হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ও পশ্চিমা বিশ্লেষণগুলোতে ইয়েমেন ইস্যুতে সৌদি আরবের বড় ধরনের অচলাবস্থা এবং এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে বিভিন্ন উপায়ে সৌদি প্রচেষ্টার কথা উঠে আসছে। এর মধ্যে ইয়েমেনবিরোধী জোট গঠনের চেষ্টাও রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ ওয়েবসাইট ‘আনহার্ড’ (UnHerd) ‘সৌদি রাজপরিবারে ঘৃণা ও ভয়; সৌদি আরব আত্মরক্ষায় সক্ষম নয়’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। এতে সৌদি আরবের সামরিক দুর্বলতা এবং অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ফ্রান্স যখন হুথিদের (আনসারুল্লাহ) বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সৌদিদের সহায়তার জন্য সেনা, বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র এবং ফাইটার-বোম্বার পাঠাল, তখন ব্রিটেনের পক্ষেও তার তথাকথিত সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বক্তব্য সরিয়ে রেখে যুদ্ধে যোগ দেওয়া প্রায় অনিবার্য হয়ে পড়ে।
পশ্চিমের দেউলিয়া সামরিক শিল্পের ত্রাণকর্তা সৌদি আরব!
তবে সৌদিরা যখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সহায়তা চাইল, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-যিনি ইরানের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধে সৌদি আরবের সমর্থন না দেওয়ায় অত্যন্ত হতাশ ছিলেন-সৌদিদের এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। এর ফলে ইউরোপের অন্যতম সক্রিয় রাজনৈতিক নেতা এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর জন্য ইয়েমেন ও সৌদি আরবের যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়।
অবশ্য সৌদিদের সামরিক সেবা দেওয়ার আগে ম্যাক্রোঁ তাদের কোনো বিল পাঠাননি। তবে তিনি ভালোভাবেই জানেন, এর বিনিময়ে সৌদি আরব যে পুরস্কার দেবে তা অত্যন্ত বড় হতে পারে-এমনকি যুদ্ধবিমান কেনার একটি বড় চুক্তির আকারেও আসতে পারে।
ফরাসিদের এমন একটি চুক্তির ভীষণ প্রয়োজন। কারণ একসময় সমৃদ্ধশালী প্রতিষ্ঠান দাসো (Dassault) বর্তমানে তার তুলনামূলক অনুন্নত পণ্য নিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। তাদের রাফাল যুদ্ধবিমান স্টেলথ সক্ষমতাবিহীন হওয়ায় এটিকে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান হিসেবে বিবেচনা করা হয় না এবং মনে হয়, খুব বেশি ক্রেতাও এর প্রতি আগ্রহী নয়।
১৯৮৫ সালে ব্রিটেনের বিমানশিল্প ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ছিল। কিন্তু সৌদি আরবের সঙ্গে ঐতিহাসিক আল-ইয়ামামাহ চুক্তি সেই শিল্পকে রক্ষা করে। ওই চুক্তিতে সৌদিরা এমন কিছু বিমানের বিনিময়ে ব্রিটিশদের প্রায় ৪০ বিলিয়ন পাউন্ড দিয়েছিল, যেগুলোর প্রতি খুব কম ক্রেতারই আগ্রহ ছিল।
আজও ব্রিটেনের মহাকাশ ও বিমানশিল্প এমন যুদ্ধবিমান কর্মসূচির মাধ্যমে টিকে থাকার চেষ্টা করছে, যেগুলোর প্রতি অন্যদের তেমন আগ্রহ নেই। এ পরিস্থিতিতে ব্রিটিশরাও আবার সৌদি আরবের সঙ্গে এ খাতে নতুন চুক্তির কথা ভাবছে।
আত্মরক্ষায় সৌদি রাজপরিবারের অক্ষমতা
তবে এসব ঘটনা একটি বিষয় স্পষ্ট করে: সৌদি রাজপরিবার ও সৌদি আরবের আত্মরক্ষার অক্ষমতা।
বিষয়টি ব্যাখ্যার দাবি রাখে। কারণ সৌদি সশস্ত্র বাহিনী আধুনিক সরঞ্জামে সজ্জিত এবং দেশটির প্রায় ১ কোটি ৮৮ লাখ স্থানীয় জনসংখ্যার তুলনায় তাদের আকারও বড়।
স্থল, নৌ ও বিমানবাহিনীতে মোট প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার সদস্য রয়েছে। এর পাশাপাশি আধাসামরিক ন্যাশনাল গার্ডে প্রায় ৭৫ হাজার সদস্য রয়েছে। একসময়ের অনানুষ্ঠানিক বেদুইন বাহিনী থেকে এটি ইতালির কারাবিনিয়েরি বাহিনীর আদলে একটি কাঠামোবদ্ধ আধাসামরিক বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। সব মিলিয়ে সৌদি আরবের সশস্ত্র বাহিনীর মোট সদস্যসংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার।
এ ছাড়া সৌদি বাহিনীর রয়েছে সুসজ্জিত ঘাঁটি, অত্যাধুনিক কমান্ড সেন্টার এবং আধুনিক অস্ত্র। মার্কিন, ব্রিটিশ ও অন্যান্য দেশের সামরিক প্রশিক্ষকদের কাছ থেকেও তারা বিভিন্ন পর্যায়ে উন্নত প্রশিক্ষণ পেয়েছে। এমনকি সম্প্রতি অবসর নেওয়া মার্কিন জেনারেলরাও তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।
কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, এসব বাহিনী যে কাজটি করতে পারে না তা হলো সৌদি আরবের শত্রুদের-বিশেষ করে ইয়েমেনিদের-মোকাবিলা করা। বর্তমানে ইয়েমেনিরাই সৌদি সরকারের জন্য একটি বড় হুমকি। অথচ তাদের অনেকের হাতে রয়েছে সাধারণ ও হালকা অস্ত্র; এমনকি অনেক সময় তাদের পায়ে জুতা বা শরীরে সামরিক পোশাকও দেখা যায় না।
সৌদি রাজপরিবারে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও অভ্যন্তরীণ অনৈক্য
তবে ইয়েমেনিদের দক্ষ সামরিক ইউনিট রয়েছে, যারা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং জাহাজবিধ্বংসী ড্রোন উৎক্ষেপণে সক্ষম। তারা এসব সক্ষমতা ব্যবহার করে সৌদি আরবের অভ্যন্তরে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। বর্তমানে তারা লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে সৌদি আরবের তেল রপ্তানিতেও গুরুতর বিঘ্ন সৃষ্টি করছে।
তবুও এখন পর্যন্ত ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে কোনো পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান পরিচালনার লক্ষণ দেখা যায়নি।
এর কারণ হলো, দীর্ঘদিন ধরে সৌদি রাজপরিবারের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে সামরিক অভ্যুত্থান।
এই হুমকির মোকাবিলায় সৌদি রাজপরিবারের পরপরকার শাসকেরা সবচেয়ে কার্যকর যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন তা হলো-‘বিভক্ত করো ও শাসন করো’। তবে এই নীতি তারা বিদেশি শত্রুদের বিরুদ্ধে নয়, বরং নিজেদের সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরেই প্রয়োগ করেছে।
ফলে সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন যুদ্ধ ইউনিটকে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। এগুলোর নেতৃত্বও বিভিন্ন রাজপুত্রের হাতে, যারা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত সবাই প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান আলে সৌদ-এর কাছে জবাবদিহি করেন।
খালিদ বিন সালমান সৌদি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আব্দুল আজিজের নাতি এবং সৌদি যুবরাজ ও বর্তমান শাসক মোহাম্মদ বিন সালমানের ছোট ভাই।
যদিও এসব রাজপুত্রের মাধ্যমে সৌদি রাজপরিবারের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা হয়েছে, তবুও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রিয়াদ ও অন্যান্য শহুরে কেন্দ্রের ওপর একক নিয়ন্ত্রণ রাখে না।
এসব শহরে পৃথক সৌদি ন্যাশনাল গার্ডও মোতায়েন রয়েছে। এতে ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি সদস্য রয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত এর নেতৃত্বও সৌদি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতার আরেক নাতির হাতে।
এ ছাড়া প্রায় ১৫ হাজার সদস্যের একটি ছোট সীমান্তরক্ষী বাহিনী রয়েছে, যা জরুরি পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কারণ বিমান বা সমুদ্রপথে দেশের প্রবেশ ও বহির্গমন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে এই বাহিনী।
সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নেতৃত্বও বাদশাহ আব্দুল আজিজের একজন নাতির হাতে। অন্যদিকে, মোহাম্মদ বিন সালমানকে নিরাপত্তা দেওয়া সৌদি আরবের সবচেয়ে সুসংগঠিত ও নিয়মতান্ত্রিক নিরাপত্তা বাহিনীও তার নিজস্ব কমান্ডের অধীনে রয়েছে।
সবশেষে রয়েছে সৌদি জরুরি বিশেষ বাহিনী, প্রায় ৩৫ হাজার সদস্যের একটি অভিজাত বাহিনী, যা আবার অন্য একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের অধীনে পরিচালিত হয়।
সৌদি সামরিক কাঠামোর বিশৃঙ্খলা
তাত্ত্বিকভাবে এসব বিচ্ছিন্ন বাহিনীকে একত্র করে ইয়েমেনিদের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান পরিচালনার পথে কোনো বাধা থাকার কথা নয়।
কিন্তু বাস্তবে সৌদি আরবের সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর মধ্যে যে গভীর বিভাজন রয়েছে-যা মূলত তাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে শাসকদের, অর্থাৎ পুরো রাজপরিবারকে উৎখাত করার সম্ভাবনা ঠেকানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে-তা তাদের সামগ্রিক ঐক্যবোধ থেকে বঞ্চিত করেছে। অথচ শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে এই ঐক্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
একটি প্রতিষ্ঠিত সামরিক নীতি অনুযায়ী, সামরিক শক্তি = মোট শক্তি × ঐক্য। ঐক্য না থাকলে প্রকৃতপক্ষে কোনো শক্তিই থাকে না।
অন্যদিকে সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন শাখায় ঐক্যের পথে আরও একটি বাধা রয়েছে। কিছু কর্মকর্তা রাজপরিবারের সদস্য এবং তারা বিশেষ সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকারী। অর্থাৎ বেতন ছাড়াও তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অতিরিক্ত ভাতা পান।
অন্যদিকে অন্যান্য কর্মকর্তারা কেবল বেতন পান, যা রাজপরিবারের সদস্যদের প্রাপ্ত অর্থের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম হতে পারে-যদিও সবাইকে একই দেশের সুরক্ষা ও যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য দায়িত্ব পালন করতে হয়।
সৌদিদের আশঙ্কা হলো, যদি কিছু এফ-১৫ যুদ্ধবিমানকে ইয়েমেন বা অন্য কোনো শত্রুর ওপর ব্যাপক বোমাবর্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়, তাহলে কিছু পাইলট হয়তো তার পরিবর্তে কোনো সৌদি রাজপুত্রের প্রাসাদে হামলা চালাতে পারেন। এর ফলে একটি পূর্ণমাত্রার সামরিক বিদ্রোহ শুরু হয়ে যেতে পারে।
এই আশঙ্কার কারণে-যা একেবারে ভিত্তিহীনও নয়-সৌদিরা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের সুরক্ষার জন্য আমেরিকানদের ওপর নির্ভর করে আসছে। কখনো কখনো ব্রিটেন ও ফ্রান্সও তাদের সহায়তা করেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা তুরস্ক ও পাকিস্তানের কাছেও সহযোগিতা চেয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এসব দেশ সৌদি আরবের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক হুমকি হিসেবে বিবেচিত হুথিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সেনা পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
উল্লেখ্য, নিবন্ধটির লেখক মূলত সৌদি রাজপরিবারের উত্তরাধিকারীদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ সংকট ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন। সৌদিদের বিদেশি, বিশেষ করে মার্কিন সমর্থনের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতার পেছনে থাকা অন্যান্য কারণ তিনি উল্লেখ করেননি। এর মধ্যে রয়েছে অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে সৌদি আরবের স্বনির্ভরতার অভাব এবং দেশটিতে পর্যাপ্ত দক্ষ প্রকৌশলীর অনুপস্থিতি।
অন্যদিকে, কয়েক দশক ধরে সৌদি আরব এই অঞ্চলে মার্কিন যুদ্ধগুলোর একটি প্রক্সি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হলো ইয়েমেনের জটিল সংকট। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে, পশ্চিমা ও মার্কিন অস্ত্র কারখানাগুলো সৌদি তেল থেকে অর্জিত অর্থের মাধ্যমে সেইসব যুদ্ধে অর্থায়ন পাচ্ছে, যেসব যুদ্ধের পেছনে স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রও ভূমিকা রাখছে।
আপনার কমেন্ট