রবিবার ৪ অক্টোবর ২০২৬ - ১৫:০৩
সৌদি আরব ভিত্তিহীন ধর্মীয় অভিযোগ তুলে ইয়েমেনের সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে

ইয়েমেনের এক নারী গণমাধ্যমকর্মী ও আনসারুল্লাহর নারী কমিটির সদস্য উম্মা মালিক খাশাব এক নিবন্ধে লিখেছেন, সৌদি আরবের নৈতিক দেউলিয়াত্ব সম্প্রতি একটি নতুন ও মনগড়া অভিযোগের মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হয়েছে। সৌদি প্রচারণায় দাবি করা হচ্ছে, ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনী মক্কা ও মদিনার পবিত্র স্থানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। বিশেষ করে মদিনার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে লক্ষ্যবস্তু করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৌদির ‘ভণ্ড শোকপ্রকাশ’ এই প্রচারণারই অংশ। তাঁর মতে, ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে এ ধরনের ভিত্তিহীন অভিযোগের উদ্দেশ্য হলো সাম্প্রদায়িক বিভেদ উসকে দেওয়া, আন্তর্জাতিক সহানুভূতি অর্জন এবং নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করা।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: নিবন্ধে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের প্রতিরোধযোদ্ধারা সৌদি আরব ও তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। একই সময়ে সৌদি-সমর্থিত কিছু যোদ্ধা আত্মসমর্পণ করেছে এবং বিভিন্ন এলাকায় নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তন ঘটেছে।

ইয়েমেনের প্রতিরোধ ও সৌদি অবরোধ মোকাবিলার প্রচেষ্টার বিপরীতে, সৌদি বাহিনী সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সানা ও অন্যান্য আবাসিক এলাকায় হামলা চালিয়েছে বলে নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে। ইয়েমেনের পক্ষ থেকে মদিনা থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র লক্ষ্যবস্তু করার পর সৌদি ও মার্কিনপন্থী গণমাধ্যমগুলো ধর্মীয় অনুভূতি উসকে দিয়ে প্রচার শুরু করে যে, হুথিরা পবিত্র শহরগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে।

খাশাব তাঁর নিবন্ধে এই প্রচারণাকে সৌদি আরবের সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যর্থতা আড়াল করার প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর দাবি, প্রতিটি সামরিক পরাজয় ও কৌশলগত পশ্চাদপসরণের পর সৌদি পক্ষ মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং ধর্মীয় বক্তব্যের আশ্রয় নিচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সমর্থন ধরে রাখার পাশাপাশি নিজেদের দুর্বলতা আড়াল করতে চাইছে।

তিনি আরও লিখেছেন, মক্কা ও মদিনার পবিত্র স্থানকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ সৌদি প্রচারণার একটি নতুন দৃষ্টান্ত। তাঁর মতে, এই অভিযোগের উদ্দেশ্য সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি, বিদেশি ও আন্তর্জাতিক সহানুভূতি অর্জন এবং ইয়েমেনের হামলা মোকাবিলায় সৌদি আরবের অক্ষমতা আড়াল করা।

নিবন্ধকার সৌদি আরবের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকারও সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, সৌদি ধর্মীয় নেতাদের একটি অংশ ইয়েমেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও সহিংসতার পক্ষে অবস্থান নিলেও গাজা ও ফিলিস্তিনের জনগণের প্রতি সমর্থনের প্রশ্নে নীরব থেকেছে। এমনকি মসজিদুল হারামকে ‘রাজনীতিকরণের’ অজুহাতে হজ ও ওমরাহ পালনকারীদের ফিলিস্তিনের জন্য দোয়া করতেও বাধা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

খাশাবের মতে, এই পরিস্থিতির বিপরীতে ইয়েমেন নিজেকে ফিলিস্তিন ও আঞ্চলিক প্রতিরোধের পক্ষে একটি দৃঢ় অবস্থানে থাকা দেশ হিসেবে তুলে ধরছে। তিনি উল্লেখ করেন, আনসারুল্লাহর নেতা আবদুল মালিক বদরুদ্দিন আল-হুথি এবং সুপ্রিম পলিটিক্যাল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মাহদি আল-মাশশাত ইসরায়েলি ও মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইরানের সঙ্গে ইয়েমেনের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। একই সঙ্গে লেবানন ও তার প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রতিও ইয়েমেনের সমর্থন রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

নিবন্ধে বলা হয়েছে, ইয়েমেন নিজেকে ইসরায়েলি-মার্কিন জোট এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধকেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করে। এ কারণে ইসরায়েল ও ওয়াশিংটনের মধ্যে ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বলে লেখক দাবি করেন। তাঁর মতে, বাব আল-মান্দাব প্রণালি ও লোহিত সাগরে ইয়েমেন তার অবস্থান আরও শক্তিশালী করছে এবং সানা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।

খাশাবের দাবি, সানার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একাধিকবার জানিয়েছে—রিয়াদ ইয়েমেনের বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরের ওপর অবরোধ প্রত্যাহার এবং সামরিক অভিযান বন্ধ না করা পর্যন্ত সৌদি জাহাজ ছাড়া বিশ্বের অন্যান্য জাহাজের চলাচল নিরাপদ থাকবে।

সৌদি আরবের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ তুলে নিবন্ধে বলা হয়েছে, তাদের কর্মকাণ্ড কেবল প্রচারযুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি ইরানি বিমান মানবিক মিশনে আহত ও অসুস্থ ব্যক্তি, শিক্ষার্থী এবং একটি জানাজায় অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিদলকে পরিবহনের উদ্দেশ্যে পৌঁছানোর পরপরই বিমানবন্দরে হামলা চালানোর ঘটনা উল্লেখ করেন।

এছাড়া তায়িজ প্রদেশের মাওইয়া বাজার ও আল-মাআফির এলাকায় বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা এবং ইমরান, ধামার, হাজ্জাহ, সাদা ও তায়িজে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামো ধ্বংসের অভিযোগও তিনি করেছেন।

নিবন্ধে ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার ইয়াহিয়া সারির বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে, সৌদি এফ-১৫ ও টাইফুন যুদ্ধবিমান খামিস মুশাইত ও তায়িফের বিমানঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করে হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি নাজরান ও জিজান থেকেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে।

লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় মোট ৯৪টি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। সানা, সাদা, তায়িজ, হাজ্জাহ, ইমরান ও ইব প্রদেশের বিভিন্ন স্থাপনা ও এলাকায় হামলায় বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, ৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া সর্বশেষ উত্তেজনা বৃদ্ধির পর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মোট বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সংখ্যা ১ হাজার ৩৫০-এ পৌঁছেছে।

খাশাবের মতে, সৌদি আরবের উচিত নয় নিজেদের কর্মকাণ্ড অস্বীকার করে এবং ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সব পদক্ষেপকে তথাকথিত ‘বৈধতা’র নামে ব্যাখ্যা করে বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা করা। তাঁর দাবি, ডিজিটাল গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার নথিপত্রে এসব ঘটনা পর্যবেক্ষণ ও সংরক্ষিত হচ্ছে।

নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, সানা সতর্ক করেছে যে তায়িজ, এডেন এবং সীমান্তের বিভিন্ন ক্রসিং ও বন্দরে সৌদি কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠা সামরিক সমাবেশ, সৌদি-সমর্থিত যোদ্ধাদের অবস্থান ও অস্ত্রের মজুত ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনীর সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হবে।

লেখক সতর্ক করে বলেন, সৌদি নেতৃত্বের মনে করা উচিত নয় যে বর্তমান অভিযানই শেষ কথা। তাঁর দাবি, চলমান উত্তেজনা কেবল প্রথম পর্যায়; ইয়েমেন পিছু হটবে না এবং তমকা বা ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে তাকে দমিয়ে রাখা যাবে না। সৌদি আরব ইয়েমেন থেকে পুরোপুরি সরে না যাওয়া, অবরোধের অবসান না করা এবং ইয়েমেনের জনগণের অধিকার ও জাতীয় সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি না দেওয়া পর্যন্ত ইয়েমেনের হামলা বন্ধ হবে না বলে তিনি দাবি করেন। অন্যথায় সৌদি রাজতন্ত্রের জন্য সামনে আরও কঠিন পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে বলে তিনি সতর্ক করেন।

যারা সৌদি আরবের পাশে অবস্থান করছে, তাদের নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করে প্রেসিডেন্ট মাহদি আল-মাশশাত ঘোষিত সাধারণ ক্ষমার সুযোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনের বিপ্লবী নেতৃত্ব সৌদি আরবের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মাত্রা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে, ইয়েমেনিদের বিরুদ্ধে নয়। তিনি বলেন, সানা নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য সৌদি আরবের মোকাবিলায় প্রস্তুত এবং ইয়েমেনিরা অনির্দিষ্টকাল অবরোধের মধ্যে থাকবে না।

তিনি আরও আহ্বান জানান, প্রত্যেক ইয়েমেনি যেন নিরপেক্ষ থাকে এবং সানার বাহিনীকে সৌদি আরবের সঙ্গে সরাসরি মোকাবিলা করার সুযোগ দেয়, যাতে সাধারণ ইয়েমেনিদের ‘মানবঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করা না হয়।

নিবন্ধে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, সৌদি আরব আল-জাওফ প্রদেশের আল-হাজম কারাগারে নিজেদের অনুগত বাহিনীর হাতে থাকা কয়েকজন বন্দীকেও হত্যা করেছে। লেখকের ভাষায়, ইতিহাসে ভাড়াটে যোদ্ধাদের জন্য এটাই শেষ পরিণতি।

খাশাবের মতে, যে ব্যক্তি নিজের সম্মানকে মূল্য দেয়, সে নিজের দেশকেও সম্মান করে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে আপস করতে অস্বীকার করে। অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য যতই থাকুক, জাতীয় নীতিগুলো অপরিবর্তিত থাকে। ‘তুমি আমার ভূমিতে অভিভাবক হয়ে থাকতে পারবে না’—এই স্লোগানটি ইয়েমেনিদের জাতীয় চেতনার অংশ এবং উত্তর ও দক্ষিণের সব ইয়েমেনির জন্য একটি স্থায়ী নীতি ও দৃঢ় অবস্থান, যা থেকে কোনো পশ্চাদপসরণের সুযোগ নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha