বুধবার ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - ১৬:০৯
সন্তান অশালীন ছবি দেখছে—অভিভাবকের করণীয় কী?

কিশোর সন্তান অশালীন ছবি বা অনুপযুক্ত কনটেন্ট দেখে ফেললে অভিভাবকদের প্রথমেই শান্ত ও বিচক্ষণভাবে পরিস্থিতি সামলাতে হবে। সন্তানের ভুলের বিষয়ে তাকে সচেতন করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নজরদারি বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে সন্তানের মানসিক ও চিন্তাগত বিকাশের জন্য উপকারী বই, শিক্ষামূলক উপকরণ ও সাংস্কৃতিক বিষয়বস্তুর প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: পরিবারবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শক হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল-মুসলিমিন সাইয়্যেদ আলীরেজা তারাশিয়ুন ‘সন্তানদের অনৈতিক কনটেন্টে প্রবেশাধিকার কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়’—এ বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন।

প্রশ্ন: আমার ১৪ বছর বয়সী ছেলে তার বাবার মোবাইল ফোনে অশালীন ছবি দেখেছে। তার নিজেরও একটি সাধারণ মোবাইল ফোন রয়েছে। এ পরিস্থিতি কীভাবে সামলানো উচিত?

উত্তর: এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রথমে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখতে হবে। কখনো সন্তান বুঝতে পারে যে বাবা-মা বিষয়টি জেনে গেছেন, আবার কখনো সে বুঝতে পারে না যে তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। উভয় ক্ষেত্রেই বিচক্ষণ ও সঠিক পদ্ধতিতে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।

যদি সন্তান বুঝতে পারে যে বাবা-মা বিষয়টি জেনে গেছেন, তাহলে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রথমত, বাবা-মাকে আন্তরিকভাবে নিজেদের দুঃখ ও অসন্তোষ প্রকাশ করতে হবে। এমনকি মা বিষয়টি জানতে পারলেও তিনি সন্তানের সঙ্গে দুঃখ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলতে পারেন, “তুমি এমন কাজ করলে কেন? তুমি কি জানো, এটা কতটা ভুল এবং এতে আমি কতটা কষ্ট পেয়েছি? তোমার এই আচরণ নিয়ে সত্যিই আমি খুব চিন্তিত।”

এর মাধ্যমে সন্তানের মধ্যে নিজের কাজের ভুল ও অনৈতিকতা সম্পর্কে উপলব্ধি তৈরি করা প্রয়োজন। তার মনে যেন এমন ভাবনা আসে—“আমি কী ভুলটাই না করেছি! ইশ, যদি কাজটি না করতাম! মা এতটা কষ্ট পেয়েছেন, নিশ্চয়ই কাজটি খুবই খারাপ হয়েছে।”

দ্বিতীয় পদক্ষেপ হলো একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা। এ জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে, তবে তা যেন অতি কঠোর বা অস্বাভাবিক না হয়। যেমন, বাবা-মাকে নিজেদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের বিষয়ে আরও সতর্ক হতে হবে। সন্তান যেন একান্তে বা নির্জনে মোবাইল ব্যবহারের সুযোগ না পায়। বরং মোবাইল ব্যবহারের পরিবেশ এমন হওয়া উচিত, যাতে তা পরিবারের অন্য সদস্যদের দৃষ্টিসীমার মধ্যে থাকে। এতে অনুপযুক্ত কনটেন্ট দেখার সুযোগ কমে যাবে।

অন্যদিকে, এমনও হতে পারে যে বাবা-মা বিষয়টি জানেন, কিন্তু সন্তান জানে না যে তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত।

এ অবস্থায় সন্তানকে সরাসরি অভিযুক্ত না করে পরোক্ষভাবে সতর্ক করা যেতে পারে। যেমন বলা যায়, “বাবার মোবাইল ফোনটি যেন কখনো নিয়ে এমন কিছু দেখে না ফেলো, যা তোমার দেখা উচিত নয়; কিংবা এমন কোনো লেখা পড়ো না, যা তোমার জন্য উপযুক্ত নয়।”

এ ধরনের সতর্কতায় সন্তানের মনে সন্দেহ তৈরি হতে পারে—হয়তো বাবা-মা বিষয়টি জানতে পেরেছেন। কিন্তু যেহেতু তারা সরাসরি কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাননি, তাই তার মধ্যে সতর্কতা তৈরি হবে, যা তাকে ভবিষ্যতে একই কাজ থেকে বিরত রাখতে পারে।

এ ক্ষেত্রেও আগের মতোই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। সন্তান যেন একা মোবাইল ফোন নিয়ে থাকার সুযোগ না পায় এবং একই ধরনের ঘটনা যাতে আবার না ঘটে, সে জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

অনেক সময় বাবা-মা প্রশ্ন করেন, সন্তানকে যদি বলা হয় বাবার ফোনে হাত দেওয়া যাবে না কিংবা অনুপযুক্ত কনটেন্টে প্রবেশ করা যাবে না, তাহলে সে হয়তো বিষয়টিকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে। সে ভাবতে পারে, “আমার তো ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার আছে; আপনারা আমার ফোন দেখতে পারবেন না।”

এ প্রসঙ্গে বলা যায়, পরিবারের পরিবেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গোপনীয়তা তৈরি করা ঠিক নয়। সন্তানকে সতর্ক করার সময় এমন ভাষা ব্যবহার করতে হবে, যাতে তার মনে ভুল ধারণা তৈরি না হয় এবং বাবা-মায়ের দায়িত্বশীল নজরদারিও বজায় থাকে।

যখন বলা হয়, “এমন কিছু দেখে ফেলো না, যা তোমার দেখা উচিত নয়,” তখন মূল বার্তাটি হলো—অনুপযুক্ত কনটেন্ট থেকে দূরে থাকা। কারণ বাবা স্বাভাবিকভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার বা কোনো তথ্য খোঁজার সময়ও অনিচ্ছাকৃতভাবে অনুপযুক্ত কোনো কনটেন্টের সামনে পড়ে যেতে পারেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অনলাইন জগৎ পুরোপুরি নিরাপদ নয়; সেখানে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনুপযুক্ত কনটেন্টের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে, বাবা-মা যদি সচেতন ও দায়িত্বশীলভাবে স্মার্টফোন ব্যবহার করেন, তাহলে উপযুক্ত টুল ও সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিবারের জন্য অনলাইন পরিবেশকে আরও নিরাপদ করা সম্ভব। এর মাধ্যমে সন্তানদের অনুপযুক্ত কনটেন্টের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকিও কমানো যায়।

সন্তানের ‘চিন্তার খোরাক’-এর দিকেও নজর দিন
সবশেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার—বাবা-মাকে অবশ্যই সন্তানের ‘চিন্তার খোরাক’ বা মানসিক বিকাশের উপকরণের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সন্তানের জন্য ভালো ও শিক্ষামূলক বই নির্বাচন করা। ইমামগণের বর্ণিত শিক্ষার আলোকে বলা যায়, মানুষ যেমন নিজের খাবার ও হালাল উপার্জনের ব্যাপারে সতর্ক থাকে, তেমনি সন্তানের মন যে বিষয়বস্তু দিয়ে গড়ে উঠছে, সে বিষয়েও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

শিশু যে বই পড়ে, যে বিষয়বস্তু দেখে এবং যে তথ্য গ্রহণ করে, সেগুলো তার ব্যক্তিত্ব, চিন্তাধারা ও বিশ্বাস গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই বেড়ে ওঠার সময়ে সন্তানের জন্য উপযুক্ত জ্ঞান, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক উপকরণ নির্বাচন করা তার মানসিক ও নৈতিক সুস্থতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সূত্র: হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল-মুসলিমিন সাইয়্যেদ আলীরেজা তারাশিয়ুন, পরিবারবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শক।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha