হাওজা নিউজ এজেন্সি: মুসলিম নারীর ‘নারী-জাগরণ’ (بعثت زنانه) এবং ‘মুসলিম নারীর তৃতীয় আদর্শ’ (الگوی سوم زن مسلمان)-এর ধারণাকে নতুন করে পর্যালোচনা করা সাংস্কৃতিক ও সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে ঈমানদার নারীর এমন সক্ষমতা ও ভূমিকা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা ইসলামী ভ্রাতৃত্বকে সুদৃঢ় করা, পারস্পরিক সহমর্মিতা বৃদ্ধি এবং ইসলামী সমাজের ঐক্য ও স্থিতিশীলতা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
ইরানের নারী ও পরিবারবিষয়ক গবেষণার সঙ্গে যুক্ত একাডেমিক বোর্ডের সদস্য হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন মেহদী সাজ্জাদি আমিন এক বক্তব্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্যের অনূদিত ও সম্পাদিত অংশ তুলে ধরা হলো:
তালুতের বাহিনীর পরীক্ষা
প্রতিটি যুগের পরীক্ষা এক রকম নয়। আমাদের সময়ের পরীক্ষাগুলোর ধরনও ভিন্ন। তবে কুরআনে তালুতের বাহিনীর যে পরীক্ষার কথা বর্ণিত হয়েছে, তা থেকে আত্মসংযম ও ঈমানের দৃঢ়তার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়।
তালুত যখন তাঁর সৈন্যবাহিনী নিয়ে জালুতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হচ্ছিলেন, তখন তারা একটি নদীর কাছে পৌঁছায়। তালুত তাঁর বাহিনীকে বললেন, আল্লাহ তাদের এই নদীর মাধ্যমে পরীক্ষা করবেন। তিনি নির্দেশ দিলেন, কেউ যেন নদীর পানি পান না করে; তবে অল্প পরিমাণ পান করার অনুমতি ছিল।
কুরআনে এসেছে:
فَلَمّا فَصَلَ طالوتُ بِالْجُنودِ.
অর্থাৎ, অতঃপর তালুত যখন সৈন্যবাহিনী নিয়ে বের হলেন…
তিনি বললেন,
إِنَّ اللَّهَ مُبْتَلِیکُمْ بِنَهَرٍ فَمَنْ شَرِبَ مِنْهُ فَلَیْسَ مِنِّی.
নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের একটি নদীর মাধ্যমে পরীক্ষা করবেন। অতএব, যে ব্যক্তি এর পানি পান করবে, সে আমার দলভুক্ত নয়।
এরপর বলা হয়েছে:
وَمَنْ لَمْ یَطْعَمْهُ فَإِنَّهُ مِنِّی.
আর যে ব্যক্তি তা পান করবে না, সে অবশ্যই আমার দলভুক্ত।
এটি ছিল মূলত আত্মসংযমের পরীক্ষা। প্রচণ্ড তৃষ্ণা থাকা সত্ত্বেও তাদের নিজেদের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হতো এবং নেতৃত্বের নির্দেশ মেনে চলতে হতো। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই এই পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছিল। কুরআনে বলা হয়েছে:
فَشَرِبُوا مِنْهُ إِلَّا قَلِیلًا مِنْهُمْ.
তবে তাদের অল্প কয়েকজন ছাড়া সবাই তা থেকে পান করল।
অর্থাৎ, তালুতের বাহিনীর অধিকাংশ সদস্য এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। ফলে তারা পরবর্তী সংগ্রামে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা হারায়। শেষ পর্যন্ত অল্পসংখ্যক দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মানুষই তালুতের সঙ্গে থেকে যায়।
এই অল্পসংখ্যক মানুষই ছিল দৃঢ় ঈমানের অধিকারী। আল্লাহ বলেন,
کَمْ مِنْ فِئَةٍ قَلِیلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةً کَثِیرَةً بِإِذْنِ اللَّهِ.
কত অল্পসংখ্যক দল আল্লাহর অনুমতিক্রমে বহু সংখ্যক দলের ওপর বিজয়ী হয়েছে। [সূরা আল-বাকারা, ২:২৪৯]
অতএব, শত্রুর সংখ্যা বেশি দেখে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। বিজয়ের জন্য কেবল সংখ্যাধিক্য নয়; বরং ঈমান, আত্মসংযম, আনুগত্য এবং আল্লাহর ওপর দৃঢ় আস্থা গুরুত্বপূর্ণ।
ভয়ও একটি পরীক্ষা
ভয়ও মানুষের পরীক্ষার অন্যতম ক্ষেত্র। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন:
لَنَبْلُوَنَّکُمْ بِشَیْءٍ مِنَ الْخَوْفِ.
নিশ্চয়ই আমি তোমাদের কিছুটা ভয় দিয়ে পরীক্ষা করব। [সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৫]
মানুষ কখনো শত্রুর সামরিক শক্তি ও সরঞ্জাম দেখে ভয় পায়। কখনো আশঙ্কা করে—শত্রু হয়তো বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি করবে, অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে কিংবা পানি, বিদ্যুৎ ও দৈনন্দিন জীবনের অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ব্যাহত হতে পারে।
শয়তানও ভয় দেখিয়ে তার অনুসারীদের প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রণ করে। আল্লাহ বলেন:
إِنَّمَا ذَلِکُمُ الشَّیْطَانُ یُخَوِّفُ أَوْلِیَاءَهُ.
এ তো শয়তান, যে তার বন্ধুদের ভয় দেখায়।
[সূরা আলে ইমরান, ৩:১৭৫]
আজও শত্রুপক্ষ ভয়, উদ্বেগ, সন্দেহ ও সংশয় সৃষ্টি করে মানুষকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু আল্লাহ মুমিনদের শিক্ষা দেন—তারা যেন ভয় ও আতঙ্কের কাছে আত্মসমর্পণ না করে এবং সংখ্যায় কম হওয়ার কারণে নিজেদের দুর্বল মনে না করে।
নারী-জাগরণ ও ইসলামী ভ্রাতৃত্ব
এই কুরআনিক শিক্ষার আলোকে মুসলিম নারীর ভূমিকা নতুনভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একজন ঈমানদার নারী কেবল নিজের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের দায়িত্বই পালন করেন না; তিনি পারস্পরিক ভালোবাসা, সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও ভ্রাতৃত্বের সংস্কৃতি গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে ‘নারী-জাগরণ’ বলতে এমন এক ঈমানি ও সামাজিক জাগরণকে বোঝানো যায়, যার মাধ্যমে মুসলিম নারী নিজের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সক্ষমতাকে বিকশিত করে পরিবার ও বৃহত্তর সমাজের কল্যাণে কাজে লাগান।
তালুতের বাহিনীর পরীক্ষার ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—সত্যের পথে অটল থাকার জন্য আত্মসংযম, ভয়কে জয় করা এবং আল্লাহর ওপর আস্থা অপরিহার্য। একইভাবে, ইসলামী ভ্রাতৃত্বকে সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রেও নারীর ঈমান, প্রজ্ঞা, ধৈর্য, সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হতে পারে।
সুতরাং মুসলিম নারীর আদর্শ কেবল সংখ্যায় বড় হওয়া বা বাহ্যিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং ঈমানের দৃঢ়তা, আত্মসংযম, পারস্পরিক সহমর্মিতা এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার মধ্যেই তার প্রকৃত শক্তি নিহিত।
আপনার কমেন্ট