হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী,
মজিদুল ইসলাম শাহ
সংক্ষেপ:
পবিত্র কুরআন সর্বজনীন চ্যালেঞ্জ ও অদ্বিতীয় শৈলীর দাবি নিয়ে মানবসৃষ্ট বাণীর ঊর্ধ্বে এবং এমনকি নবী (সা.)-এর সুস্পষ্ট ও শুদ্ধ বাণীর চেয়েও উচ্চতর; অথচ নবীর বাণী মানবসামর্থ্যের সীমার মধ্যে মূল্যায়িত হয় এবং সাহাবিদের বক্তব্যের সাথে অনেক সাদৃশ্যপূর্ণ। সুতরাং, কুরআন নবীর বাণী নয়, বরং তা আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহি, যার সামনে মানুষের পূর্ণ অক্ষমতা এর চিরন্তন মু'জিজা (অলৌকিকতা) প্রমাণ করে।
উত্তর:
এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য প্রথমে নবীর বাণী এবং পবিত্র কুরআনের মধ্যে প্রকৃতি, অলংকারশাস্ত্র (বিলাগাত) এবং চ্যালেঞ্জের দাবির দিক থেকে পার্থক্য করা প্রয়োজন। ধর্মবিদ্বেষীরা মাঝে মাঝে দাবি করে যে, আরবদের কুরআনের মতো অনুরুপ বাণী রচনা করতে অক্ষম হওয়া প্রমাণ করে না যে এটি একটি মু'জিজা (অলৌকিক); কারণ তারা নবীর (সা.) মতো বাণী বলতেও অক্ষম ছিল, কিন্তু কেউই নবীর বাণীকে মু'জিজা মনে করে না। তবে এই যুক্তিটি কয়েক দিক থেকে ভুল:
১- তাহাদ্দি বা চ্যালেঞ্জের দাবিতে পার্থক্য:
পবিত্র কুরআন সম্পূর্ণ স্পষ্টতার সাথে সমস্ত মানুষ ও জিনকে আহ্বান জানিয়েছে যে, যদি তারা সক্ষম হয়, তবে এই কিতাবের অনুরূপ কিছু নিয়ে আসুক এবং এই চ্যালেঞ্চ চিরস্থায়ী ও বিশ্বব্যাপী।[১] কিন্তু নবী (সা.)-এর বাণী সম্পর্কে এরূপ কোনো দাবি কখনো উত্থাপিত হয়নি। নবীর বাণী, যদিও উচ্চমানের ও সুস্পষ্ট (ফসীহ), তা মানবসামর্থ্যের সীমার মধ্যে মূল্যায়িত হয় এবং কখনোই তা মু'জিযা (অলৌকিক) হিসেবে পরিচিত হয়নি।[২]
২. বাগ্মিতা ও শৈলীর গুণগত পার্থক্য:
নবী (সা.)-এর বক্তব্য, শৈলী ও ভাবধারার দিক থেকে সাহাবি ও আরবের সুবক্তাদের ভাষার কাছাকাছি; এমনকি কখনো কখনো তাঁর বক্তব্যকে হযরত আলী (আ.) বা অন্যান্য সাহাবির বক্তব্য থেকে আলাদা করা কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু পবিত্র কুরআন এতটাই অনন্য ও স্বতন্ত্র শৈলীর অধিকারী যে, মানবসৃষ্ট কোনো বাণীর সাথে, এমনকি নিজ নবীর বাণীর সাথেও এর কোনো সাদৃশ্য নেই। এই পার্থক্য এতটাই সুস্পষ্ট যে, কেউ কুরআনের আয়াতগুলোকে নবীর বাণী বলে ভুল করে না এবং নবীর বাণীকে কুরআনের আয়াত বলে ভুল করে না [৩]।
৩. কুরআনের অতিমানবীয় (ফ্রাবাশারি) প্রকৃতি:
কুরআন একাধিক আয়াতে নবীকে অন্যান্য মানুষের মতোই একজন মানুষ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে এবং তিনি নিজেও নিজেকে একজন সাধারণ মানুষ বলে মনে করতেন, যিনি শুধুমাত্র আল্লাহর প্রেরিত ব্যক্তি।[৪] তিনি বিভিন্ন প্রসঙ্গে স্পষ্টভাবে বলেছেন: "إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ" (আমি তো একজন মানুষ মাত্র) এবং এমনকি নিজের সাধারণ মানবিক আচরণের কথাও উল্লেখ করেছেন[৫]। কিন্তু কুরআন, যদিও একজন মানুষের হৃদয়ে নাযিল হয়েছে, তবুও তা এমন এক মহিমা ও বাগ্মিতার অধিকারী যে, একে কোনো মানুষের মস্তিষ্ক বা ভাষার সৃষ্টি বলে মনে করা যায় না[৬]।
৪. কুরআনের সামনে সম্পূর্ণ অক্ষমতা:
কুরআনের চ্যালেঞ্জ চিরস্থায়ী ও যুগপৎব্যাপী এবং কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, জিন ও মানুষ, এমনকি বাগ্মিতার চরম শিখরেও পৌঁছেও, এর অনুরূপ বা এমনকি এর কাছাকাছি কিছুও রচনা করতে পারেনি। অন্যদিকে, আরবের সুবক্তাদের পক্ষে নবী (সা.)-এর বাণীর কাছাকাছি কিছু বলার বা অনুকরণ করার সম্ভাবনা ছিল; যা প্রমাণ করে যে নবীর বাণী, যদিও উচ্চমানের, তা মানবসামর্থ্যের সীমার মধ্যেই অবস্থিত। তাই, কুরআনের সামনে অক্ষমতা নিরঙ্কুশ (মোট) এবং নবীর বাণীর সামনে অক্ষমতা আপেক্ষিক [৭]।
৫. ইতিহাস ও বিশেষজ্ঞদের সাক্ষ্য:
জারকানির মতো গবেষকগণ তার মানাহিলুল ইরফান গ্রন্থে এবং মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ দাররাজ তার আন-নাবাউল আজিম গ্রন্থে জোর দিয়ে বলেছেন যে, কুরআনের শৈলী সমস্ত মানবসৃষ্ট বাণী থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন। যদি কুরআন মানবসৃষ্ট হতো, তাহলে মানুষের পক্ষ থেকে অন্তত একটি অনুরূপ নমুনা উপস্থাপন করা সম্ভব হতো; অথচ ইতিহাস জুড়ে কেউই এর মতো একটি ছোট সূরা পর্যন্ত রচনা করতে পারেনি [৮]।
৬. পবিত্রতা ও মু'জিযার (অলৌকিকতার) পার্থক্য:
এমনকি যদি আমরা নবী (সা.)-এর বানীকে সুস্পষ্ট ও বাগ্মী বক্তব্যের নমুনা হিসেবেও বিবেচনা করি, তবুও এটি কুরআনের আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত হওয়ার বিষয়টিকে অস্বীকার করে না; কারণ কুরআনের মু'জিযা কেবল এর বাগ্মিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর বিষয়বস্তু, গায়েবি সংবাদ, অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্য এবং হৃদয়ে এর গভীর প্রভাবের মাঝেও প্রকাশ পায়। এই বৈশিষ্ট্যগুলো কুরআনকে প্রতিটি মানবসৃষ্ট বাণী থেকে, এমনকি ইসলামের মহানবী (সা.)-এর বক্তব্য থেকেও সম্পূর্ণ আলাদা করে তোলে [৯]।
উপসংহার:
যা কিছু বলা হলো, তার ভিত্তিতে কুরআন কেবল নবীর বাণী নয়, বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত ওহি, যা মানবসামর্থ্যের ঊর্ধ্বে নাযিল হয়েছে এবং নিজের চিরস্থায়ী চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে নিজের প্রামাণ্যতা ও চিরন্তনতা প্রমাণ করেছে। কুরআনের শৈলী ও নবীর বাণীর মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য এবং তার মুখোমুখি হওয়ায় মানুষের সম্পূর্ণ অক্ষমতা এই সত্যের স্পষ্ট প্রমাণ যে, এই গ্রন্থটি আল্লাহর বাণী, মুহাম্মদুল আমীন (সা.)-এর কথা নয়।
তথ্যসূত্র:
[১] সূরা ইসরা, আয়াত ৮৮।
[২] যারকানী, মুহাম্মাদ আব্দুল আজীম, মুনাহিলুল ‘ইরফান ফী ‘উলূমিল কুরআন, খণ্ড ১, পৃ. ১২০।
[৩] পূর্বোক্ত, পৃ. ১২১।
[৪] সূরা ইসরা, আয়াত ৯৩; ওয়াসাইলুশ শীয়া, খণ্ড ২৭, পৃ. ২২৩।
[৫] বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ১৬, পৃ. ২২৯।
[৬] আলীমারদী, মুহাম্মাদ মাহদী, দর সাহিলে ওহী, পৃ. ৪০।
[৭] মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ দিরায, আন-নাবাউল ‘আজীম, কুয়েত: দারুল ফিকর, ১৪১৬ হি., পৃ. ১০০।
আপনার কমেন্ট