হাওজা নিউজ এজেন্সি: সাংস্কৃতিক কর্মী ও হাওজা-ইউনিভার্সিটির শিক্ষক নেদা হেকমতনিয়া বলেন, ভার্চুয়াল জগতের ব্যাপক প্রভাব থাকা সত্ত্বেও পরিবার এখনো সন্তানের পরিচয় গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। তবে বর্তমান সময়ে সন্তানদের তথ্য ও চিন্তাভাবনার একমাত্র উৎস আর পরিবার নয়। শিশু-কিশোররা স্কুল, বন্ধু, কম্পিউটার গেম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিভিশন সিরিজ ও বিভিন্ন ভার্চুয়াল চরিত্র থেকেও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়।
তাই পরিবার যদি এই জগত থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখে, তাহলে সন্তান শুধু পরিবারের কাছ থেকেই আদর্শ ও মূল্যবোধ শিখবে—এমনটা আশা করা যায় না।
তিনি বলেন, পরিবার এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। কারণ পরিবার শুধু তথ্য দেয় না; সন্তানকে নিরাপত্তা, আপনত্ব, ভালোবাসা ও জীবনের অর্থবোধও দেয়। ভার্চুয়াল জগত সন্তানকে কী দেখতে হবে তা দেখাতে পারে, কিন্তু পরিবার তাকে শেখাতে পারে—কীভাবে কোনো বিষয় দেখতে হবে, বুঝতে হবে এবং সঠিক-বেঠিক বিচার করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, একজন কিশোর ভার্চুয়াল জগতে প্রতিদিন অসংখ্য বার্তা, তথ্য ও নানা ধরনের সংশয়ের মুখোমুখি হতে পারে। কিন্তু ঘরে যদি সে নিরাপত্তা, সম্মান ও আস্থা অনুভব করে, তাহলে নিজের প্রশ্ন ও উদ্বেগ বাবা-মায়ের কাছে প্রকাশ করবে। বিপরীতে, যদি সে মনে করে প্রশ্ন করলে তাকে অপমানিত বা প্রত্যাখ্যাত হতে হবে, তখন সে তার উত্তর খুঁজতে ভার্চুয়াল জগতের ওপর বেশি নির্ভর করবে।
এ কারণে বর্তমান পরিবারকে শুধু আদেশ-নির্দেশের পরিবেশ না রেখে আলোচনা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বাবা-মাকে সন্তানের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে, তার উদ্বেগকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং একই সঙ্গে নৈতিক ও পারিবারিক সীমারেখাগুলোও স্পষ্ট রাখতে হবে।
ধর্মীয় মূল্যবোধ শেখাতে বাবা-মাকেই হতে হবে আদর্শ
ধর্মীয় মূল্যবোধ সন্তানদের মধ্যে সঞ্চারের ক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, আজকের মায়ের দায়িত্ব শুধু ধর্মীয় বিষয় শেখানো নয়; বরং নিজের আচরণের মাধ্যমে ধর্মীয় মূল্যবোধের বাস্তব উদাহরণ তৈরি করা।
সন্তান যেন মায়ের সততা, শান্ত স্বভাব, ন্যায়পরায়ণতা, দয়া ও দায়িত্বশীলতার মধ্যে ধর্মীয় মূল্যবোধ দেখতে পায়। মা যদি সন্তানকে নামাজ ও নৈতিকতার কথা বলেন, কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে তার সঙ্গে অপমানজনক বা কঠোর আচরণ করেন, তাহলে মায়ের আচরণই তার কথার চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে।
তিনি বলেন, সন্তানকে ধর্মীয় মূল্যবোধ শেখানোর প্রথম ধাপ হলো তার সঙ্গে একটি নিরাপদ ও আন্তরিক সম্পর্ক তৈরি করা। যে সন্তান মনে করে তার কথা শোনা হয় এবং তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, সে মূল্যবোধ গ্রহণের জন্য বেশি প্রস্তুত থাকে।
দ্বিতীয় ধাপে একতরফা উপদেশের পরিবর্তে আলোচনা ও প্রশ্নের সুযোগ তৈরি করতে হবে। বর্তমান প্রজন্মের কিশোর-কিশোরীদের শুধু আদেশ-নিষেধ দিয়ে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তাদের প্রশ্ন করতে দিতে হবে—এমনকি কোনো প্রশ্ন বাবা-মায়ের কাছে কঠিন বা উদ্বেগজনক মনে হলেও।
তৃতীয় ধাপে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাকে দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। যেমন, শুধু ন্যায়বিচারের কথা বললেই হবে না; পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও ন্যায়সঙ্গত আচরণ করতে হবে। সম্মানের কথা শুধু মুখে না বলে স্বামী-স্ত্রী, সন্তান, প্রতিবেশী ও অন্যদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণের মাধ্যমে তা শেখাতে হবে।
সন্তানের অনলাইন জগত সম্পর্কে বাবা-মাকে সচেতন হতে হবে
গণমাধ্যম বিষয়ে সচেতনতার গুরুত্ব তুলে ধরে হেকমতনিয়া বলেন, বাবা-মায়ের জানা উচিত—সন্তান কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে, কারা তার চিন্তা ও আচরণে প্রভাব ফেলছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম কীভাবে তার পছন্দ ও আগ্রহকে প্রভাবিত করছে।
নতুন প্রজন্মের ভাষা ও আগ্রহ বোঝার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মায়ের পক্ষে নতুন প্রজন্মের সব প্রযুক্তি বা শব্দ জানা জরুরি নয়। তবে সন্তানের জগতের প্রতি তার আগ্রহ থাকা প্রয়োজন।
সন্তান কী গেম খেলছে, কী দেখছে এবং কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে—এসব বিষয়ে বাবা-মায়ের ধারণা থাকা দরকার। তা না হলে সন্তানের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাদের অজান্তেই অন্যদের প্রভাবের অধীনে চলে যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সন্তানদের ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ শেখানোর দায়িত্ব শুধু মায়ের ওপর দেওয়া উচিত নয়। বাবা, স্কুল, হাওজা, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান—সবারই এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব রয়েছে। তাই সব দায়িত্ব মায়ের ওপর চাপিয়ে দিয়ে পরে ফলাফল খারাপ হলে শুধু মাকেই দায়ী করা ঠিক নয়।
শুধু মোবাইল কেড়ে নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না
সন্তানদের ভার্চুয়াল জগত ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি প্রয়োজন, তবে শুধু এটুকুই যথেষ্ট নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পরিবারকে সন্তানের বয়স অনুযায়ী মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারের সময়, কনটেন্টের ধরন এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সম্পর্কে স্পষ্ট ও যৌক্তিক নিয়ম তৈরি করতে হবে।
তবে সন্তানকে শুধু মোবাইল থেকে দূরে রাখা বা তার প্রবেশাধিকার সীমিত করাই যদি লালন পালনের একমাত্র পদ্ধতি হয়, তাহলে সুযোগ পেলেই সে আবার একই পরিবেশে ফিরে যেতে পারে।
তাই নজরদারির পাশাপাশি সন্তানকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া ও তথ্য বিশ্লেষণের সক্ষমতা শেখাতে হবে। তাকে বোঝাতে হবে—প্রতিটি ছবি বাস্তব নয়, প্রত্যেক জনপ্রিয় ব্যক্তি আদর্শ হতে পারে না, প্রতিটি পরিসংখ্যান যাচাই না করে বিশ্বাস করা উচিত নয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রদর্শিত প্রতিটি জীবনধারাকে সফলতার প্রতীক মনে করা ঠিক নয়।
তিনি বলেন, তরবিয়তের মূল লক্ষ্য হলো এমন একজন সচেতন ও বিচক্ষণ মানুষ তৈরি করা, যে ভুল বা ক্ষতিকর কনটেন্টের মুখোমুখি হলেও তা শনাক্ত করতে পারবে এবং প্রয়োজন হলে এ বিষয়ে পরিবারের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে পারবে।
আপনার কমেন্ট