হাওজা নিউজ এজেন্সি: পবিত্র কোরআন সৃষ্টিজগত ও শরিয়তের বিধান—উভয় ক্ষেত্রেই ‘জিলবাব’ ও ‘খিমার’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করেছে। তবে এসব শব্দ মানুষের জ্ঞানতাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক মর্যাদার বিভিন্ন স্তরের প্রতিও ইঙ্গিত করে।
সদরা দর্শনের ভাষায়, মানুষের বাহ্যিক আবরণ তার অন্তরের আবরণেরও প্রতিফলন। আধ্যাত্মিক সাধনায় যাকে ‘দোষ-ত্রুটি আড়াল করা’ বলা হয়, তার শিকড় সেই অস্তিত্বগত ‘নূরের পর্দা’র বাস্তবতায় নিহিত, যা আল্লাহর সুন্দর নাম ও গুণাবলির প্রকাশ ছাড়া পুরোপুরি অপসারিত হয় না।
এ প্রসঙ্গে মাওলানা জালালউদ্দিন রুমি বলেছেন, ‘হে ভাই, তুমি তো সেই চিন্তাই; বাকি যা কিছু, তা হাড় ও শিকড়।’
সুতরাং, হিজাব সেই ‘উচ্চতর চিন্তা ও চেতনার’ দৃশ্যমান প্রকাশ। এটি এমন দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে একটি সুরক্ষাকবচ, যা মানুষকে তার ‘খিলাফাতুল্লাহর মর্যাদা’ থেকে নিচে নামিয়ে কেবল তার পশুত্বের দিকটিতে সীমাবদ্ধ করতে চায়।
আল্লামা তাবাতাবায়ীর ‘ই‘তিবারিয়াত’ (সামাজিক বিধান ও স্বীকৃত ধারণা) তত্ত্ব অনুসারে, হিজাবের মতো সামাজিক বিধানগুলো এমন ‘বিবেচনাগত স্বীকৃতি’, যা মানুষের বাস্তব ও সামষ্টিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে হিজাবকে সামাজিক আচরণ নিয়ন্ত্রণের একটি কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এর উদ্দেশ্য কেবল সীমাবদ্ধতা আরোপ করা নয়; বরং মানবিক পারস্পরিক সম্পর্কের মান উন্নত করা।
হিকমতে মুতাআলিয়ার (সদরা দর্শন) ভিত্তিতে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জনপরিসরে দৃশ্যমান যৌন-উত্তেজক উদ্দীপনা কমানোর মাধ্যমে মানুষের কল্পনাশক্তি ও প্রবৃত্তিনির্ভর মানসিক প্রবণতার ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাশক্তির প্রতি অধিক মনোযোগ তৈরি হতে পারে।
ইসলামী সমাজতত্ত্বের দৃষ্টিতেও হিজাব শরীরকে একটি পণ্য হিসেবে দেখার কৃত্রিম মূল্য কমাতে এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্বের প্রকৃত মূল্য বাড়াতে ভূমিকা রাখে। তাই হিজাবকে টেকসই সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য একটি যুক্তিসঙ্গত সামাজিক চুক্তি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে নারীরা বাহ্যিক ও ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্যের ওপর নির্ভর না করে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞান, শিক্ষা, রাজনীতি এবং ইজতিহাদের ক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়।
২১ তীরের ঘটনা সমকালীন ইরানের ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে কেবল আবেগনির্ভর কোনো প্রতিরোধ ছিল না; বরং ধর্মের গভীর উপলব্ধিতে একটি জাতির ফিকহ ও উসুলের পরিপক্বতার প্রকাশ। ওই দিন হাওজা ইলমিয়ার ইজতিহাদি ঐতিহ্যে শিকড় থাকা সাধারণ মানুষ দেখিয়েছিল যে, ধর্মীয় বিধানের প্রতি তাদের অঙ্গীকার কোনো ‘অন্ধ অনুকরণ’ থেকে উদ্ভূত নয়; বরং তা প্রাকৃতিক উপলব্ধি ও সুস্থ বিবেকবোধের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত, যা শরিয়তের উদ্দেশ্য—মানুষের বুদ্ধি, বংশধারা, সম্পদ ও সম্মান-সম্ভ্রম সংরক্ষণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মানুষ সেদিন প্রমাণ করেছে যে, হিজাব শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়; বরং এটি একটি সামাজিক বিধান, যার ক্ষেত্রে পুরুষেরও দায়িত্ব রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দৃষ্টির হিজাব এবং কথা ও আচরণের ক্ষেত্রে সংযম। পুরুষের চোখের হিজাব ও নারীর পোশাকের হিজাব—এই দুইয়ের পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে একটি পারস্পরিক নৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। সেখানে মানুষের মূল্যায়ন সামাজিক বাহ্যিকতার ভিত্তিতে নয়; বরং আল্লাহভীতির মাত্রার ভিত্তিতে করা হয়।
২১ তীরের ঘটনা এই মৌলিক সত্যটি তুলে ধরে যে, একটি পরিণত ও আত্মপরিচয়সম্পন্ন সমাজ কখনো সাংস্কৃতিক নিষ্ক্রিয়তা মেনে নেয় না। বরং যুক্তি, উত্তম পদ্ধতিতে বিতর্ক এবং প্রজ্ঞার ওপর নির্ভর করে নিজেদের পোশাকের দর্শনকে একটি ধর্মীয় ও যুক্তিসঙ্গত প্রয়োজন হিসেবে ব্যাখ্যা করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী— ‘নারীর পরিপূর্ণতা ক্ষণস্থায়ী কামনা-বাসনার দাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার মধ্যে; শারীরিক আকর্ষণ প্রদর্শনের সীমাহীন স্বাধীনতার মধ্যে নয়।’
তাই আমাদের সচেতন হওয়া উচিত যে, হিজাবের বিষয়টি ফিকহের শাখাগত বিধানগুলোর অন্তর্ভুক্ত হলেও এটি বিধানের দর্শন এবং ব্যবহারিক নৈতিকতার জগতের একটি প্রবেশদ্বার।
ইমাম সাদিক (আ.)-এর প্রতি সম্বন্ধিত বর্ণনায় এসেছে—
اَلْحِجَابُ زِینَةُ الْمَرْأَةِ
অর্থাৎ, ‘হিজাব নারীর সৌন্দর্য।’
এখানে ‘সৌন্দর্য’ বলতে কেবল সাজসজ্জামূলক সৌন্দর্য বোঝানো হয়নি; বরং এমন একটি অন্তর্নিহিত মূল্য ও সুরক্ষার ধারণা বোঝানো হয়েছে, যার মাধ্যমে নারীর মর্যাদাময় সত্তা কেবল বিচক্ষণ ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের সামনে যথাযথভাবে প্রকাশিত হবে এবং প্রবৃত্তির অনুসারীদের অনধিকার দৃষ্টি ও আকাঙ্ক্ষার নাগালের বাইরে থাকবে।
আপনার কমেন্ট