মঙ্গলবার ২৫ আগস্ট ২০২৬ - ১৬:২১
পশ্চিমা সভ্যতায় বিশ্ব ক্লান্ত; ইসলামী প্রজাতন্ত্রের অর্জন নতুন ভাষায় তুলে ধরতে হবে

ইসলামের সভ্যতা নির্মাণের সক্ষমতার ওপর জোর দিয়ে বাংলাদেশে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দফতরের প্রতিনিধি হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন ড. সাইয়্যেদ মাহদী আলীজাদেহ মুসাভী বলেছেন, “আজকের বিশ্ব এমন এক সভ্যতায় ক্লান্ত, যেখান থেকে ট্রাম্পদের মতো ব্যক্তিরা উঠে আসেন। তাই ইসলামী প্রজাতন্ত্রের অর্জনগুলো নতুন ও আধুনিক ভাষায় বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে হবে।”

হাওজা নিউজ এজেন্সি:  হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন সাইয়্যেদ মাহদী আলীজাদেহ মুসাভী উর্মিয়ার ইমাম খোমেনি (রহ.) মুসাল্লায় অনুষ্ঠিত চতুর্থ ‘সভ্যতা নির্মাণকারী আলেম’ সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।

ইসলামের সভ্যতা নির্মাণের সক্ষমতা নিয়ে উত্থাপিত সংশয়ের জবাবে তিনি বলেন, একসময় চরম দুর্দশা ও অপমানের মধ্যে থাকা একটি সমাজ ইসলামের আবির্ভাবের মাধ্যমে এমন মর্যাদা অর্জন করেছিল, যা একটি সভ্যতা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। যদি কোনো সভ্য ও উন্নত সমাজে ইসলামের আবির্ভাব ঘটত, তাহলে এর মূল্য ও গুরুত্ব আজকের মতো প্রকাশ পেত না।

বর্তমানে প্রায় দুই বিলিয়ন মুসলমান কীভাবে কয়েক মিলিয়ন ইহুদিবাদীর মোকাবিলায় সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইসলাম ও মুসলমানদের দুর্বল করার জন্য শত্রুদের প্রচেষ্টা এবং পুঁজিবাদের বিস্তার মুসলিম বিশ্বকে প্রান্তিক করে দিয়েছে এবং আধিপত্যবাদীদের মুসলিম বিশ্বের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দিয়েছে।

পশ্চিমায়নের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা
মুসলিম বিশ্বের কয়েকটি দেশে পশ্চিমায়নের ব্যর্থ অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কেউ কেউ মনে করেছিলেন, ইসলামকে সরিয়ে দিলে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হবে। তুরস্কের মুস্তাফা কামাল আতাতুর্কের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আতাতুর্ক তুরস্কের আইনব্যবস্থাকে পশ্চিমা আদলে রূপান্তর করেছিলেন; কিন্তু এর মাধ্যমে দেশটি কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি।

শহীদ নেতার ইসলামী সভ্যতা সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে তিনি বলেন, আমাদের ইসলামের মূলনীতি ও বিধান ধারণ করতে হবে এবং একই সঙ্গে আধুনিক উপকরণও ব্যবহার করতে হবে। শহীদ নেতা ইসলামী সভ্যতার পাশাপাশি ‘নবীন’ বা আধুনিকতার কথাও উল্লেখ করতেন। অর্থাৎ, আমাদের সব আধুনিক উপকরণ কাজে লাগাতে হবে; তবে অন্ধভাবে আধুনিকায়ন ও উদারীকরণের পথে চলে যাওয়া যাবে না।

ইসলামী সভ্যতা গড়ে ওঠে ধাপে ধাপে
শহীদ নেতার চিন্তাধারায় সভ্যতা নির্মাণের পাঁচটি ধাপের কথা উল্লেখ করে হুজ্জাতুল ইসলাম আলীজাদেহ মুসাভী বলেন, ধর্মবিশ্বাস ও যুক্তিবাদ ইসলামী নবসভ্যতার অন্যতম মৌলিক ভিত্তি।

তিনি বলেন, সভ্যতা একদিনে গড়ে ওঠে না; এর একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া রয়েছে। শহীদ নেতা এই সভ্যতা নির্মাণকে পাঁচটি ধাপে ভাগ করেছেন এবং প্রতিটি ধাপের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তাই এক লাফে সভ্যতায় পৌঁছে যাওয়ার প্রত্যাশা করা উচিত নয়।

বিশ্ব নতুন একটি চিন্তা ও বক্তব্য গ্রহণের জন্য প্রস্তুত—উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আজ বিশ্ব এমন এক সভ্যতায় ক্লান্ত, যেখান থেকে ট্রাম্পদের মতো ব্যক্তিরা উঠে আসেন। বিশ্ব এখন জানতে চায়, আমাদের কী বলার আছে এবং আমরা কী ধরনের ভাষায় তাদের সঙ্গে কথা বলব।”

ইসলামী বিশ্বের নেতৃত্বে ইরানের সক্ষমতা
ইসলামী বিশ্বের নেতৃত্বে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সক্ষমতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আজ ইসলামী বিশ্বের অনেক চিন্তাবিদ মনে করেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্রেরই ইসলামী বিশ্বের নেতৃত্ব গ্রহণ করা উচিত। কারণ নানা সমস্যা থাকা সত্ত্বেও দেশটি নিজের মধ্যে ইসলামী ঐক্য ও সংহতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

তিনি বলেন, সৌদি আরবের মতো কিছু দেশ একসময় ইসলামের কথা বললেও বর্তমানে নিজেদের দেশে ধর্মবিরোধী আইন ও ক্যাবারে চালু করতে বাধ্য হয়েছে।

অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি নয়
অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তির বিষয়ে সতর্ক করে হুজ্জাতুল ইসলাম আলীজাদেহ মুসাভী বলেন, “শহীদ নেতার বিপুল চিন্তা ও মতাদর্শ আমাদের হাতে থাকা সত্ত্বেও আমরা সেগুলো বাস্তবায়ন করতে পারিনি। আমার আশঙ্কা হলো, ইমাম খোমেনি (রহ.)-এর ক্ষেত্রে আমরা যে অবিচার করেছি এবং তাঁর জ্ঞানভিত্তিক ও রাজনৈতিক চিন্তাধারা যথাযথভাবে তুলে ধরতে যে ব্যর্থতা দেখিয়েছি, শহীদ নেতার ক্ষেত্রেও যেন একই ভুল না করি।”

ইরানের প্রতিরোধের কারণ বিশ্বকে জানাতে হবে
ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতি বিশ্বের প্রধান প্রশ্নের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আজ বিশ্বের প্রশ্ন হলো—সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা ও সমস্যার মধ্যেও ইসলামী প্রজাতন্ত্র কীভাবে শত্রু ও পরাশক্তি-অপরাধীদের সামনে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে সক্ষম হয়েছে?”

তিনি বলেন, এই অর্জনগুলোকে সুসংবদ্ধ নীতি ও মতাদর্শে রূপান্তর করে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার জন্য গবেষণাকেন্দ্র ও থিংক ট্যাংক প্রয়োজন। তা না হলে ভবিষ্যতে ইরানের প্রতিরোধ সম্পর্কে একটি ভুল বয়ান তৈরি হতে পারে।

সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেন, শত্রুরা ইরান কীভাবে পরাশক্তি ও বড় ধরনের অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে, তার কারণগুলো চিহ্নিত করতে চায়, যাতে ভবিষ্যতে এই প্রতিরোধের পথ রুদ্ধ করা যায়। তাই অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী হিসেবে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের অর্জন ও সক্ষমতাগুলো ব্যাখ্যা করে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা আমাদের দায়িত্ব।
 

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha