হাওজা নিউজ এজেন্সি: গুণী ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের কাফের আখ্যা দেওয়ার প্রবণতা শুধু বর্তমান সময়েই দেখা যাচ্ছে না; বরং এর শিকড় ইসলামের ইতিহাসের প্রাথমিক যুগের খারিজি মানসিকতার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়।
শহীদ অধ্যাপক মুর্তজা মুতাহহারি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘জাযাবে ও দাফে’য়ে আলী (আ.)’ বা ‘আলী (আ.)-এর আকর্ষণ ও বিকর্ষণ’-এ খারিজিদের মানসিকতা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ইসলামের ইতিহাসে বড় বড় আলেম, দার্শনিক ও জ্ঞানীদের তাকফিরের কারণ তুলে ধরেছেন।
তিনি বলেন, ধর্মীয় সংকীর্ণতা খারিজিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বর্তমানে মুসলিম সমাজেও কখনো কখনো এই মানসিকতার প্রকাশ দেখা যায়। খারিজিদের স্লোগান ও বাহ্যিক পরিচয় হয়তো বিলুপ্ত হয়েছে, কিন্তু তাদের চিন্তাধারার কিছু দিক বিভিন্ন মানুষের মধ্যে কমবেশি রয়ে গেছে।
মুতাহহারির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, খারিজিরা ইসলামী সংস্কৃতির গভীরতার সঙ্গে পরিচিত ছিল না। তারা ছিল অজ্ঞ ও সংকীর্ণমনা। আর এই সংকীর্ণতার কারণে তারা খুব সহজেই অন্য মুসলমানদের কাফের ও ফাসিক বলে আখ্যায়িত করত। একপর্যায়ে তারা ইসলাম ও মুসলমান হওয়ার মানদণ্ড নিজেদের বিশ্বাস ও মতাদর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। যারা তাদের আকিদা ও মতাদর্শ গ্রহণ করত না, তাদেরও তারা কাফের বলে গণ্য করত।
তবে খারিজিদের মধ্যে সাহস ও আত্মত্যাগের মানসিকতা ছিল। ফলে তারা প্রায়ই ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিত এবং নিজেদের দৃষ্টিতে তাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করত। এ কারণে তারা অনেক সময় নিজেদের জীবনও উৎসর্গ করত।
কিন্তু পরবর্তী যুগগুলোতে তাদের অজ্ঞতা, গোঁড়ামি, অতিরিক্ত ধর্মানুরাগ ও সংকীর্ণতা টিকে থাকলেও সাহস, আত্মত্যাগ ও সংগ্রামী চেতনা হারিয়ে যায়। মুতাহহারি এই শ্রেণির মানুষকে ‘সাহসহীন খারিজি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তারা ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নিজেদের বিপদ ডেকে আনতে চায়নি; বরং ‘কথার তরবারি’ দিয়ে জ্ঞানী ও গুণী ব্যক্তিদের আক্রমণ করতে শুরু করেছিল।
তিনি লিখেছেন, ইতিহাসে এমন গুণী ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া কঠিন, যিনি কোনো না কোনোভাবে এ ধরনের অপবাদের লক্ষ্য হননি। কাউকে বলা হয়েছে তিনি আল্লাহকে অস্বীকার করেন, কাউকে পরকাল অস্বীকারকারী বলা হয়েছে, কাউকে শারীরিক মেরাজ অস্বীকারের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে; আবার কাউকে সুফি কিংবা অন্য কোনো পরিচয়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
মুতাহহারি প্রশ্ন তোলেন—যদি এসব অজ্ঞ ও সংকীর্ণমনা মানুষের মতামতকে মানদণ্ড ধরা হয়, তাহলে ইতিহাসে কোনো প্রকৃত জ্ঞানী মুসলমানই মুসলমান হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন না।
তিনি বলেন, আলী (আ.)-এর মতো মহান ব্যক্তিকেও যখন তাকফিরের শিকার হতে হয়েছে, তখন অন্যদের ক্ষেত্রে এমন অভিযোগ আসা আর আশ্চর্যের কী!
ইবনে সিনা, নাসিরুদ্দিন তুসি, সদরুল মুতাআল্লিহিন শিরাজি (মুল্লা সাদরা), ফয়েজ কাশানি, সৈয়দ জামালুদ্দিন আসাদাবাদি এবং পরবর্তীকালে পাকিস্তানি কবি ও দার্শনিক মুহাম্মদ ইকবাল—এমন বহু গুণী ব্যক্তিকে বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের অভিযোগের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
ইবনে সিনার বক্তব্য
ইবনে সিনা এ প্রসঙ্গে বলেন,
‘আমার মতো ব্যক্তিকে কাফের বলা কোনো তুচ্ছ বিষয় নয়; আমার ঈমানের চেয়ে দৃঢ় ঈমান আর কারও নেই। এই পৃথিবীতে যদি আমার মতো একজনও কাফের হয়, তবে সমগ্র পৃথিবীতে আর কোনো মুসলমান নেই।’
নাসিরুদ্দিন তুসির জবাব
নাসিরুদ্দিন তুসিকে ‘নিযামুল উলামা’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তি কাফের আখ্যা দিলে তিনি জবাবে বলেন,
‘নিযাম যদি আমাকে কাফের বলে, তবে মিথ্যার প্রদীপ কখনো আলো দিতে পারে না। আমি তাকে মুসলমানই বলব; কারণ মিথ্যার জবাব মিথ্যা ছাড়া আর কী হতে পারে!’
সূত্র: শহীদ অধ্যাপক মুর্তজা মুতাহহারি, জাযাবে ও দাফে’য়ে আলী (আ.), পৃ. ১৩৯–১৪১।
আপনার কমেন্ট