সোমবার ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - ০৭:৪৬
সন্তানের প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা কি ভবিষ্যতে আবেগীয় নির্ভরশীলতা বাড়ায়?

সন্তানের আবেগীয় চাহিদা পূরণ করা তার সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সন্তানের প্রতিটি চাহিদা তাৎক্ষণিকভাবে ও কোনো সীমা ছাড়াই পূরণ করাই যে ভালোবাসার সঠিক প্রকাশ—বিষয়টি এমন নয়। বরং কিছু চাহিদা যথাসময়ে পূরণ করা, কিছু ক্ষেত্রে অপেক্ষা করতে শেখানো এবং কিছু চাহিদা পূরণ না করার মধ্য দিয়েও শিশুর মধ্যে ধৈর্য, আত্মনিয়ন্ত্রণ, বাস্তবতাবোধ ও মানসিক পরিপক্বতা গড়ে ওঠে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: ইসলামি কাউন্সেলিং বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক হুজ্জাতুল ইসলাম মুহাম্মাদ রেজা বানিয়ানি ‘সন্তানের ভবিষ্যৎ জীবনে বাবা-মায়ের ভালোবাসার প্রভাব’ বিষয়ে একটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। হাওজা নিউজের পাঠকদের জন্য তাঁর বক্তব্যের সম্পাদিত অনুবাদ তুলে ধরা হলো।

প্রশ্ন: বাবা- মায়ের অতিরিক্ত ভালোবাসা কি সন্তানের মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্পর্কগুলোতে অতিরিক্ত আবেগীয় প্রত্যাশা বা নির্ভরশীলতা তৈরি করতে পারে?

উত্তর: নিঃসন্দেহে, আমরা যখন পরিবারের সদস্যদের আবেগীয় চাহিদা পূরণের কথা বলি—যেমন, স্বামীর মাধ্যমে স্ত্রীর আবেগীয় চাহিদা পূরণ কিংবা স্ত্রীর মাধ্যমে স্বামীর প্রয়োজনীয় কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা—তখন এর অর্থ অতিরিক্ত বা সীমাহীনভাবে এসব চাহিদা পূরণ করা নয়। বরং এর জন্য প্রয়োজন একটি ‘কাঙ্ক্ষিত মাত্রা’ ও ‘যৌক্তিক ভারসাম্য’।

বিষয়টি আরও পরিষ্কার করার জন্য মনোবিজ্ঞানের একটি ধারণার উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। শিশু প্রতিপালনের ক্ষেত্রে ‘অনুকূল পুরস্কার’ (Optimal Reward) বা ‘ভারসাম্যপূর্ণ পুরস্কার’ নামে একটি ধারণা রয়েছে। মানুষের অন্যান্য সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এ ধারণাটি প্রয়োগ করা যেতে পারে। এমনকি আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও অনেক সময় এ ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি অনুসরণ করেন।

‘ভারসাম্যপূর্ণ পুরস্কার’ বলতে কী বোঝায়?
শিশুর ক্ষেত্রে কিছু প্রয়োজন রয়েছে, যেগুলো তাৎক্ষণিকভাবে ও যথাসময়ে পূরণ করা জরুরি। আবার কিছু প্রয়োজন রয়েছে, যেগুলো পূরণ করতে তাকে কিছুটা অপেক্ষা করানো যেতে পারে। এর মাধ্যমে শিশু ধৈর্য ধারণ, অপেক্ষা করা এবং উপযুক্ত সময়ের গুরুত্ব বুঝতে শেখে।

আবার কিছু চাহিদা এমনও রয়েছে, যেগুলো পূরণ না করাই প্রয়োজনীয়। এর মাধ্যমে শিশু বুঝতে শেখে যে, সে যা চাইবে, তা সবসময় তার ইচ্ছামতো এবং সঙ্গে সঙ্গে পূরণ হবে—এমনটি নয়।

আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বান্দাদের প্রতি আচরণের ক্ষেত্রেও আমরা এর একটি দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। আমাদের কিছু দোয়া ও প্রয়োজন তাৎক্ষণিকভাবে পূরণ হয়, কিছু পূরণ হতে সময় লাগে এবং কিছু চাহিদা হয়তো কখনোই আমাদের প্রত্যাশিতভাবে পূরণ হয় না। এর মাধ্যমে মানুষ নিজের আকাঙ্ক্ষাকে বোঝা, বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া এবং নিজের চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা অর্জন করে।

পরিবারেও প্রয়োজন আবেগীয় ভারসাম্য
পরিবারের আবেগীয় পরিবেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই। একটি সুস্থ পারিবারিক পরিবেশের অর্থ হলো—না অতিরিক্ত আবেগপ্রবণতা, না অবহেলা; বরং ভালোবাসা ও বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য।

উদাহরণস্বরূপ, স্বামী যখন স্ত্রীর আবেগীয় চাহিদা পূরণ করেন, তখন স্ত্রীকেও মানসিক পরিপক্বতা ও বাস্তবতাবোধের সঙ্গে বিষয়টি গ্রহণ করতে হবে। তাকে বুঝতে হবে, স্বামী সবসময় তার প্রতিটি চাহিদা তাৎক্ষণিকভাবে এবং সম্পূর্ণভাবে পূরণ করতে সক্ষম নাও হতে পারেন।

কাজের ব্যস্ততা, অর্থনৈতিক চাপ, সময়ের সীমাবদ্ধতা কিংবা শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তির কারণে কোনো কোনো সময় একজন স্বামী তার স্ত্রীর আবেগীয় চাহিদা পুরোপুরি পূরণ করতে নাও পারেন।

এমন পরিস্থিতিতে মা যদি সন্তানকে বিষয়টি যথাযথভাবে বুঝিয়ে বলেন, তাহলে সেটিও শিশুর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে ওঠে। যেমন তিনি বলতে পারেন:

‘তোমার বাবা অনেক কাজ ও দায়িত্বের মধ্যে রয়েছেন। তবে তাঁর পরিস্থিতি যদি সুযোগ দেয়, তিনি অবশ্যই তোমার জন্য ওই কাজটি করার চেষ্টা করবেন।’

এ ধরনের কথা শিশুকে শেখায়—
• আমাদের সবারই কিছু প্রয়োজন ও চাহিদা রয়েছে;
• এসব চাহিদার কিছু স্বাভাবিক ও ন্যায্য;
• কিন্তু সব প্রয়োজন পূরণ করা সবসময় আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না;
• কখনো কখনো আমাদের অপেক্ষা করতে হয়;
• আবার কোনো কোনো চাহিদা পূরণ না হওয়াও জীবনের স্বাভাবিক বাস্তবতার অংশ।

ভালোবাসার সঙ্গে সীমারেখাও জরুরি
সুতরাং, এ ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ পারিবারিক পরিবেশ শিশুর মধ্যে অতিরিক্ত প্রত্যাশা বা আবেগীয় নির্ভরশীলতা তৈরি করে না। বরং এটি তার আবেগীয় পরিপক্বতা ও সহনশীলতা বৃদ্ধি করে এবং মানবিক সম্পর্ক সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ধারণা গড়ে তুলতে সহায়তা করে।

এ ক্ষেত্রে বাবা যেমন সন্তানের প্রতি নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন, তেমনি মা-ও সন্তানদের সামনে একজন বাস্তবতাবোধসম্পন্ন ও পরিপক্ব আদর্শ হিসেবে নিজের ভূমিকা পালন করছেন।

এ ধরনের পরিবেশে বেড়ে ওঠা সন্তান এমন ভুল ধারণা পোষণ করে না যে— ‘আবেগীয় চাহিদা পূরণ বলতে বোঝায়, আমি যখন যা চাইব, তখনই ঠিক যেভাবে চাইব, সেভাবেই তা আমাকে দিতে হবে।’

বরং সে বুঝতে শেখে যে, ‘আবেগীয় চাহিদা পূরণ’ একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রক্রিয়া। এর মধ্যে রয়েছে সীমা, বিবেচনা, ধৈর্য এবং বাস্তবতার প্রতি সম্মান।

অতএব, সন্তানের প্রতি ভালোবাসার ক্ষেত্রে শুধু কতটা ভালোবাসা দেওয়া হচ্ছে—এটাই মূল বিষয় নয়; বরং কীভাবে, কখন এবং কোন সীমার মধ্যে সেই ভালোবাসা প্রকাশ করা হচ্ছে এবং সন্তানের আবেগীয় চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে—সেটিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha