হাওজা নিউজ এজেন্সি: হুজ্জাতুল ইসলাম আলী আসবাক-তাবার আমোল শহরের একজন ধর্মীয় প্রচারক তিনি ৯ মেহরকে ‘বিশ্ব প্রবীণ দিবস’ হিসেবে পালনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন জাতি ও উম্মতের কাছ থেকে নেওয়া অঙ্গীকারসমূহের মধ্যে পিতা-মাতার প্রতি সম্মান ও সদাচরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং এটিকে তাওহিদের নির্দেশের পাশাপাশি স্থান দেওয়া হয়েছে।
তাওহিদ ও পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের মধ্যে সম্পর্কের রহস্য
ধর্মীয় এই বিশেষজ্ঞ সূরা বাকারার ৮৩ নম্বর আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, এই আয়াতে মহান আল্লাহ তাওহিদের নির্দেশের পাশাপাশি পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। এই দুই নির্দেশের মধ্যে সম্পর্কের তিনটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রথমত, পিতা-মাতা আল্লাহর সৃষ্টিকর্তৃত্ব ও প্রতিপালন থেকে প্রাপ্ত অনুগ্রহের ধারাবাহিক মাধ্যম। দ্বিতীয়ত, সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার অনুগ্রহ আল্লাহর অনুগ্রহের মতোই নিঃস্বার্থ এবং সন্তানের বিকাশ ও কল্যাণের উদ্দেশ্যে নিবেদিত। তৃতীয়ত, আল্লাহর অনুগ্রহ যেমন সন্তানের আনুগত্যের ওপর নির্ভরশীল নয়, তেমনি পিতা-মাতার স্নেহ ও অনুগ্রহও সন্তানের আনুগত্যের ওপর নির্ভর করে না; বরং তা সবসময় অব্যাহত থাকে।
হুজ্জাতুল ইসলাম আসবাক-তাবার আরও বলেন, পরিবার গঠনের পর সন্তানের সঙ্গে পিতা-মাতার আবেগীয় সম্পর্ক ধীরে ধীরে বিস্মৃতির ঝুঁকিতে পড়ে। এ কারণে পবিত্র কোরআন বিশেষভাবে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।
তিনি বলেন, পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ মূলত ‘ন্যায়বিচার’ ও তাঁদের প্রতি ঋণ পরিশোধের নাম। কারণ, সন্তান তাঁদের শারীরিক ও মানসিক লালন-পালনের কারণে পিতা-মাতার কাছে ঋণী।
সদাচরণ মুস্তাহাব, তবে পিতা-মাতার অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব
আমোল শহরের এই ধর্মীয় প্রচারক তাওহিদের নির্দেশের পাশাপাশি পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, মূলত সদাচরণের নির্দেশ ‘অগ্রাধিকার ও শ্রেষ্ঠত্বের’ ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে। তবে সদাচরণ পরিত্যাগের ফলে যদি পিতা-মাতার অবাধ্যতা, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা কিংবা তাঁদের কষ্ট দেওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তাহলে তাঁদের প্রতি সদাচরণ করা ওয়াজিব হয়ে যায়। অন্যথায় তা মুস্তাহাবের অন্তর্ভুক্ত।
তিনি আরও বলেন, পবিত্র কোরআনের কিছু আয়াতে পিতা-মাতার প্রতি ‘সদাচরণের’ নির্দেশ এবং ‘অবাধ্যতা’র নিষেধাজ্ঞা পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন, তাঁদের উদ্দেশে ‘উফ’ শব্দটিও না বলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের মুস্তাহাব হওয়া এবং তাঁদের কষ্ট দেওয়া হারাম হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।
ধর্মীয় এই বিশেষজ্ঞ আয়াতের ভাষাগত কাঠামো বিশ্লেষণ করে বলেন, কোনো বিধান বা নির্দেশ প্রকাশের ক্ষেত্রে খবরবাচক বাক্য ব্যবহার করা হলে তার তাৎপর্য ও গুরুত্ব আরও শক্তিশালী হয়। ‘আল্লাহ ছাড়া কারও ইবাদত করবে না’—এই বক্তব্য সব ধরনের শিরককে সম্পূর্ণভাবে নাকচ করে দেয়; তা সত্তাগত বিশ্বাসের ক্ষেত্রে শিরক হোক কিংবা ইবাদতের ক্ষেত্রে শিরক হোক। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করতে হলে বিশ্বাস ও আমল—উভয় ক্ষেত্রে দ্বীনের মূলনীতি ও শাখাগত বিধান সম্পর্কে জ্ঞান থাকা জরুরি।
হুজ্জাতুল ইসলাম আসবাক-তাবার কোরআনে বিধানসমূহ উল্লেখের ক্রম বিশ্লেষণ করে বলেন, ‘পিতা-মাতা’, ‘আত্মীয়-স্বজন’, ‘এতিম’ এবং ‘অসহায়-দরিদ্র’—এগুলো অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। যেসব ব্যক্তির আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে, তারা জ্ঞান, অর্থনীতি ও রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এতিম ও বঞ্চিতদের দায়িত্ব গ্রহণে নিয়োজিত। একইভাবে ফরজ জাকাত প্রদান কোনো অতিরিক্ত অনুগ্রহ বা দয়া নয়; বরং এটি একটি ‘ঋণ’ ও মানবিক দায়িত্ব, যা যথাযথভাবে আদায় করতে হবে।
উত্তম আচরণ; সমাজ গঠনে ইসলামের মৌলিক নীতি
আমোল শহরের এই ধর্মীয় প্রচারক কোরআনের ‘মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বলো’—এই নির্দেশের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, মুমিন ও অমুমিন নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বলা ও ভালো আচরণ করা মানবসমাজ গঠনে ইসলামের অন্যতম মৌলিক নীতি।
তিনি বলেন, ‘উত্তম কথা’ বলতে এমন বক্তব্যকে বোঝায়, যার বিষয়বস্তু কল্যাণ ও মানুষের মঙ্গলসংশ্লিষ্ট এবং যার উপস্থাপনার পদ্ধতিও গ্রহণযোগ্য ও সুন্দর। এমনকি সৎকাজের নির্দেশ দেওয়া এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করার ক্ষেত্রেও এই নৈতিক কাঠামো অনুসরণ করতে হবে।
তিনি বনি ইসরাইলের সঙ্গে আল্লাহর অঙ্গীকারসমূহের বাস্তবায়ন ও পরবর্তী পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে বলেন, বনি ইসরাইল কিছু সময় আনুগত্য করার পর বিশ্বাস, নৈতিকতা ও অধিকারসংক্রান্ত বিভিন্ন অঙ্গীকার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। একপর্যায়ে অঙ্গীকার ভঙ্গ তাদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।
হুজ্জাতুল ইসলাম আসবাক-তাবার বলেন, মহান আল্লাহ বনি ইসরাইলের অঙ্গীকার ভঙ্গের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে মুসলমানদের সতর্ক করেছেন, যাতে তারা আল্লাহ, পিতা-মাতা ও সমাজের প্রতি নিজেদের দায়িত্ব ও অঙ্গীকারের ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত থাকে।
তিনি আরও বলেন, পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশকে মহান আল্লাহর নামের পাশাপাশি স্থান দেওয়া এ বিধানের অসাধারণ গুরুত্বেরই প্রমাণ। একইভাবে হজরত লোকমান (আ.)-এর উপদেশেও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতার বিষয়টি পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়েছে।
হুজ্জাতুল ইসলাম আসবাক-তাবার ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে বলেন, পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ মূলত ‘অগ্রাধিকার ও শ্রেষ্ঠত্বের’ ওপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু সদাচরণ পরিত্যাগের ফলে যদি পিতা-মাতার অবাধ্যতা, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা কিংবা তাঁদের কষ্ট দেওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তাহলে তা ওয়াজিব হয়ে যায়। আর তা না হলে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ মুস্তাহাবের অন্তর্ভুক্ত।
তিনি বলেন, পবিত্র কোরআনের কিছু আয়াতে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ এবং তাঁদের অবাধ্যতা থেকে নিষেধাজ্ঞা পৃথকভাবে এসেছে। যেমন, তাঁদের উদ্দেশে ‘উফ’ শব্দ উচ্চারণ করতেও নিষেধ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে একদিকে পিতা-মাতার প্রতি নেক আচরণের গুরুত্ব এবং অন্যদিকে তাঁদের কষ্ট দেওয়া ও অবাধ্যতার নিষিদ্ধতা একই সঙ্গে স্পষ্ট করা হয়েছে।
আপনার কমেন্ট