হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, আয়াতুল্লাহিল উজমা সুবহানী নবী করিম (সা.)-এর জন্মের ১৫০০তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত সম্মেলনে প্রদত্ত বার্তার পূর্ণ বিবরণ নিম্নরূপ:
بسم الله الرحمن الرحیم
الحمد لله ربّ العالمین، والصلاة والسلام علی خاتم الأنبیاء وآله الطاهرین.
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
﴿إِنَّ الَّذِینَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَیَجْعَلُ لَهُمُ الرَّحْمَٰنُ وُدًّا﴾
(সূরা মারিয়াম, আয়াত ৯৬)
মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা ও আধ্যাত্মিক অবস্থান সম্পর্কে আলোচনা সহজ কাজ নয়; কেননা তাঁর মহত্ত্ব গুণাবলির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত এবং সব গুণ তাঁর প্রতি সমভাবে প্রযোজ্য। আমরা সাহস, জ্ঞান, ত্যাগ-যে কোনো গুণের কথা বলি না কেন, সব গুণই তাঁর পবিত্র সত্তায় পরিপূর্ণ এবং একটির ওপর অন্যটির শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তাই ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে আমার বার্তা অত্যন্ত সংক্ষিপ্তভাবে পেশ করছি।
যে পবিত্র আয়াতটি তিলাওয়াত করা হলো, তা একটি সৃষ্টিগত বিষয় সম্পর্কে জানায়-যে লোকেরা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, আল্লাহ তাদের প্রতি মানুষের অন্তরে ভালোবাসা ও স্নেহ সৃষ্টি করেন। মনে হয়, সমাজের সেবা এবং মানুষের অন্তরে ভালোবাসা সৃষ্টির মধ্যে এক ধরনের সরাসরি সম্পর্ক বিদ্যমান।
প্রাসঙ্গিকভাবে এই আয়াতটি সব নবী-রাসূলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সব জাতির মধ্যে নবীদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান রয়েছে; কারণ তাঁরা নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে সমাজের বৌদ্ধিক ও যুক্তিগত উৎকর্ষ সাধন করেছেন এবং মানুষকে পাথর-কাঠ ও অন্যান্য বস্তুর পূজা থেকে বিরত রেখে একত্ববাদ ও মানবিক পরিপূর্ণতার পথে পরিচালিত করেছেন।
এ কারণে পবিত্র কুরআন মুসলমানদের নবী করিম (সা.)-এর প্রতি কর্তব্য হিসেবে চারটি বিষয় উল্লেখ করেছে:
﴿وَالَّذِینَ آمَنُوا بِهِ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِی أُنزِلَ مَعَهُ أُولَٰئِکَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ﴾
(সূরা আ‘রাফ, আয়াত ১৫৭)
প্রথমত, «آمَنُوا بِهِ»—অর্থাৎ তাঁর প্রতি ও তাঁর শরিয়তে বিশ্বাস স্থাপন করা।
দ্বিতীয়ত, «وَعَزَّرُوهُ»—অর্থাৎ তাঁকে সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া।
তৃতীয়ত, «وَنَصَرُوهُ»—অর্থাৎ তাঁকে সাহায্য করা।
চতুর্থত, «وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِی أُنزِلَ مَعَهُ»—অর্থাৎ তাঁর সঙ্গে নাজিলকৃত আলো ও দ্বীনের অনুসরণ করা।
লক্ষ্য করলে দেখা যায়, «وَعَزَّرُوهُ» ও «نَصَرُوهُ» পাশাপাশি এসেছে এবং «عَزَّرُوهُ» নবী করিম (সা.)-এর মর্যাদা, সম্মান ও মহত্ত্ব প্রকাশের নির্দেশ দেয়।
কুরআনের কিছু আয়াত থেকে আরও জানা যায় যে, আল্লাহ নবী করিম (সা.)-কে যে নেয়ামত দান করেছেন তার মধ্যে একটি হলো তাঁর নাম ও স্মৃতিকে উচ্চকিত করা। যেমন তিনি বলেন:
﴿أَلَمْ نَشْرَحْ لَکَ صَدْرَکَ؛ وَوَضَعْنَا عَنکَ وِزْرَکَ؛ الَّذِی أَنقَضَ ظَهْرَکَ؛ وَرَفَعْنَا لَکَ ذِکْرَکَ﴾
(সূরা ইনশিরাহ, আয়াত ১-৪)
আমি কি তোমার বক্ষ প্রশস্ত করিনি? এবং তোমার থেকে ভারী বোঝা নামাইনি, যা তোমার পিঠ ভেঙে দিচ্ছিল? এবং তোমার স্মৃতিকে উচ্চকিত করেছি।
সুতরাং যে কোনো সম্মেলন, বক্তৃতা, কবিতা, নিবন্ধ বা সামাজিক কার্যক্রম যা নবী করিম (সা.)-এর নাম ও মর্যাদা বৃদ্ধির প্রতীক, তা «وَرَفَعْنَا لَکَ ذِکْرَکَ»-এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এই সম্মেলনও সেই পবিত্র আয়াতেরই একটি প্রয়োগ।
যেহেতু নবী করিম (সা.)-এর নাম প্রচারে সমাজে তাঁর প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ে, তাই প্রায় শতাব্দী পূর্বে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসলামী নবী (সা.)-এর নাম ও স্মৃতি বিস্তার সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছিলেন: ফামা দামাল কুরআনু ইউতলা, ওয়াল কা‘বাতু ইউতাফু, ওয়া মুহাম্মাদুন ইউযকারু ফিল মাআযিন, ওয়ান নাসরানিয়্যাতু ফী খাতারিন আযীম
অর্থাৎ: যতদিন কুরআন তিলাওয়াত হবে, কাবা তওয়াফ করা হবে এবং মিনার থেকে মুহাম্মাদ (সা.)-এর নাম উচ্চারিত হবে, ততদিন খ্রিস্টান ধর্ম মহাবিপন্ন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, কিছু ইসলামি ফিরকা এই ধরনের সম্মেলন আয়োজনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে!
আমাদের আরও একটি কথা রয়েছে-হজরত ঈসা (আ.)-এর শিষ্যরা তাঁর কাছে আকাশ থেকে খাদ্য (মায়েদা) নাজিলের আবেদন করেছিলেন। হজরত ঈসা (আ.) মুনাজাত করে বলেছিলেন:
﴿اللَّهُمَّ رَبَّنَا أَنزِلْ عَلَیْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ تَکُونُ لَنَا عِیدًا لِّأَوَّلِنَا وَآخِرِنَا﴾
(সূরা মায়েদা, আয়াত ১১৪)
হে আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ! আমাদের ওপর আকাশ থেকে খাদ্য নাজিল কর, যা আমাদের প্রথম ও শেষের জন্য উৎসবস্বরূপ হয়।
প্রশ্ন হলো: সেই আকাশী খাদ্য তো শুধু অল্প সময়ের জন্য তাদের দৈহিক চাহিদা পূরণ করেছিল এবং ক্ষুধা নিবারণ করেছিল—সীমিত প্রভাববিশিষ্ট এমন নেয়ামতকে কী কারণে হজরত ঈসা (আ.) উৎসব ঘোষণা করলেন? তা হলে নবী করিম (সা.)-এর সম্পর্কে কী বলবেন?
মহানবী (সা.)-এর জন্ম ছিল সেই আলো, যা মানবজাতিকে আলোকিত করেছিল এবং তাঁর অস্তিত্বের নূর চিরকাল কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের পথপ্রদর্শক। آیا এটি কি শোভনীয় নয় যে, সবাই তাঁর জন্মদিনকে উৎসব হিসেবে পালন করবে, তাঁর শানে নাজিলকৃত আয়াত তিলাওয়াত করবে এবং তাঁর প্রশংসায় রচিত কবিতা পাঠ করবে? তবে শর্ত হলো, এসব অনুষ্ঠান যেন কোনো ধরনের অপবিত্রতা ও শরিয়ত ও তাঁর মর্যাদার পরিপন্থি বিষয় থেকে মুক্ত থাকে।
শেষে স্মরণ করাই যে, এই সম্মেলনের আয়োজকরা নবী করিম (সা.)-এর প্রতি যেকোনো সেবা করেছেন-তারা প্রশংসার যোগ্য; এমনকি যারা এই পথে কবিতা রচনা করেছেন, নিবন্ধ লিখেছেন বা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন, ইনশাআল্লাহ সবাই সওয়াবপ্রাপ্ত হবেন।
ওয়াসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু
জাফর সুবহানী
আপনার কমেন্ট