হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী,
লেখা: হাসান রেজা
ভূমিকা
ইতিহাসের পাতায় অনেক নাম লেখা আছে। কিছু নাম মুছে যায় কালের গর্ভে, কিছু নাম ঢেকে যায় ধুলোর আস্তরণে। কিন্তু কিছু নাম থাকে যা ইতিহাসের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে, যা কালের প্রবাহে আরও উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে ওঠে।
কিছু মানুষ থাকে যারা মৃত্যুর পরেও মরে না, বরং মৃত্যুর মাধ্যমেই অমর হয়ে যায়। তাদের শরীর মাটিতে মিশে যায়, কিন্তু তাদের আদর্শ আকাশের মতো বিস্তৃত হয়ে পড়ে থাকে প্রতিটি মুক্তিকামী হৃদয়ে।
এমনই এক চরিত্রের কথা আমরা বলব, যাকে শত্রুরা ভয় পেত এতটাই যে তাকে ধ্বংস করতে ব্যবহার করতে হয়েছিল পঁচাশি টন বাংকার-ভেদী বোমা। শত্রু ভেবেছিল পাহাড় ধ্বংস করে দিলে সব শেষ হয়ে যাবে।
কিন্তু সে জানত না-পাহাড়ের বুক চিরে জন্ম নেয় নতুন পাহাড়, আর প্রতিটি চূর্ণ পাথর হয়ে ওঠে প্রতিরোধের প্রতীক। ইতিহাস সাক্ষী, যত বার পর্বতকে ধ্বংস করার চেষ্টা হয়েছে, তত বার নতুন পর্বতের জন্ম হয়েছে।
শত্রুর ভয় ও পর্বতের প্রতিচ্ছবি
শত্রু যখন পঁচাশি টন ওজনের বাংকার-ভেদী বোমা নিক্ষেপ করে, তখন সে আসলে স্বীকার করে নেয় তার পরাজয়। কারণ শক্তিশালী শত্রু কখনো দুর্বল শত্রুর বিরুদ্ধে এমন অস্ত্র ব্যবহার করে না। যে শত্রু এতটা ভয় পায় যে তাকে হারাতে পৃথিবীর সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক অস্ত্র ব্যবহার করতে হয়, সে আসলে নিজের দুর্বলতাই প্রকাশ করে ফেলে।
যে মানুষকে তারা পর্বত বলে ডাকে, সে তো একক কোন ব্যক্তি নয়-সে এক আদর্শ, এক পথ, এক প্রতিরোধের নাম।
পর্বতকে কেউ ধ্বংস করতে পারে না, কারণ পর্বত কেবল মাটি ও পাথরের স্তূপ নয়; পর্বত হলো স্থিরতা, পর্বত হলো অটল বিশ্বাস, পর্বত হলো সেই শক্তি যা ঝড়-তুফানে ভেঙে পড়ে না, বরং আরও গভীরভাবে মাটির বুকে প্রোথিত হয়।
ইতিহাসে দেখা যায়, যারা পর্বতকে ধ্বংস করতে চেয়েছে, তারা নিজেরাই ধ্বংস হয়েছে, আর পর্বত আজও দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে।
শোকের বোঝা ও প্রতিরোধের দীক্ষা
একজন মানুষের শোক কখনো সীমাহীন হতে পারে-এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তার চেয়েও ভারী শোক যখন আমরা বহন করি, তখন আমরা বুঝতে শিখি শোক কেবল কাঁদার জন্য নয়, শোক হলো দীক্ষার এক অন্য নাম।
যে জাতি শোককে অস্ত্রে পরিণত করতে জানে, সে জাতিকে কেউ হারাতে পারে না। আমরা শোককে দুর্বলতার অশ্রুতে পরিণত করিনি, আমরা তাকে প্রতিরোধের আগুনে পরিণত করেছি। প্রতিটি শোক আমাদের আরও দৃঢ় করেছে, আরও সংহত করেছে, আরও ঐক্যবদ্ধ করেছে।
এ কারণেই শত্রু হতবুদ্ধি-সে বুঝতে পারে না, কীভাবে শোকের মধ্যেও কোনো জাতি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। সে জানে না, অশ্রু যখন মাটিতে পড়ে, তখন তা থেকে জন্ম নেয় সংকল্পের অঙ্কুর।
যে জাতি শোককে শক্তিতে রূপান্তর করতে পারে, তার সামনে কোনো শত্রুই টিকতে পারে না। ইতিহাসের প্রতিটি মহান প্রতিরোধ আন্দোলন শোক থেকে জন্ম নিয়েছে, আর সেই শোকই হয়েছে তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
সৈয়দের ভাষা ও বিজয়ের দর্শন
প্রতিরোধের সেই মহান নেতা একদা বলেছিলেন এমন এক কথামালা, যা ইতিহাসের সেরা দার্শনিক উপদেশের সমকক্ষ, যা আজও প্রতিটি মুক্তিকামী হৃদয়ে অনুরণিত হয়। তিনি বলেছিলেন-‘আমরা পরাজিত হই না। হয় আমরা শত্রুর উপর বিজয়ী হবো, তখন আমরা বিজয়ী হয়েছি; নয়তো শহীদ হবো, তখনও আমরা বিজয়ী হয়েছি।‘
এই বাক্যে লুকিয়ে আছে প্রতিরোধের চূড়ান্ত দর্শন। এই দর্শনে পরাজয়ের কোনো অস্তিত্ব নেই, কারণ এই দর্শনে পরাজয় শব্দটিই মুছে দেওয়া হয়েছে। যে জাতি শহীদ হওয়াকে বিজয় বলে মানে, তাকে পরাজিত করার কোনো উপায় শত্রুর কাছে নেই।
কারণ পরাজয় তখনই সম্ভব যখন মানুষ পরাজয়কে স্বীকার করে। আর যে পরাজয়কে স্বীকারই করে না, তাকে কেউ হারাতে পারে না। তিনি আরবিতে বলেছিলেন-‘নাহনু লা নুহযাম, ইনদামা নানতাসির নানতাসির ওয়া ইনদামা নুস্তাশহাদ নানতাসির।‘
এই বাক্য আজ প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়, প্রতিটি প্রতিরোধের মিছিলে ধ্বনিত হয়, প্রতিটি শহীদের রক্তে প্রবাহিত হয়। এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সেই গোপন রহস্য, যা শত্রু কখনো বুঝতে পারবে না-কারণ শত্রু কেবল শরীর দেখে, আত্মা দেখতে পায় না।
বাংকার-ভেদী বোমার প্রতীকী অর্থ
পঁচাশি টন বাংকার-ভেদী বোমা কেবল একটি অস্ত্র নয়, এটি একটি প্রতীক। এটি প্রতীক এই বার্তার, যে শত্রু তার সমস্ত শক্তি, তার সমস্ত প্রযুক্তি, তার সমস্ত অহংকার নিয়ে একটি মানুষকে হারাতে চেয়েছে-কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে।
কারণ শত্রু ভেবেছিল দেহ ধ্বংস করলেই সব শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু সে বুঝতে পারেনি, দেহ ধ্বংস করা যায়, আদর্শ ধ্বংস করা যায় না। বাংকার-ভেদী বোমা ভেদ করতে পারে কংক্রিটের দেয়াল, কিন্তু ভেদ করতে পারে না বিশ্বাসের দেয়াল।
বাংকার-ভেদী বোমা ধ্বংস করতে পারে ভবন, কিন্তু ধ্বংস করতে পারে না সেই আদর্শ, যা লক্ষ মানুষের হৃদয়ে প্রোথিত। এই বোমাই শত্রুর চূড়ান্ত পরাজয়ের সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে ইতিহাসে।
প্রতিরোধের উত্তরাধিকার
একজন শহীদ কখনো একা মরে না। তার সাথে মরে না তার আদর্শ, মরে না তার পথ, মরে না তার স্বপ্ন। প্রতিটি শহীদের রক্ত থেকে জন্ম নেয় হাজারো নতুন যোদ্ধা।
প্রতিটি শোকের অশ্রু থেকে জন্ম নেয় নতুন সংকল্প। প্রতিটি পর্বতের চূর্ণ পাথর হয়ে ওঠে নতুন প্রতিরোধের ভিত্তি। এই উত্তরাধিকারই শত্রুর সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন। শত্রু জানে, যত সে আঘাত করবে, তত নতুন প্রতিরোধ জন্ম নেবে। যত সে ধ্বংস করবে, তত নতুন নির্মাণ হবে।
এই চক্র শত্রুকে দিশেহারা করে দিয়েছে, হতবুদ্ধি করে দিয়েছে। কারণ শত্রু বোঝে না, কীভাবে মৃত্যুর মধ্যেও জীবন থাকে, কীভাবে পরাজয়ের মধ্যেও বিজয় থাকে, কীভাবে ধ্বংসের মধ্যেও নির্মাণ থাকে।
উপসংহার
পর্বতকে ধ্বংস করা যায় না। পর্বতকে কেবল আরও গভীরভাবে প্রোথিত করা যায় মাটির বুকে। শত্রু তার সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করেও যদি কেবল একটি মানুষকে হারাতে পঁচাশি টন বোমা ব্যবহার করতে বাধ্য হয়, তাহলে বুঝতে হবে সে মানুষটি আসলে একা ছিল না-সে ছিল লক্ষ মানুষের প্রতিচ্ছবি, কোটি হৃদয়ের স্পন্দন, অসংখ্য স্বপ্নের বাহক।
আজ আমরা সেই শোককে স্মরণ করি বেদনায় নয়, গর্বে। কারণ যে আদর্শের জন্য এত বড় আত্মত্যাগ, সেই আদর্শ কখনো মরে না, সেই আদর্শ কখনো পরাজিত হয় না। পর্বত রয়ে যায়, পর্বত রয়ে যাবে-আর পর্বতের ছায়ায় জন্ম নেবে নতুন প্রজন্মের প্রতিরোধের সৈনিকেরা।
ইতিহাসের চাকা থামানো যায় না, আর পর্বতের গল্প কখনো শেষ হয় না। প্রতিটি যুগের পর্বত তার নিজের গল্প রচনা করে, আর সেই গল্প হয়ে ওঠে পরবর্তী প্রজন্মের প্রেরণা। সেই পর্বত আজও দাঁড়িয়ে আছে, কালও দাঁড়িয়ে থাকবে-কারণ পর্বত কখনো হারায় না, পর্বত কেবল আরও মহিমান্বিত হয়ে ওঠে।
সেই পর্বত হলো শহীদ সৈয়দ হাসান নাসরুল্লাহ।
আপনার কমেন্ট