সোমবার ৫ অক্টোবর ২০২৬ - ১১:২৮
নামাজে ‘তাকফীর’ (হাত বাঁধা)

নামাজে হাত বাঁধা বা ‘তাকফীর’ (তাকাত্তুফ/কব্‌জ) নিয়ে মুসলিম ফকিহদের মধ্যে দীর্ঘদিনের ফিকহি মতভেদ রয়েছে। আহলুস সুন্নাহর হানাফি, শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাবের অধিকাংশ ফকিহ এটিকে নামাজের সুন্নত হিসেবে গণ্য করলেও মালিকি মাজহাবে ফরজ নামাজে হাত স্বাভাবিকভাবে নিচে ছেড়ে রাখাকে (ইসদাল) মুস্তাহাব বলা হয়েছে। একইভাবে সাহাবি, তাবেয়ি ও প্রাচীন কয়েকজন ফকিহের মধ্যেও ইসদালের পক্ষে মত পাওয়া যায়। ফলে নামাজে হাত বাঁধা বা ছেড়ে রাখার বিষয়টি মূলত ফিকহি মতভেদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যেখানে বিভিন্ন মাজহাব ও আলেম তাঁদের নিজ নিজ দলিল ও ব্যাখ্যার ভিত্তিতে মত প্রকাশ করেছেন।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রথম পর্ব:-

এ বিষয়ে কয়েকটি আলোচনা রয়েছে।

প্রথমত-নামাজে তাকফীর:

নামাজের মধ্যে ডান হাতের তালুর ভেতরের অংশ বাম হাতের পিঠের ওপর রাখা-অর্থাৎ এক হাতের ওপর আরেক হাত রেখে নামাজ আদায় করাকে এখানে ‘তাকফীর' تكفير ’ বা তাক্তাতুফ' تكتف ' বা 'আল-ক্ববয' القبض' বলা হয়েছে।

কব্‌জ-বিদআত ও সুন্নাহর মধ্যকার বিতর্ক

নামাজে বাম হাতের ওপর ডান হাত রাখা-যাকে ফিকহের পরিভাষায় কব্‌জ (القبض) বা তাকাত্তুফ (التكتّف) বলা হয়-আহলুস সুন্নাহর বহু ফকিহের কাছে একটি মুস্তাহাব বা সুন্নত আমল হিসেবে প্রসিদ্ধ।

হানাফি ফকিহদের মতে: তাকাত্তুফ নামাজের একটি সুন্নত; এটি ফরজ বা অপরিহার্য নয়। পুরুষের জন্য উত্তম হলো-ডান হাতের তালুর ভেতরের অংশ বাম হাতের পিঠের ওপর রেখে নাভির নিচে হাত রাখা। আর নারীর জন্য উত্তম হলো-দুই হাত বুকের ওপর রাখা।

শাফেয়ি ফকিহদের মতে: পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্যই কব্‌জ সুন্নত। তাদের মতে, উত্তম পদ্ধতি হলো-ডান হাতের তালুর ভেতরের অংশ বাম হাতের পিঠের ওপর রেখে বুকের নিচে এবং নাভির ওপরে, কিছুটা বাম পাশের দিকে হাত রাখা।

হাম্বলি ফকিহদের মতে: কব্‌জ সুন্নত। তাদের মতে, উত্তম হলো-ডান হাতের তালুর ভেতরের অংশ বাম হাতের পিঠের ওপর রেখে তা নাভির নিচে রাখা।

অন্যদিকে, মালিকি মাজহাবের মতটি এ ক্ষেত্রে ভিন্ন। তাদের মতে, ফরজ নামাজে দুই হাত স্বাভাবিকভাবে নিচে ছেড়ে রাখা-অর্থাৎ ইসদাল (الإسدال)-মুস্তাহাব।

 মালিকিদের আগেও একদল সাহাবি, তাবেয়ি ও ফকিহ নামাজে ইসদালের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন-আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের, সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যাব, সাঈদ ইবনে জুবাইর, আতা, ইবনে জুরাইজ, নাখাঈ, হাসান আল-বসরী, ইবনে সিরিন এবং আরও কয়েকজন ফকিহ।

লাইস ইবনে সা‘দ-এর মতও ইসদালের পক্ষে ছিল বলে এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তিনি একটি ব্যতিক্রমের কথা বলেছেন: যদি নামাজে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় এবং এতে মুসল্লি ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তাহলে তাঁর জন্য কব্‌জ করা বৈধ।

আর ইমাম আওযাঈ-এর ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি কব্‌জ ও ইসদাল-উভয় পদ্ধতির মধ্যেই মুসল্লিকে স্বাধীনতা দিয়েছেন।

[ মুহাম্মদ জাওয়াদ মুগনিয়া, আল-ফিকহ ‘আলা আল-মাযাহিব আল-খামসাহ, পৃ. ১১০।]

ইসদাল ও কব্‌জ-উভয়কেই সুন্নত বলার একটি মত

হিজাজের মালিকি মুফতি মুহাম্মদ আবিদ-এর মতও এখানে উদ্ধৃত হয়েছে। তাঁর মতে, ইসদাল ও কব্‌জ-উভয়টিই রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণিত সুন্নত।

তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো মুমিন যদি দীর্ঘ সময় ইসদাল অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তাহলে তিনি কব্‌জ করতে পারেন। অর্থাৎ তাঁর দৃষ্টিতে ইসদাল হলো মূল পদ্ধতি, আর কব্‌জ হলো তার শাখাগত বা বিকল্প পদ্ধতি।

 [ডঃ আব্দুল হামিদ ইবনে মুবারক, রিসালাতুন মুখতাসারাতুন ফিস্-সাদল, পৃ. ৫।]

অনুবাদ: হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা গোলাম মুস্তাফা নাজাফী

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha