হাওজা নিউজ এজেন্সি: এ ধরনের পরিস্থিতিতে সন্তান নেওয়া বা না নেওয়ার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে একক কোনো নিয়ম সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। বরং দম্পতির পারস্পরিক সম্পর্ক, মানসিক ও আবেগগত পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং অন্যান্য বাস্তবতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
ইরানের ইমাম খোমেইনি (রহ.) শিক্ষা ও গবেষণা

প্রতিষ্ঠানের মনোবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়্যেদ আব্বাস সাতুরিয়ান ‘দাম্পত্য সমস্যার কারণে সন্তান নেওয়া এড়িয়ে চলা’ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে এসব বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন।
প্রশ্ন: কিছু দম্পতি দীর্ঘদিনের মতবিরোধ ও অসামঞ্জস্যের কারণে কয়েক বছর সন্তান নেওয়া থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের ধারণা, এমন পারিবারিক পরিবেশে সন্তান এলে তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই তাঁরা প্রথমে নিজেদের দাম্পত্য সমস্যাগুলো সমাধান করতে চান।
মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিসংগত? এমন পরিস্থিতিতে ওই দম্পতি এবং সম্ভাব্য সন্তানের জন্য কী পরামর্শ দেওয়া যায়?
উত্তর: প্রথমেই একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন—শুধু সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত দাম্পত্য সমস্যার সমাধান করে না।
বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সন্তান নেওয়া নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর ভিন্নমত নতুন করে উত্তেজনা ও বিরোধের কারণ হতে পারে। যেমন, একজন সন্তান নিতে আগ্রহী হলেও অন্যজন বর্তমান দাম্পত্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে সন্তান নিতে অনিচ্ছুক হতে পারেন। এ ধরনের মতপার্থক্য সম্পর্কের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
একইভাবে, কোনো পরিবারের একটি সন্তান থাকার পর একজন অভিভাবক দ্বিতীয় সন্তান চাইতে পারেন, কিন্তু অন্যজন অর্থনৈতিক, আবেগগত কিংবা দাম্পত্য সম্পর্কের সমস্যার কারণে তাতে সম্মত নাও হতে পারেন।
তাই মূল বিষয় হলো—সন্তান নেওয়া বা না নেওয়ার সিদ্ধান্তকে দাম্পত্য সমস্যার বিকল্প সমাধান হিসেবে দেখা উচিত নয়। প্রথমে সমস্যার প্রকৃতি ও কারণ বুঝতে হবে এবং তা সমাধানের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ
এ ধরনের পরিস্থিতিতে একজন যোগ্য পারিবারিক পরামর্শদাতা বা মনোবিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া উপকারী হতে পারে। পেশাদার পরামর্শের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, বিরোধের কারণ এবং পারিবারিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে তাঁদের জন্য উপযুক্ত পথ নির্ধারণ করা সম্ভব।
পরিস্থিতি বিবেচনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু সময়ের জন্য সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে। আবার কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে দাম্পত্য সম্পর্ক নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তবে এসব সিদ্ধান্ত তাড়াহুড়া, ভয় বা সামাজিক চাপের ভিত্তিতে নয়; বরং বাস্তব পরিস্থিতি, পারস্পরিক আলোচনা এবং প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ পরামর্শের ভিত্তিতে নেওয়া উচিত।
সন্তান ও দাম্পত্য সম্পর্ক
বিশেষজ্ঞের মতে, কিছু ক্ষেত্রে সন্তানের উপস্থিতি স্বামী-স্ত্রীর আবেগগত সম্পর্ককে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে এবং পারিবারিক বন্ধনকে দৃঢ় করতে সহায়তা করতে পারে। তবে সন্তান নিজে দাম্পত্য সমস্যার ‘সমাধান’—এমন ধারণা করা ঠিক নয়।
কারণ, দাম্পত্য জীবনে গুরুতর ও অমীমাংসিত সমস্যা থাকলে সন্তান জন্মের পর দায়িত্ব ও মানসিক চাপ আরও বাড়তে পারে। তাই শুধু সম্পর্ক ভালো করার উদ্দেশ্যে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়াও যথাযথ পদ্ধতি নয়।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কিছু পর্যবেক্ষণে সন্তান রয়েছে এমন পরিবারে বিবাহবিচ্ছেদের হার সন্তানহীন পরিবারের তুলনায় কম দেখা গেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সন্তান থাকলেই দাম্পত্য সম্পর্ক টিকে থাকবে বা বিবাহবিচ্ছেদের ঝুঁকি দূর হয়ে যাবে। সন্তানের উপস্থিতি ও দাম্পত্য স্থায়িত্বের সম্পর্ককে পরিস্থিতি ও অন্যান্য পারিবারিক কারণ বিবেচনা করেই মূল্যায়ন করতে হবে।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কী বিবেচনা করবেন?
দাম্পত্য সম্পর্কে মতবিরোধ থাকলে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তের আগে স্বামী-স্ত্রীর কয়েকটি বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা প্রয়োজন
• নিজেদের মধ্যে বিরোধের মূল কারণ কী?
• দুজনের সন্তান নেওয়ার ইচ্ছা ও সময়ের বিষয়ে মতৈক্য আছে কি না।
• পারিবারিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কেমন।
• সন্তান জন্মের পর দায়িত্ব ভাগাভাগি কীভাবে হবে।
• বর্তমান সম্পর্কের সমস্যাগুলো মোকাবিলার সক্ষমতা কতটা।
• প্রয়োজন হলে পারিবারিক কাউন্সেলিং বা মনোবিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া হবে কি না।
দাম্পত্য জীবনে মতবিরোধ থাকলে সন্তান নেওয়া বা না নেওয়া—কোনোটিকেই সমস্যার একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ, পারস্পরিক বোঝাপড়া, দায়িত্ববোধ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পেশাদার পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ।
সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত। তাই তা ভয়, চাপ, বিরোধ এড়ানোর চেষ্টা কিংবা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার একমাত্র উপায় হিসেবে নয়; বরং দুজনের সম্মতি, পারিবারিক বাস্তবতা এবং সম্ভাব্য সন্তানের সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনা করে নেওয়া অধিক যুক্তিসংগত।
আপনার কমেন্ট