মঙ্গলবার ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - ১৩:৫২
পবিত্র কুরআন মূলত নবী-রাসূলদের কাহিনিসমূহের একটি সংকলন, যা শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করে সংকলন ও লিপিবদ্ধ করেছেন?

এ কথা কি বলা যায় যে, পবিত্র কুরআন মূলত নবী-রাসূলদের কাহিনিসমূহের একটি সংকলন, যা শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করে সংকলন ও লিপিবদ্ধ করেছেন? আর এ সম্ভাবনাও কি আছে যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগের মুসলমানরা, বিশেষত সাহাবায়ে কেরাম, এসব কাহিনি সংগ্রহ ও সংকলনের কাজে তাঁর সঙ্গে সহযোগিতা করেছিলেন?

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী,

মজিদুল ইসলাম শাহ

সারসংক্ষেপ:

কুরআন পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহ থেকে বিষয়বস্তু গ্রহণ করেছে অথবা নবীদের কাহিনিসমূহ সংকলনের ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরাম সহযোগিতা করেছেন-এ ধরনের দাবির পক্ষে ঐতিহাসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কোনো ভিত্তি নেই। কারণ, মহানবী (সা.) ছিলেন উম্মী এবং ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর কোনো সাক্ষাৎও হয়নি।

কুরআন শুধু পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহ থেকে কিছু গ্রহণ করেনি; বরং সুস্পষ্টভাবে তাওরাত ও ইঞ্জিলের বিকৃত ও পরিবর্তিত বিষয়গুলো সংশোধন করেছে এবং ঐশী ওহি হিসেবে তার পূর্ণ স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা প্রমাণ করেছে।

উত্তর:

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য প্রথমেই এই সংশয়ের পটভূমি ও উৎস সম্পর্কে আলোচনা করা প্রয়োজন। কিছু প্রাচ্যবিদ ও ওহির বিরোধীরা দীর্ঘদিন ধরে কুরআনের ঐশী উৎসকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করে আসছেন এবং এটিকে মানুষের হস্তক্ষেপের ফল কিংবা পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহ থেকে গৃহীত বিষয়বস্তুর সংকলন হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ওয়াট ও গোল্ডজিহারের মতো প্রাচ্যবিদেরা কয়েকটি আয়াতের ভিত্তিতে দাবি করেছেন যে, মহানবী (সা.) ও তাঁর সাহাবিগণ ইহুদি ও খ্রিস্টান উৎস থেকে নবীদের কাহিনিসমূহ জেনেছিলেন এবং সেগুলোকে কুরআনের আকারে উপস্থাপন করেছেন।

পরবর্তী আলোচনায় এসব দাবি বিশদভাবে পর্যালোচনা করা হবে এবং দেখানো হবে যে, এসব বক্তব্য শুধু যুক্তি ও ইতিহাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় তা-ই নয়; বরং পবিত্র কুরআন নিজেই সুস্পষ্টভাবে এসব বিবরণকে মানবীয় উৎসের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।

নবীদের কাহিনি সংকলনে সাহাবিদের ভূমিকা সম্পর্কে ওয়াটের দাবির পর্যালোচনা

ওয়াট তাঁর গ্রন্থে দাবি করেন যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগের মুসলমানরা মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়াতের প্রতি ঈমান আনার পর পূর্ববর্তী নবীদের কাহিনিসমূহ সংগ্রহের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। আর যারা এসব সংবাদ অনুসন্ধান ও সংরক্ষণ করার যোগ্যতা রাখতেন, তারা ধীরে ধীরে এ বিষয়ে নিজেদের জ্ঞান বৃদ্ধি করতে থাকেন।[১] নিজের বক্তব্যের সমর্থনে তিনি ﴿هَلْ أَتَاكَ حَدِيثُ الْجُنُودِ﴾-“তোমার কাছে কি সৈন্যবাহিনীগুলোর সংবাদ পৌঁছেছে?”[২] এবং ﴿ذَلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ﴾-“এটি অদৃশ্য জগতের সংবাদসমূহের অন্তর্ভুক্ত”[৩]-এর মতো আয়াতের উদ্ধৃতি দেন। তাঁর দাবি, এসব অভিব্যক্তি প্রমাণ করে যে, মুহাম্মদ (সা.) একাই এসব বাণী উচ্চারণ করেননি; বরং এগুলোর গঠন ও প্রণয়নে অন্যদেরও ভূমিকা ছিল।

কিন্তু এ দাবি কয়েকটি দিক থেকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অবৈজ্ঞানিক:

প্রথমত, কোনো নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্রে এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না যে, মহানবী (সা.) বা সাহাবিগণ নবীদের কাহিনি সংকলনের জন্য এ ধরনের কোনো সভা বা কমিটি গঠন করেছিলেন।

দ্বিতীয়ত, এ কাজে মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে সহযোগিতা করার কথা ছিল-এমন কোনো ব্যক্তির নামও ইতিহাসে লিপিবদ্ধ নেই।

তৃতীয়ত, সে সময় অধিকাংশ সাহাবি নিরক্ষর ছিলেন-এ বিষয়টি বিবেচনায় নিলে, তাঁরা কীভাবে এ কাজে সহযোগিতা করেছিলেন এবং কীভাবে এসব সংবাদ অনুসন্ধান ও সংরক্ষণ করেছিলেন, তা সম্পূর্ণ অস্পষ্ট ও অনির্দিষ্ট।

চতুর্থত, এসব সংবাদ কোন লিখিত বা মৌখিক উৎস থেকে গ্রহণ করা হয়েছিল-তারও কোনো প্রমাণ বা উৎসনির্দেশ উপস্থাপন করা হয়নি।

পঞ্চমত, এ ক্ষেত্রে সাহাবিদের সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর সহযোগিতার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিও ব্যাখ্যা করা হয়নি।

ষষ্ঠত, সাহাবিগণ নিজেদের কাছে এবং অন্যদের কাছে বিদ্যমান তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে তা মহানবী (সা.)-এর নামে প্রচার করেছেন-এ কথা কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে? সুস্থ বিবেক কি মেনে নিতে পারে যে, কোনো একটি দাবিকে মিথ্যা ও মনগড়া বলে জানা সত্ত্বেও একদল মানুষ সেই দাবির পক্ষে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করবে এবং জিহাদের ময়দানে এমন একটি মিথ্যার জন্য নিজেদের সম্পদ ও জীবন বিসর্জন দেবে, যা তারা নিজেরাই তৈরি করেছে?[৪]

এ ছাড়াও, ওয়াট যে আয়াতগুলোর ওপর নির্ভর করেছেন, সেগুলোর কোনোটিই ওহি অবতরণের প্রক্রিয়ায় সাহাবিদের অংশগ্রহণের প্রমাণ বহন করে না। এসব আয়াত থেকে শুধু এতটুকুই বোঝা যায় যে, পূর্ববর্তী নবীদের কিছু কাহিনি মুসলমান ও সাহাবিদের কাছে পরিচিত ছিল এবং এসব আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার আগেই তাঁরা সেগুলো সম্পর্কে জানতেন। কারণ, এসব কাহিনি আরব গোত্রগুলোর মধ্যে মৌখিকভাবে প্রচলিত ছিল অথবা আশপাশের ভূখণ্ডে সেগুলোর কিছু নিদর্শন ও স্মৃতি বিদ্যমান ছিল।

উদাহরণস্বরূপ, সূরা বুরুজের প্রথম আয়াতগুলোতে আসহাবে উখদুদের কাহিনির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। এতে মুমিনদের সঙ্গে কাফিরদের সংঘাতের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। এরপর ফেরাউন ও সামূদ জাতির পরিণতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কাহিনি উল্লেখ করার উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষা গ্রহণ ও আরব জাতিকে সতর্ক করা-তারা যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ অমান্য করে, তাহলে তারাও অনুরূপ শাস্তির সম্মুখীন হতে পারে। এর উদ্দেশ্য নবীদের ইতিহাস সংকলনের জন্য কোনো উৎস বা উপাদান সরবরাহ করা নয়।

প্রাচীন নিয়ম থেকে কুরআনের উদ্ধৃতির বিষয়ে গোল্ডজিহারের তত্ত্বের সমালোচনা

আরেকজন বিশিষ্ট প্রাচ্যবিদ গোল্ডজিহার আরও সুস্পষ্টভাবে দাবি করেছেন যে, কুরআনে বর্ণিত নবী-রাসূলদের সমস্ত কাহিনি ইহুদিদের গ্রন্থসমূহ ও প্রাচীন নিয়ম (Old Testament) থেকে গ্রহণ করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্মীয় ব্যক্তিরাই ছিলেন মহানবী (সা.)-এর শিক্ষক।[৫]

কিন্তু এই বক্তব্যও গুরুতর কিছু আপত্তির সম্মুখীন:

প্রথমত, গোল্ডজিহার এমন কোনো বাস্তব উদাহরণ বা নির্দিষ্ট দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেননি, যা প্রমাণ করে যে, নবীদের কাহিনির কুরআনে বর্ণিত কোনো অংশ সরাসরি তাওরাত বা ইঞ্জিল থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। যদি এ দাবি সত্যিই গুরুতরভাবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে এর পক্ষে সুনির্দিষ্ট পাঠ্যগত তুলনা ও সামঞ্জস্য দেখানো আবশ্যক। অথচ না গোল্ডজিহার, না তাঁর অন্যান্য সমর্থক-কেউই কখনো এমন সুনির্দিষ্ট তুলনামূলক প্রমাণ উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন।

দ্বিতীয়ত, মহানবী (সা.)-কে কুরআনে সুস্পষ্টভাবে উম্মী (অশিক্ষিত/নিরক্ষর) হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি পড়তে ও লিখতে সক্ষম ছিলেন না-ইতিহাসে এটি একটি অনস্বীকার্য বাস্তবতা। একইভাবে, নবীজির জীবনীতে ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর কোনো নিয়মিত সাক্ষাৎ বা বৈঠকেরও উল্লেখ পাওয়া যায় না, যার ভিত্তিতে তাঁকে তাঁদের ‘শিক্ষার্থী’ বলে দাবি করা যেতে পারে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়। যদি সত্যিই এমন কোনো শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক বিদ্যমান থাকত, তাহলে সে যুগের ইহুদি ও খ্রিস্টানরা-যারা মহানবী (সা.)-এর দাওয়াতের ঘোর বিরোধী ছিল-অন্যদের তুলনায় এ বিষয়টিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরত এবং তাঁর নবুওয়াত অস্বীকার করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত। অথচ ইতিহাসে এমন একটি ঘটনাও পাওয়া যায় না যে, তারা মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ উত্থাপন করেছে। বরং তাদের প্রধান আপত্তি ছিল তাওহিদ, নবুওয়াত ইত্যাদি আকিদাগত বিষয়কে কেন্দ্র করে; কুরআনের সাহিত্যিক অনুকরণ বা পূর্ববর্তী গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে নয়।

কুরআন; পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহের বিচ্যুতির সংশোধনকারী

এই তত্ত্বের বিরুদ্ধে তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আপত্তি হলো-পবিত্র কুরআন শুধু পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহ থেকে কিছু গ্রহণ করেনি তা-ই নয়; বরং বহু ক্ষেত্রে সেসব গ্রন্থে প্রবেশ করা বিচ্যুতি ও বিকৃতিগুলো সংশোধন করেছে। সর্বশেষ ঐশী ওহি হিসেবে কুরআনের দায়িত্ব হলো, ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ইহুদি ও খ্রিস্টানদের মধ্যে ধর্মের নামে প্রচলিত হয়ে যাওয়া ভুল আকিদা ও বিশ্বাসগুলো সংশোধন করা এবং নবী-রাসূলদের প্রকৃত পরিচয় ও আল্লাহর সঠিক গুণাবলি তুলে ধরা।[৬]

উদাহরণস্বরূপ, ইহুদি ও খ্রিস্টান-উভয় সম্প্রদায়ই বিশ্বাস করত যে, আল্লাহর পৃথিবীতে কোনো সন্তান রয়েছে। ইহুদিরা বলত, উযাইর আল্লাহর পুত্র; কারণ, তাদের মতে তিনি বিকৃতির শিকার হওয়ার পর তাওরাতকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। আর খ্রিস্টানরা ঈসা মসীহকে তাঁর অলৌকিক ঘটনাবলি এবং পিতা ছাড়াই জন্মগ্রহণের কারণে আল্লাহর পুত্র বলে অভিহিত করত।

পবিত্র কুরআন এ বিশ্বাসকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে:

“ইহুদিরা বলে, ‘উযাইর আল্লাহর পুত্র’; আর খ্রিস্টানরা বলে, ‘মসীহ আল্লাহর পুত্র।’ এটি তাদের মুখের উচ্চারিত কথা; তারা পূর্ববর্তী কাফিরদের কথার অনুকরণ করছে। আল্লাহ তাদের ধ্বংস করুন! তারা কীভাবে সত্য থেকে বিমুখ হচ্ছে!”[৭]

অন্য একটি আয়াতে কুরআন আল্লাহর সন্তান থাকার ধারণা থেকে তাঁর পবিত্র সত্তাকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ঘোষণা করে বলেছে:

“নিশ্চয়ই তারা কাফির হয়েছে, যারা বলে, ‘আল্লাহই তো মারইয়ামের পুত্র মসীহ।’ বলুন, ‘আল্লাহ যদি মারইয়ামের পুত্র মসীহ, তাঁর মাতা এবং পৃথিবীর সকলকে ধ্বংস করতে চান, তবে কে আছে যে আল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের কোনো ক্ষমতা রাখে?’”[৮]

আরেকটি উদাহরণ হলো, হযরত ইবরাহিম (আ.) সম্পর্কে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের দৃষ্টিভঙ্গির সংশোধন। এই দুই সম্প্রদায়ের প্রত্যেকেই ইবরাহিম (আ.)-কে নিজেদের অনুসারী বলে মনে করত এবং নিজেদের ধর্মগ্রন্থকে তাঁর অনুসৃত গ্রন্থের তুলনায় শ্রেষ্ঠ মনে করত। কুরআন অত্যন্ত সহজ ও যুক্তিসংগতভাবে তাদের এ দাবি খণ্ডন করে ঘোষণা করেছে:

“হে আহলে কিতাব! তোমরা ইবরাহিম সম্পর্কে কেন বিতর্ক করছ? অথচ তাওরাত ও ইঞ্জিল তো তাঁর পরে অবতীর্ণ হয়েছে। তোমরা কি বিবেক-বুদ্ধি কাজে লাগাবে না?”[৯]

এরপর কুরআন দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করে যে, ইবরাহিম (আ.) না ইহুদি ছিলেন, না খ্রিস্টান; বরং তিনি ছিলেন হানিফ ও মুসলিম, এবং তিনি কখনোই মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।[১০]

এই সংশোধনধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি এবং জাতিগত ও ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে অবস্থান প্রমাণ করে যে, কুরআন শুধু পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থগুলোর ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং সেগুলোর ব্যাপারে চূড়ান্ত বিচারকের ভূমিকা পালন করে।

সারসংক্ষেপ:

উল্লিখিত যুক্তি ও প্রমাণের আলোকে বলা যায় যে, কুরআন পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহ থেকে গৃহীত হয়েছে অথবা নবীদের কাহিনি সংকলনের ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরাম সহযোগিতা করেছেন-এমন দাবি ঐতিহাসিক ভিত্তি যেমন রাখে না, তেমনি যুক্তি ও সুস্থ বিবেকের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, মহানবী (সা.) ছিলেন নিরক্ষর এবং ইহুদি ও খ্রিস্টানদের জ্ঞানচর্চার সভা-সমাবেশেও তাঁর অংশগ্রহণ ছিল না। পবিত্র কুরআনও সুস্পষ্টভাবে ওহি অবতরণের প্রক্রিয়ায় মানবীয় অংশগ্রহণের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং নিজেকে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ গ্রন্থ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।

এ ছাড়াও, পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থসমূহের প্রতি কুরআনের সংশোধনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিজেই এই আসমানি গ্রন্থটির পূর্ণ স্বাতন্ত্র্য ও ঐশী উৎসের একটি প্রমাণ। অতএব, মূল প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়-কুরআন এমন কোনো নবীদের কাহিনির সংকলন নয়, যা মহানবী (সা.) নিজে সংগ্রহ করে সংকলিত করেছেন; বরং এটি একটি ওহিভিত্তিক গ্রন্থ, যেখানে মানবজাতির জন্য শিক্ষা ও হিদায়াতের উদ্দেশ্যে নবী-রাসূলদের কিছু কাহিনি উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পূর্ববর্তী বর্ণনাসমূহে বিদ্যমান বিচ্যুতি ও বিকৃতিগুলোকেও সংশোধন করা হয়েছে।

এসব বৈশিষ্ট্য কুরআনকে সর্বশেষ ও পূর্ণাঙ্গ আসমানি গ্রন্থ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে এবং যেকোনো ধরনের মানবীয় অনুকরণ, সংকলন বা প্রভাবগ্রহণের ঊর্ধ্বে এর অবস্থানকে সুস্পষ্ট করে।[১১]

তথ্যসূত্র

[১] ওয়াট, মুহাম্মদ ইন মক্কা (Muhammad at Mecca), পৃ. ৮৪।

[২] সূরা বুরুজ, আয়াত ১৭।

[৩] সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৪৪।

[৪] সাহাবায়ে কেরামের জান ও মাল দিয়ে জিহাদ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: সূরা তাওবা, আয়াত ২০; সূরা বাকারা, আয়াত ১১৬; তাফসিরে বুরহান, খণ্ড ২, পৃ. ১১৬।

[৫] গোল্ডজিহার, আল-আকীদাহ ওয়াশ-শরিয়াহ (العقیدة و الشریعة), পৃ. ১৫।

[৬] দেখুন: হাসান জিয়াউদ্দিন ইত্র, ওহিয়ুল্লাহ (وحی الله), পৃ. ১৭২–১৯০।

[৭] সূরা তাওবা, আয়াত ৩০ এবং সূরা বাকারা, আয়াত ১১৬ থেকে গৃহীত।

[৮] সূরা মায়িদা, আয়াত ১৭।

[৯] সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৬৫।

[১০] সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৬৭।

[১১] আলীমরদী, মুহাম্মদ মাহদি, দর সাহেলে ওহি (در ساحل وحی), পৃ. ৩৬।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha