্নিহিত কারণ বা মানদণ্ড নির্ধারণ করা বোঝানো হয়, তাহলে তা নিষিদ্ধ। এটি ‘তাখরিজে মানাত’ এবং হারাম। তবে কোরআনের আয়াত ও রেওয়ায়েত থেকে কোনো বিধানের কারণ ও মানদণ্ড জানা গেলে এবং একজন ফকিহ প্রচলিত বিচারবোধের আলোকে সেই কারণকে পূর্ণাঙ্গ কারণ হিসেবে অনুধাবন করতে পারলে, তিনি ওই বিধান অন্য ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে পারেন। তাই উসুলবিদদের মধ্যে এ বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে যে, শরিয়তে স্পষ্টভাবে বর্ণিত কারণ (ইল্লাতে মানসুসা) গ্রহণযোগ্য; কিন্তু অনুমানের ভিত্তিতে উদ্ভাবিত কারণ (ইল্লাতে মুস্তানবাতা) গ্রহণযোগ্য নয়।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: পবিত্র মাশহাদে দারুল ইলমের ১৪০৫ হিজরি সৌরবর্ষের গ্রীষ্মকালীন শিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষকদের অধিবেশনের ফাঁকে আয়াতুল্লাহ আল-উজমা সুবহানি ‘মাকাসিদুশ শরিয়া’ প্রসঙ্গে তাঁর মতামত তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যের বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

প্রথমে এ বিষয়ের ইতিহাস আলোচনা করা প্রয়োজন। অষ্টম হিজরি শতাব্দীতে সর্বপ্রথম শাতিবি এ বিষয়টি উত্থাপন করেন। তিনি এ বিষয়ে ‘আল-মুওয়াফাকাত’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যা পরবর্তীতে প্রকাশিত হয়। নতুন নতুন উদ্ভূত সমস্যার সমাধান দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করাই ছিল এ নীতি উত্থাপনের তাঁর উদ্দেশ্য। কারণ, আহলে সুন্নতের ফকিহদের কাছে প্রায় ৫০০টি ফিকহি হাদিস এবং আরও চার হাজারের বেশি মুরসাল ও সনদবিহীন হাদিস ছিল। নিশ্চিতভাবেই এসব উপকরণ কিয়ামত পর্যন্ত উদ্ভূত নতুন নতুন সমস্যার সমাধানের জন্য যথেষ্ট হতে পারে না।

শাতিবি বিষয়টি উত্থাপন করলেও তখন এর প্রতি তেমন কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। গ্রন্থটির রচয়িতা আবু ইসহাক শাতিবি ৭৯০ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন এবং তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে গ্রন্থটিও অনেকটা বিস্মৃত হয়ে যায়।

এখানে প্রথমেই একটি প্রশ্ন আসে—আশআরী মতবাদ অনুযায়ী আল্লাহর কাজ, সৃষ্টিগত ও শরিয়তগত উভয় ক্ষেত্রেই, কোনো কারণ বা উদ্দেশ্য দ্বারা পরিচালিত নয়। তাদের ধারণা, আল্লাহর কোনো কাজে যদি উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে তা ওই উদ্দেশ্যের প্রয়োজনীয়তার প্রতি ইঙ্গিত করে। বিষয়টি কতটা সঠিক, তা আলাদা আলোচনার বিষয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইমাম আবুল হাসান আশআরীর অনুসারী শাতিবি কীভাবে এমন একটি তত্ত্ব উত্থাপন করলেন? কারণ, ‘মাকাসিদুশ শরিয়া’ তো আশআরী মতবাদের এই মৌলিক নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। অবশ্য বলা যেতে পারে, এ বিষয়ে তিনি নিজস্ব ইজতিহাদ করেছেন এবং ওই মূলনীতি অনুসরণ করেননি।

এরপর বহু বছর কেটে যায়; আহলে সুন্নতের মধ্যে এ নীতির তেমন কোনো আলোচনা দেখা যায়নি। তবে শাতিবির প্রায় ৭০০ বছর পর ইবনে আশুর—যিনি ১৩৯৪ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন—এই ধারণাটিকে পুনরুজ্জীবিত করেন। ততদিনে এ বিষয়ে আলোচনার পরিবেশও কিছুটা তৈরি হয়েছিল। কারণ, সে সময় কেউ কেউ আশআরী মতবাদের কিছু বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করেছিলেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ইসলামের শরিয়ত প্রণয়নের উদ্দেশ্যপূর্ণতা।

ইবনে আশুর বিষয়টিকে তিনটি পর্যায়ে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, মানুষ তার জীবনে তিন ধরনের প্রয়োজনের মুখোমুখি হয়:

১. অপরিহার্য বিষয় (দারুরিয়াত)

২. প্রয়োজনীয় বিষয় (হাজিয়াত)

৩. পরিপূর্ণতামূলক বিষয় (কামালিয়াত)

‘দারুরিয়াত’ বলতে এমন বিষয়কে বোঝানো হয়, যার ওপর মানুষের জীবন ও অস্তিত্ব নির্ভরশীল। যেমন—ধর্ম, জীবন, বিবেক-বুদ্ধি, সম্মান ও সম্পদ।

এরপর তিনি বলেন, এসব বিষয়ের মধ্যে কোনো ক্ষেত্রে সংঘাত দেখা দিলে সবগুলোই অপরিহার্য হওয়া সত্ত্বেও এগুলো একই স্তরের নয়। যেমন, ধর্ম ও জীবনের মধ্যে সংঘাত হলে ধর্মকে জীবনের ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। জীবন ও বিবেক-বুদ্ধির মধ্যে সংঘাত হলে জীবনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এ কারণে মানুষের জীবন রক্ষার জন্য সাময়িকভাবে এমন কোনো ওষুধ বা উপাদান ব্যবহার করা হলে, যা সাময়িকভাবে বিবেক-বুদ্ধির স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে, তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে।

একইভাবে জীবন ও সম্মানের মধ্যে সংঘাত হলে জীবনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কোনো ব্যক্তিকে যদি কোনো হারাম কাজে বাধ্য করা হয় এবং তা না করলে তাকে হত্যা করা হবে—তাহলে জীবন রক্ষা করতে হবে।

আর জীবন ও সম্পদের মধ্যে সংঘাত হলে জীবন রক্ষা করা জরুরি এবং সম্পদ বিসর্জন দিতে হবে।

একই নীতি ‘হাজিয়াত’ এবং এরপর ‘কামালিয়াত’-এর ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হয়। এ ছাড়া ‘মাকাসিদুশ শরিয়া’র জন্য আরও কিছু ইজতিহাদি ভূমিকার কথাও তারা উল্লেখ করেন। আমরা আপাতত সেসব বিষয়ে আলোচনা করছি না।

এখন দেখা যাক, উসুলের মূলনীতির আলোকে ‘মাকাসিদুশ শরিয়া’ কতটা কার্যকর হতে পারে।

প্রথমে একটি সংক্ষিপ্ত বিষয় স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। ইমামিয়া ফিকহে ‘তাখরিজে মানাত’ নিষিদ্ধ। আমাদের সীমিত বুদ্ধি দিয়ে শরিয়তের বিধানগুলোর অন্তর্নিহিত কারণ নিজেরা নির্ধারণ করে তার ভিত্তিতে ফতোয়া দেওয়া যায় না।

এ কারণে রেওয়ায়েতে আবান ইবনে তাগলিবের প্রসিদ্ধ ঘটনাটি পাওয়া যায়। তিনি নারীর দিয়াতের বিধান শুনে বিস্মিত হয়েছিলেন। একটি আঙুল কেটে দিলে ১০ দিনার, দুটি আঙুলে ২০ দিনার, তিনটি আঙুলে ৩০ দিনার; কিন্তু চারটি আঙুল কেটে দিলে ২০ দিনার—এমন বিধান শুনে তিনি বিস্মিত হয়ে এর কারণ জানতে চেয়েছিলেন।

এরপর তিনি ইমামের কাছে গেলে ইমাম (আ.) সেই প্রসিদ্ধ বক্তব্যটি বলেন:

 إِنَّ السُّنَّةَ إِذَا قِیسَتْ مُحِقَ الدِّینُ

অর্থাৎ, ‘সুন্নাহকে যখন কিয়াসের মাধ্যমে বিচার করা হয়, তখন দ্বীন বিলীন হয়ে যায়।’ এখানে কিয়াস বলতে ‘তাখরিজে মানাত’ বোঝানো হয়েছে।

তবে শরিয়তের নিজস্ব বক্তব্যে যদি কোনো বিধানের কারণ ও মানদণ্ডকে পূর্ণাঙ্গ কারণ (ইল্লাতে তাম্মা) হিসেবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, তাহলে সেই বিধান একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্র থেকে অন্য ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যেতে পারে। তবে শর্ত হলো, সেটি অবশ্যই পূর্ণাঙ্গ কারণ হতে হবে, কেবল ‘হিকমত’ বা অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা নয়।

এ বিষয়টি চারটি উদাহরণের মাধ্যমে পরিষ্কার করা যায়।

প্রথম উদাহরণ: রেওয়ায়েতে এসেছে:

 البئر واسع لا یفسده شیء

অর্থাৎ, ‘কূপ প্রশস্ত; কোনো কিছুই তাকে অপবিত্র করে না।’

এরপর বলা হয়েছে:

 لأن له مادة

অর্থাৎ, ‘কারণ এর একটি উৎস রয়েছে।’

এখানে কূপের ক্ষেত্রে যে কারণটি উল্লেখ করা হয়েছে, তার ভিত্তিতে ঝরনার ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রয়োগ করা যায়। ঝরনার পানির পরিমাণ কম হলেও যদি তা একটি বৃহৎ পানির উৎসের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, তাহলে একই বিধান প্রযোজ্য হবে। এখানে ‘মাকাসিদুশ শরিয়া’ শব্দটি ব্যবহার করা যেতে পারে। অর্থাৎ, শরিয়ত পানির উৎসের সঙ্গে সংযুক্ত থাকাকে অপবিত্রতা প্রতিরোধের কারণ হিসেবে বিবেচনা করেছে।

দ্বিতীয় উদাহরণ: নামাজের সময় কোনো ব্যক্তির কাছে পানি নেই, কিন্তু নামাজের সময় শেষ হওয়ার পর সে পানি পেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ফকিহরা বলেন, তাকে নামাজের নির্ধারিত সময়ে তায়াম্মুমের মাধ্যমে নামাজ আদায় করতে হবে। পানি পাওয়ার অপেক্ষা করে পরে পানি দিয়ে কাজা নামাজ পড়া অগ্রাধিকারযোগ্য নয়। কারণ রেওয়ায়েতে এসেছে:

 لا صلاة إلا من خمس: الطهور

অর্থাৎ, পবিত্রতা ছাড়া নামাজ নেই—এমন নির্দেশনা রয়েছে।

তৃতীয় উদাহরণ: পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন:

 إِنَّمَا یُرِیدُ الشَّیْطَانُ لِیُوقِعَ بَیْنَکُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ

অর্থাৎ, ‘শয়তান তো চায় তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে।’

এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, সমাজে শত্রুতা, বিদ্বেষ ও সামাজিক শৃঙ্খলা বিনষ্ট করে—এমন যেকোনো কাজ হারাম হতে পারে; যদিও তা সরাসরি মদ বা জুয়ার ক্ষেত্রে উল্লেখিত না হয়।

চতুর্থ উদাহরণ: পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে:

 وَلَا یَسُبُّوا الَّذِینَ یَدْعُونَ...


এরপর বলা হয়েছে:

 فَیَسُبُّوا اللَّهَ عَدْوًا بِغَیْرِ عِلْمٍ

অর্থাৎ, ‘তারা যাদের উপাসনা করে, তাদের গালমন্দ করো না; তাহলে তারা অজ্ঞতাবশত সীমালঙ্ঘন করে আল্লাহকে গালমন্দ করবে।’

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইসলামের বাইরে অন্য ধর্মের পবিত্র বিষয়গুলোকে এমনভাবে অপমান করা জায়েজ নয়, যার ফলে তারা প্রতিক্রিয়ায় আমাদের পবিত্র বিষয়গুলোকে অপমান করতে পারে। অর্থাৎ, যুক্তি ও প্রজ্ঞার সঙ্গে কথা বলতে হবে।

এটি বিধান ইস্তিনবাতের একটি দিক। এ ছাড়া বলা যায়, তাযাহুম বা পরস্পর সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে ‘আকওয়া মালাকান’—অর্থাৎ, যে বিধানের অন্তর্নিহিত স্বার্থ বা কারণ অধিক শক্তিশালী, তার ভিত্তিতে আমল করা যায়। হাদিসের মাধ্যমে বিধানের অন্তর্নিহিত স্বার্থের শক্তি বোঝা যায় এবং অধিক শক্তিশালী বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এমনকি ‘তারাত্তুব’ ও অনুরূপ কিছু উসুলের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য।

আয়াতুল্লাহ সুবহানির উপসংহার
সুতরাং, ‘মাকাসিদুশ শরিয়া’ বলতে যদি নিজের ইচ্ছামতো শরিয়তের বিধানের অন্তর্নিহিত মানদণ্ড নির্ধারণ করা বোঝানো হয়, তাহলে তা নিষিদ্ধ। এটি ‘তাখরিজে মানাত’ এবং হারাম।

অন্যদিকে, কোরআনের আয়াত ও রেওয়ায়েত থেকেই যদি কোনো বিধানের কারণ ও মানদণ্ড জানা যায় এবং ফকিহ প্রচলিত বিচারবোধের আলোকে সেটিকে পূর্ণাঙ্গ কারণ হিসেবে অনুধাবন করতে পারেন, তাহলে তিনি সেই বিধান অন্য ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে পারবেন। তাই উসুলবিদদের মধ্যে ঐকমত্য হলো—স্পষ্টভাবে বর্ণিত কারণ (ইল্লাতে মানসুসা) গ্রহণযোগ্য, কিন্তু অনুমানের ভিত্তিতে উদ্ভাবিত কারণ (ইল্লাতে মুস্তানবাতা) গ্রহণযোগ্য নয়।

এখানে আরও একটি বিষয় স্মরণ রাখা প্রয়োজন—কোনো নীতির দৃঢ়তা এক বিষয়, আর সেই নীতির অপব্যবহার আরেক বিষয়। অজ্ঞ ব্যক্তিদের অপব্যবহারের কারণে কোনো সুপ্রতিষ্ঠিত নীতিকে দুর্বল মনে করা উচিত নয়। তবে কোনো নীতি অজ্ঞ ব্যক্তির হাতে পড়লে অবশ্যই তার খারাপ ফল হতে পারে।

এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা উল্লেখ করছি:
আমি মক্কায় ছিলাম। এক ব্যক্তি সৌদি আরবের বাইরে জবাই করা পশুর গোশত খাচ্ছিলেন। আমি তাকে বললাম, ‘আপনি কীভাবে এটি খাচ্ছেন? অথচ কোরআনে বলা হয়েছে:

 لَا تَأْکُلُوا مِمَّا لَمْ یُذْکَرِ اسْمُ اللَّهِ عَلَیْهِ

অর্থাৎ, ‘যার ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়নি, তা তোমরা খেয়ো না।’

তিনি জবাব দিলেন, ‘খাওয়ার সময় তো আমি বিসমিল্লাহ বলি!’

ওয়াসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha