শুক্রবার ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - ১৮:০৫
ইরানের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধও শত্রুদের পরাজয়ের দিকে নিয়ে যাবে

ইরানের রাজধানী তেহরানের জুমার নামাজের খতিব আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আহমদ খাতামি বলেছেন, জনগণ ও ইসলামী সরকারের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি এবং সত্যের পক্ষের শক্তিকে দুর্বল করার লক্ষ্যেই অর্থনৈতিক চাপ ও অবরোধ আরোপ করা হচ্ছে। তবে ইসলামের প্রাথমিক যুগের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, এ ধরনের নীতি শেষ পর্যন্ত শত্রুদের পরাজয়ের দিকে নিয়ে যায়।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: শুক্রবার তেহরানের জুমার নামাজের খুতবায় তিনি এসব কথা বলেন।

আয়াতুল্লাহ খাতামি বলেন, মানুষ যে কাজই করে, তার একটি বাহ্যিক রূপ এবং একটি অন্তর্নিহিত বাস্তবতা রয়েছে। কিয়ামতের দিন মানুষ তার কাজের অন্তর্নিহিত বাস্তবতাও দেখতে পাবে। সেদিন শুধু কাজের প্রতিদানই নয়, বরং মানুষের নিজের কাজও তার সামনে প্রকাশিত হবে। অর্থাৎ মানুষের পরকালীন পরিণতি তার নিজের কাজের মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়; মানুষ নিজেই নিজের জন্য জান্নাতের পথ তৈরি করে এবং নিজের কাজের মাধ্যমে জাহান্নামের পথও তৈরি করে।

অর্থনৈতিক চাপ নতুন কোনো বিষয় নয়

ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর যুগের অর্থনৈতিক চাপ ও অবরোধের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক চাপ কিংবা অবরোধ কোনো নতুন বিষয় নয়, যা ট্রাম্প তাঁর ভাষায় নতুন করে সামনে এনেছেন। ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই এ ধরনের চাপ প্রয়োগের নজির রয়েছে।

তিনি বলেন, পবিত্র কোরআনের সূরা আনফালের ৩৬ নম্বর আয়াতে তাদের কথা বলা হয়েছে, যারা আল্লাহর দ্বীন প্রতিহত করতে নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে। শেষ পর্যন্ত তারা নিজেদের এই ব্যয়ের জন্য অনুতপ্ত হবে; তাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে এবং তারা পরাজিত হবে। পরকালেও তাদের জন্য রয়েছে কঠিন পরিণতি।

আয়াতুল্লাহ খাতামি সূরা মুনাফিকুনের ৭ নম্বর আয়াতের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মুনাফিকরা বলত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে থাকা মুসলমানদের সহযোগিতা করো না, যাতে তারা তাঁর চারপাশ থেকে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

তিনি বলেন, কোরআন সব যুগের জন্য প্রাসঙ্গিক। তাঁর মতে, জনগণকে ইসলামী সরকারের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া এবং ইসলামী ব্যবস্থাকে দুর্বল করার যে লক্ষ্য মুনাফিকরা অনুসরণ করেছিল, বর্তমান মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধও একই লক্ষ্য অনুসরণ করছে। তবে ইসলামের প্রাথমিক যুগের শত্রুরা যেমন পরাজিত হয়েছিল, তারাও নিশ্চিতভাবে পরাজিত হবে।

অর্থনৈতিক জিহাদে গুরুত্ব দিতে হবে
আয়াতুল্লাহ খাতামি বলেন, নবী করিম (সা.) দুটি গুরুত্বপূর্ণ নীতির মাধ্যমে অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করেছিলেন এবং এই চাপ তাঁর ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। বর্তমান সময়েও আমাদের জন্য এই দুটি নীতি প্রয়োজন।

তিনি বলেন, এর প্রথমটি হলো সম্পদ দিয়ে জিহাদ। জিহাদ অর্থ প্রচেষ্টা—এমন প্রচেষ্টা, যার সঙ্গে কষ্ট ও ত্যাগও জড়িত। এই জিহাদ কখনও সামরিক ক্ষেত্রে হতে পারে, কখনও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ‘প্রতিরোধী অর্থনীতি’র মাধ্যমে এবং কখনও বাস্তবতা তুলে ধরার ক্ষেত্রে ‘জিহাদে তাবইন’ বা সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে হতে পারে।

তিনি বলেন, বর্তমান যুদ্ধ মূলত একটি সমন্বিত যুদ্ধ। এতে সামরিক যুদ্ধ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে অর্থনৈতিক, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক যুদ্ধ।

‘ট্রাম্প যুদ্ধের নিয়ম মানছেন না’
সামরিক যুদ্ধ প্রসঙ্গে খাতামি বলেন, বর্তমান সামরিক সংঘাত এখনো অন্যায় ও নৃশংসভাবে পরিচালিত হচ্ছে। যুদ্ধেরও নিজস্ব নিয়ম রয়েছে, কিন্তু তাঁর দাবি, ট্রাম্প এসব নিয়ম মেনে চলছেন না।

তিনি একটি স্কুলে নিহত ১৬৮ শিশুর প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, বিশ্বের সব আইনেই শিশুদের সুরক্ষিত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অথচ শত্রুরা মানুষের আনন্দের অনুষ্ঠানকে শোকে পরিণত করছে। এ কারণে সবার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে যে এই যুদ্ধ অন্যায় ও নৃশংস।

তবে তিনি বলেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এই অন্যায় যুদ্ধের জবাব অত্যন্ত দৃঢ় ও সাহসিকতার সঙ্গে দিচ্ছে।

তেহরানের জুমার খতিব বলেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। শত্রু একটি হামলা চালালে তার জবাবে একাধিক পাল্টা আঘাত করা হচ্ছে। এ কারণে তিনি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি গর্ব প্রকাশ করেন।

সামরিক যুদ্ধের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও গণমাধ্যম যুদ্ধ
আয়াতুল্লাহ খাতামি বলেন, সামরিক যুদ্ধের পাশাপাশি অর্থনৈতিক যুদ্ধও চলছে। তাঁর মতে, ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর থেকেই শত্রুরা এই অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরু করেছে।

এর পাশাপাশি ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমযুদ্ধ, মিথ্যা প্রচারণা এবং সাংস্কৃতিক যুদ্ধও চলছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক যুদ্ধ এসব বহুমাত্রিক সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

তিনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে নবী করিম (সা.) যেভাবে অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করেছিলেন, আমাদেরও সেভাবেই তা মোকাবিলা করতে হবে।

জনগণ ও কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান
ইরানি জনগণের উদ্দেশে আয়াতুল্লাহ খাতামি বলেন, প্রায় ১৯০ রাত এবং ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে যারা রাস্তায় নেমে ইসলামী ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতেও তাঁদের সহযোগিতা অত্যন্ত প্রয়োজন।

তিনি বলেন, এই ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যবস্থাকে সহযোগিতা করা জনগণের জন্য অপরিহার্য। একই সঙ্গে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের জিহাদি চেতনা নিয়ে কাজ করতে হবে, যাতে দেশের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো সমাধান করা যায় অথবা অন্তত কমিয়ে আনা যায়।

আয়াতুল্লাহ খাতামি বলেন, জনগণের অধিকার হলো—সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা আন্তরিকতা ও সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা নিয়ে তাঁদের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো সমাধানে কাজ করবেন।

একই সঙ্গে তিনি জনগণের প্রতি আহ্বান জানান, প্রত্যেকে যেন নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ইসলামী ব্যবস্থা ও দেশকে সহযোগিতা করেন।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha