শনিবার ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - ০১:৪৯
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব তাঁর সর্বজনীন রিসালাত ও মহান চরিত্রে নিহিত

রাসূলুল্লাহ হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব ও অনন্য মর্যাদা শুধু তিনি সর্বশেষ নবী হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাঁর সর্বজনীন রিসালাত, মহান চরিত্র, পূর্ণাঙ্গ শরিয়ত, মাকামে মাহমুদ, আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ এবং তাঁর মাধ্যমে নবুওয়াতের ধারার পরিপূর্ণতা—সবকিছু মিলেই তাঁর মর্যাদাকে অনন্য করেছে বলে মন্তব্য করেছেন হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মাওলানা মুহাম্মাদ শরিফুল ইসলাম।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: বগুড়ার হরিপুর জামে মসজিদ ও ইমামবাড়ায় জুমার খুতবায় তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের বিভিন্ন দিক কুরআনের আয়াত, হাদিস এবং আহলে বাইত (আ.)-এর রেওয়ায়েতের আলোকে তুলে ধরেন।

আল্লাহ নিজেই রাসূলের মর্যাদা সমুন্নত করেছেন
খুতবায় মাওলানা মুহাম্মাদ শরিফুল ইসলাম বলেন, আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মর্যাদা সমুন্নত করার ঘোষণা দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে—

وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ

“আর আমি আপনার মর্যাদা ও স্মরণকে সমুন্নত করেছি।” [সূরা আল-ইনশিরাহ, ৯৪:৪]

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নাম আল্লাহর নামের সঙ্গে ঈমানের সাক্ষ্যে উচ্চারিত হয়—‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’। এটি তাঁর বিশেষ মর্যাদার অন্যতম নিদর্শন।

সমগ্র মানবজাতির জন্য রাসূল
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর রিসালাত কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা ভূখণ্ডের জন্য ছিল না উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁর রিসালাত সমগ্র মানবজাতির জন্য।

আল্লাহ বলেন—

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِّلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا

“আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করেছি।” [সূরা সাবা, ৩৪:২৮]

অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন—

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ

“আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।” [সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:১০৭]

মাওলানা শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘রহমাতুল্লিল আলামিন’ হওয়া রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর রিসালাতের ব্যাপকতা ও মহত্ত্বের সুস্পষ্ট প্রমাণ। তিনি কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা যুগের জন্য নন; তাঁর শিক্ষা মানবজাতির জন্য হেদায়েতের পথনির্দেশ।

মহান চরিত্রের সর্বোচ্চ আদর্শ
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ঘোষণা উল্লেখ করে তিনি বলেন—

وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ

“নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।” [সূরা আল-কলম, ৬৮:৪]

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চরিত্র ছিল কুরআনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। হযরত আয়িশা (রা.)-এর বর্ণিত একটি প্রসিদ্ধ রেওয়ায়েতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে বলা হয়েছে—

كَانَ خُلُقُهُ الْقُرْآنَ

“তাঁর চরিত্র ছিল কুরআন।”

অর্থাৎ কুরআনের শিক্ষা ও নৈতিক আদর্শ তাঁর জীবন ও আচরণে বাস্তব রূপ লাভ করেছিল।

রাসূলুল্লাহ (সা.) সর্বোত্তম আদর্শ
খুতবায় সূরা আল-আহযাবের ২১ নম্বর আয়াত উল্লেখ করে মাওলানা শরিফুল ইসলাম বলেন—

لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ

“নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।” [সূরা আল-আহযাব, ৩৩:২১]

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, ন্যায়বিচার, দরিদ্রের প্রতি সহমর্মিতা, শত্রুর প্রতি ক্ষমা এবং মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ—সব ক্ষেত্রেই তিনি মানবজাতির জন্য আদর্শ রেখে গেছেন।

নবুওয়াতের সমাপ্তি
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম নিদর্শন হিসেবে তাঁর ‘খাতামান নাবিয়্যিন’ হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—

وَلَٰكِن رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ

“বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং নবীদের সমাপ্তিকারী।” [সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৪০]

তিনি বলেন, হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর মাধ্যমে নবুওয়াতের ধারার সমাপ্তি ঘটেছে এবং তাঁর ওপর অবতীর্ণ শরিয়ত কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য হেদায়েতের পথনির্দেশ বহন করে।

মাকামে মাহমুদ ও বিশেষ মর্যাদা
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিশেষ মর্যাদার আরেকটি দিক হিসেবে মাকামে মাহমুদের কথা উল্লেখ করেন বক্তা। আল্লাহ বলেন—

عَسَىٰ أَن يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُودًا

“আশা করা যায়, আপনার প্রতিপালক আপনাকে এমন এক প্রশংসিত মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করবেন।” [সূরা আল-ইসরা, ১৭:৭৯]

তিনি বলেন, কিয়ামতের কঠিন পরিস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিশেষ মর্যাদা প্রকাশিত হবে। হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় তাঁর শাফাআতের মর্যাদার কথাও এসেছে।

আল্লাহ ও ফেরেশতারা নবীর প্রতি দরুদ পাঠান
খুতবায় সূরা আল-আহযাবের ৫৬ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করে তিনি বলেন—

إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ

“নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর প্রতি দরুদ প্রেরণ করেন।”

এরপর মুমিনদের উদ্দেশে বলা হয়েছে—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

“হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম প্রেরণ করো। [সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৫৬]

মাওলানা শরিফুল ইসলাম বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি দরুদ ও সালাম প্রেরণের নির্দেশ তাঁর মর্যাদার এক অনন্য নিদর্শন।

রাসূলের (সা.) প্রতি ভালোবাসা ঈমানের অংশ
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি সহিহ হাদিসের একটি প্রসিদ্ধ বর্ণনা উল্লেখ করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَلَدِهِ وَوَالِدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ

“তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার সন্তান, পিতা-মাতা এবং সমস্ত মানুষের চেয়েও অধিক প্রিয় হই।”

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা শুধু আবেগের বিষয় নয়; বরং তাঁর আদর্শকে জীবনে গ্রহণ করা, তাঁর নির্দেশ অনুসরণ করা এবং তাঁর সুন্নাহকে সম্মান করাও সেই ভালোবাসার বাস্তব প্রকাশ।

আহলে বাইত (আ.)-এর আলোকে রাসূলের মর্যাদা
খুতবায় আহলে বাইত (আ.)-এর রেওয়ায়েতের আলোকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিশেষ মর্যাদার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। মাওলানা শরিফুল ইসলাম বলেন, আহলে বাইত (আ.)-এর বর্ণনাগুলোতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নূর, জ্ঞান, চরিত্র, রিসালাত এবং আল্লাহর নৈকট্যের বিশেষ মর্যাদা তুলে ধরা হয়েছে।

তিনি মুসলমানদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ও শিক্ষার সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক আরও গভীর করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে কুরআন ও আহলে বাইত (আ.)-এর শিক্ষার আলোকে রাসূলের আদর্শ অনুসরণ, তাঁর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ এবং তাঁর নৈতিক শিক্ষাকে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

খুতবায় তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব উপলব্ধি করার প্রকৃত অর্থ হলো তাঁর প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি তাঁর আদর্শ, ন্যায়নীতি, দয়া, ক্ষমাশীলতা ও মহান চরিত্রকে নিজেদের জীবনে ধারণ করা।

শেষে তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পাঠ এবং তাঁর শিক্ষা অনুসরণের মাধ্যমে ব্যক্তি ও সমাজজীবনে ইসলামের নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha