রবিবার ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - ১৩:৪৬
কুরআন কি শেষ নবী (সা.)-এর বাণী? এবং তাঁর (সা.)-এর বাণীকে কি কুরআনের সাথে তুলনা করা যায়?

কুরআন কি শেষ নবী (সা.)-এর বাণী? এবং তাঁর (সা.)-এর বাণীকে কি কুরআনের সাথে তুলনা করা যায়? আর লোকেরা নবী (সা.)-এর মতো বাণী রচনা করতে অক্ষম হওয়ায় কি কুরআনকেও অ-অলৌকিক (অ-মুজিযা) বিবেচনা করা যায়?

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী,

মজিদুল ইসলাম শাহ

সংক্ষেপ:

পবিত্র কুরআন শুধু নবীর বাণী থেকে মৌলিকভাবে ভিন্নই নয়, বরং শৈলী, অলংকার ও প্রেক্ষাপটের দিক থেকে তা মানবসামর্থ্যের ঊর্ধ্বে এবং এর প্রতি চ্যালেঞ্জ (তাহাদ্দি) চিরকাল স্থায়ী; অথচ নবী (সা.)-এর বাণী মানবসামর্থ্যের কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং আরবের সুবক্তাদের বাণীর সাথে তুলনীয়। অতএব, কুরআনের মতো কেউ আনতে অক্ষম হওয়াই এর দৈবত্বের নিশ্চিত প্রমাণ এবং নবী (সা.)-এর বাণীর মতো আনতে অক্ষমতার সাথে একে মাপা যায় না।

উত্তর:

কিছু ধর্মবিদ্বেষী বলে থাকে যে, কুরআনের মতো বাণী রচনায় মানুষের অক্ষমতা এর মুজিযা (অলৌকিকতা) হওয়ার প্রমাণ নয়; কারণ মানুষ নবী (সা.)-এর মতো বাণী রচনাতেও অক্ষম, অথচ কেউ তাঁর বাণীকে মুজিযা মনে করে না। সুতরাং, কুরআনের মতো আনতে অক্ষমতা এর দৈবত্বের নিদর্শন হতে পারে না।[১]
জবাবে বলা উচিত যে, এই যুক্তি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন; কারণ:

১. নবীর হাদিস (বাণী) মুজিযা নয়:

নবী (সা.)-এর হাদিস ও বাণী তার সমস্ত মূল্য ও মর্যাদা সত্ত্বেও কখনো মুজিযা (অলৌকিক) হিসেবে গণ্য করা হয়নি এবং এর ব্যাপারে কোনো তাহাদ্দি (চ্যালেঞ্জ) পেশ করা হয়নি। যদি নবী (সা.)-এর বাণী অন্যান্য আরব সুবক্তাদের বাণী থেকে ভিন্ন হয়, তবে এই পার্থক্য 'বালিগ ও আবলাগ' (অর্থপূর্ণ ও অধিক অর্থপূর্ণ) বা 'ফাসিহ ও আফসাহ' (স্পষ্ট ও অধিক স্পষ্ট)-এর পর্যায়ের এবং তা মানবসামর্থ্যের সীমার বাইরে নয়। অন্য কথায়, নবী (সা.)-এর বাণী সুবক্তা আরবদের বাণীর খুব কাছাকাছি এবং বাগ্মিতায় দক্ষ ব্যক্তিরা (ঠিক একই রকম না হলেও) তার মতো বাণী রচনা করতে সক্ষম। সুতরাং, নবীর বাণীর মতো কিছু আনার ক্ষেত্রে অক্ষমতা পরম (মুটলাক) নয়, বরং আপেক্ষিক (নিসবি)।

২. কুরআন নবীর বাণী থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন:

পবিত্র কুরআন শুধু নবীর হাদিস থেকেই নয়, বরং সমগ্র মানবিক বাণী থেকেই প্রকৃতিগতভাবে (মাহাভী) ভিন্ন। কুরআন তার শৈলী (উসবুল), প্রকাশভ (বয়ান), প্রেক্ষাপট (সিয়াক) এবং অলংকারশাস্ত্র (বালাগাত)-এর দিক থেকে এমন এমন যে, জিন ও মানুষ কেউই কিয়ামত পর্যন্ত এর অনুরূপ আনতে পারবে না। এই পার্থক্য এতটাই প্রকট যে, কুরআনের বাণীকে কখনো নবীর হাদিস বা সাহাবী ও তাবেয়ীদের বাণীর সাথে গুলিয়ে ফেলা সম্ভব নয়। অনেক ক্ষেত্রে নবীর হাদিসকে সাহাবীদের (যেমন হযরত আলী (আ.)) বাণী থেকে আলাদা করা সাধারণ মানুষের জন্য কঠিন হয়েছে, কিন্তু কুরআনকে অ-কুরআন থেকে চেনাতে কেউই সামান্যতম সন্দেহ পেত না। এটি নিজেই কুরআনের মুজিযা ও ঐশ্বরিক হওয়ার সাক্ষ্য বহন করে।

৩. নবী (সা.) অন্যান্য মানুষের মতোই একজন মানুষ:

পবিত্র কুরআন নবী (সা.)-কে অন্যান্য মানুষের মতোই একজন মানুষ হিসেবে পরিচয় করিয়েছে:

﴿قُلْ سُبْحَانَ رَبِّي هَلْ كُنْتُ إِلَّا بَشَرًا رَسُولًا﴾

"বলুন, আমার প্রতিপালক পবিত্র, আমি কি একজন মানুষ ও রাসূল ছাড়া আর কিছু?" [২]

নিজে নবী (সা.)-ও বলেছেন:

«إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ»

"আমি তো একজনই মানুষ।" [৩]

এই আয়াত ও হাদিস প্রমাণ করে যে, নবী (সা.) মানবিক দিক থেকে অন্যদের থেকে আলাদা নন এবং তাঁর বাণীও মানুষের সামর্থ্যের কাঠামোর মধ্যে মূল্যায়নযোগ্য। কিন্তু কুরআন এমন একটি বাণী যা মানুষের সীমা অতিক্রম করে গেছে এবং কুরআনের তাহাদ্দি (চ্যালেঞ্জ) এই সীমা অতিক্রম করাকেই মানুষের সামর্থ্যের চ্যালেঞ্জ হিসেবে পেশ করেছে।

৪. কুরআনকে নবীর বাণীর সাথে তুলনা করা একটি ভিত্তিহীন ও অমূলক উপমা:

নবী (সা.)-এর বাণীর মতো কিছু আনার ক্ষেত্রে অক্ষমতা আপেক্ষিক (নিসবি) এবং কিছু সুবক্তা ও অলংকারশাস্ত্রবিদ তাঁর বাণীর কাছাকাছি পৌঁছাতে সক্ষম। কিন্তু কুরআনের মতো কিছু আনার ক্ষেত্রে অক্ষমতা পরম (মুতলাক) ও চিরস্থায়ী। এই পার্থক্যই প্রমাণ করে যে, কুরআন শুধু মানবিক বাণী থেকে নয়, বরং নবীর বাণী থেকেও উচ্চতর ও শ্রেষ্ঠ। [৪]

উপসংহার:
পবিত্র কুরআন আল্লাহর বাণী এবং কখনোই তা নবী (সা.)-এর বাণী বা অন্য কোনো মানবিক কথার সাথে তুলনা করা যায় না। কুরআনের তাহাদ্দি (চ্যালেঞ্জ) এমন একটি চ্যালেঞ্জ যা চিরকাল স্থায়ী এবং কেউই এখন পর্যন্ত এর অনুরূপ আনতে পারেনি এবং ভবিষ্যতেও পারবে না। এই বিষয়টিই এই আসমানী গ্রন্থের ঐশ্বরিক হওয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রমাণ।

তথ্যসুত্র:

[১]. মানাহিলুল ইরফান, খণ্ড ১, পৃ. ১২০।

[২]. সূরা বনি ইসরাইল (ইসরা), আয়াত ৯৩।

[৩]. ওয়াসায়েলুশ শিয়া, খণ্ড ২৭, পৃ. ২২৩।

[৪]. মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ দাররাজ, আন-নাবাউল আজীম, পৃ. ১০০।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha